তারকার মন সাক্ষাৎকার

যে স্বপ্ন মানুষকে ঘুমাতে দেয় না সেটাই হলো আসল স্বপ্ন: কবি হেলাল হাফিজ

ছবিঃ

কবিতার মতোই রহস্যাবৃত্ত তাঁর জীবন। প্রেম, প্রতিবাদ, দ্রোহ আর বিরহের কবি। সমকালীন বাংলা কবিতার এক রাজকুমার তিনি। কবি হিসেবে বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে তুঙ্গস্পর্শী কবিখ্যাতি ও জনপ্রিয়তা তাঁর। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরষ্কারসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি কবি হেলাল হাফিজ। মনেরখবর পাঠকদের মুখোমুখি হয়ে এবার তিনি জানাচ্ছেন তাঁর মনের কথা, জীবনের কথা, ভালোলাগার কথা, স্বপ্নের কথা, আকাঙ্ক্ষার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ মামুন।  

মধ্যবিত্তরা এক ধরনের একটা মূল্যবোধ নিয়ে চলতে চায় কিন্তু সেটা সব সময় সামর্থ্যের মধ্যে থাকে না। তারা তাদের মূল্যবোধটাকে বিসর্জনও দিতে চায় না আবার ধরেও রাখতে পারে না। তাদের একটু শিল্প সাহিত্যের দিকে আগ্রহ থাকে, উপরে উঠার প্রতিযোগিতা না হলেও এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তারপর ছেলেমেয়েদের একটু ভালো পড়াশুনা করানোর চিন্তা। এসব করতে গিয়ে তারা হিমশিম খায়, সবসময় কুলিয়ে উঠতে পারে না।

মখ : কেমন আছেন?

হেলাল হাফিজ : আছি মোটামুটি। খুব যে ভালো আছি তা না। চোখের সমস্যা আছে। বয়সও বাড়ছে, ক্রমশ দূর্বল হয়ে আসছি। পড়ন্ত বেলায় এখন জীবন, তারপরও মোটামুটি ভালোই আছি।

মখ : ভালো থাকতে কী করেন?

হেলাল হাফিজ : ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো জীবন। সবারই কমবেশি সমস্যা আছে। এই দৈনন্দিন কাজকর্ম যা করি তার সব মিলেই ভালো থাকা। সেভাবে বিশেষ কিছু করি না।

মখ : আপনার দৃষ্টিতে কোন শ্রেণির মানুষ সবচাইতে বেশি সমস্যাক্রান্ত?

হেলাল হাফিজ : কেক শ্রেণির সমস্যা তো একেক রকম। তারমধ্যে আমার মনে হয় এদেশে সবচাইতে বেশি সমস্যা, দুশ্চিন্তা ও কষ্টে থাকে মধ্যবিত্ত সমাজ।

মখ : যেমন?

হেলাল হাফিজ : মধ্যবিত্তরা এক ধরনের একটা মূল্যবোধ নিয়ে চলতে চায় কিন্তু সেটা সব সময় সামর্থ্যের মধ্যে থাকে না। তারা তাদের মূল্যবোধটাকে বিসর্জনও দিতে চায় না আবার ধরেও রাখতে পারে না। তাদের একটু শিল্প সাহিত্যের দিকে আগ্রহ থাকে, উপরে উঠার প্রতিযোগিতা না হলেও এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তারপর ছেলেমেয়েদের একটু ভালো পড়াশুনা করানোর চিন্তা। এসব করতে গিয়ে তারা হিমশিম খায়, সবসময় কুলিয়ে উঠতে পারে না। উচ্চবিত্ত যারা আছেন অর্থনৈতিক দিক থেকে তাদের এখানে সমস্যা হয় না। আর একেবারে প্রান্তিক যে জনগোষ্ঠী রয়েছেন তাদেরও এ সমস্যাটা প্রকট নয়, কেননা তাদের চিন্তা থাকে ছেলেমেয়ে বড় হলে কীভাবে তাদের তাড়াতাড়ি কাজে লাগানো যায় সেটা।

মখ : স্বপ্ন দেখেন?

হেলাল হাফিজ : স্বপ্ন তো সব মানুষই দেখে। আমিও দেখি।

মখ : কবির স্বপ্নগুলো কেমন হয়?

হেলাল হাফিজ : স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে কবির দায়িত্বটা একটু বেশি। বেশি এজন্য যে, কবির নিজের জীবন নিয়ে এক ধরনের স্বপ্ন তো থাকেই কিন্তু কবির তো আর শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবলে হবে না। কবিকে তার সময়ের, তার দেশের, তার ভূখন্ডের সকল জনগোষ্ঠীর জন্য স্বপ্ন দেখতে হয়। প্রকৃত যে কবি সে সব মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে এবং সব মানুষকে স্বপ্ন দেখায়।

মখ : অর্থাৎ স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে কবির দায়িত্ব?

হেলাল হাফিজ : না, শুধু স্বপ্ন দেখানো নয়। কবির আরেকটি বড় দায়িত্ব হচ্ছে তার সময়ে, তার ভূখন্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমস্যাকে সনাক্ত করা এবং চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া এটাও কবির কাজ। আবার রাষ্ট্রের যে নিপীড়ন রাষ্ট্রের যে ব্যর্থতা অর্থাৎ রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য কতটুকু করতে পারছে বা পারছে না এগুলোও কবি তার কবিতায় তুলে ধরেন।

মখ : অনেকটা বিরোধী পক্ষে অবস্থানের মতো?

হেলাল হাফিজ : তা মোটেই না। কবি বলবেন এজন্য যে, এর থেকে যারা শাসক এবং যারা শাসিত তাদের মধ্যে যদি প্রকৃত ভালোবাসা থাকে তাহলে এই দুই শ্রেণিই উপকৃত হবে। এর থেকে সরকারও নিজেকে বিশুদ্ধ করে নিতে পারবে। আবার শাসিত বুঝতে পারবে কোথায় সে বঞ্চিত হচ্ছে, তার মধ্যে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের স্পৃহা জেগে উঠবে। যে স্পৃহাটা জেগে উঠা জরুরি। এটা সরকার পতনের কোনো ব্যাপার না, এটা হলো সমাজকে সুষ্ঠ ও সুস্থভাবে বিনির্মাণ করার একটি প্রয়াস।

মখ : কবির এই প্রয়াসের সফলতা কোথায়?

হেলাল হাফিজ : সফলতা তখনই আসবে যখন যে যার অবস্থান থেকে তার দায়িত্বটুকু পালন করবে। আমি কবি আমার যতটুকু সমাজকে দেয়ার আমি দিবো, আমি বলবো, আমি লিখবো। একজন শ্রমিক তার অবস্থানে থেকে তার কাজটুকু ভালোভাবে করবে। একজন শিল্পপতি তার দায়িত্বটুকু পালন করবে। সকলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। এভাবে প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে তার দায়িত্বটুকু যদি পালন করেন তাহলেই কিন্তু আমরা চমৎকার একটি সমাজ পেয়ে যাই।

মখ : কিন্তু আদৌ এমনটা হচ্ছে না কেন?

হেলাল হাফিজ : হচ্ছেনা তার কারণ হলো এর জন্য প্রয়োজন প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা এবং সবচে বড় যেটা জরুরি সেটা হলো ভালোবাসা। এ ভালোবাসা তথাকথিত নারী-পুরুষের ভালোবাসা না। এ ভালোবাসা হচ্ছে সামষ্ঠিক ভালোবাসা। এ ভালোবাসা সমাজ পরিবর্তনের জন্য ভালোবাস, সমাজের উন্নয়নের জন্য ভালোবাসা যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। বিশেষ করে এ ভালোবাসা সবচাইতে বেশি থাকতে হবে তরুণ তরুণীদের মধ্যে যাদের সামনে এখনও ৫০/৬০ বছর সময় আছে। তারাই ভবিষ্যতে এই সমাজের চালকের আসনে বসবে, তারাই সমাজ চালাবে। এই তরুণ তরুণীদের মধ্যে আমরা যদি এ ভালোবাসাটা জাগিয়ে দিতে পারি তাহলেই তারা সমাজ বিনির্মাণে উদ্যোগী হবে আগ্রহী হবে এবং সুষ্ঠভাবে সমাজটাকে গড়ে তুলতে পারবে।

স্বাধীনতার ফল ভোগ করেছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ। স্বাধীনতার এই ফলটি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া যায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সেই ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত এই ভূখন্ডের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ বিলাস এর সবগুলি একটি বিশেষ শ্রেণি ভোগ করছে। একেক পর্বে একেক ধরনের এবং একেক ধারণার লোকেরা করেছে শুধু। সে ফলটি বৃহত্তর গণ মানুষের দুয়ারে কখনও পৌঁছায়নি। সে দরজায় কখনও টোকা পড়েনি যে এই নাও তোমার জন্য কিছু সুখ নিয়ে এসেছি এটা গ্রহণ করো।

মখ : স্বপ্ন থাকলে স্বপ্নভঙ্গের বেদনাও থাকে। আপনার এমন কোনো বেদনা রয়েছে কি?

হেলাল হাফিজ : ব্যক্তিগত জীবনের কথা যদি বলো তাহলে সেখানে অনেক স্বপ্নই অপূর্ণ রয়ে গেছে। কিন্তু আমার একটা খুব বড় স্বপ্ন পূরণও হয়েছে। আমার একটি কবিতার বই বেরিয়েছে যেখানে ছাপ্পান্নটা কবিতা রয়েছে। প্রত্যেকের জীবনেই অনেক স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেটা জেগে দেখতে হবে। যে স্বপ্ন মানুষকে ঘুমাতে দেয় না সেটাই হলো আসল স্বপ্ন।

মখ : আর সামষ্ঠিক স্বপ্ন?

হেলাল হাফিজ : ব্যক্তিগত জীবনে যে স্বপ্নভঙ্গ সেখানে আমার নিজেরও যথেষ্ট অবহেলা আছে, সময়ের অপচয় আছে। ব্যক্তিগত স্বপ্নভঙ্গের দায় নিজেরটা আমি নিজেই নিলাম। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে এ ভূখন্ড স্বাধীন করার জন্য যারা যুদ্ধ করেছেন জীবন দিয়েছেন পঙ্গু হয়েছেন। একটা বড় স্বপ্ন নিয়ে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে দেশের মানুষ যুদ্ধ করেছিল সে স্বপ্ন অধিকাংশটাই পূরণ হয়নি। সেটার বড় দায়িত্ব তো রাজনীতিবিদদের। কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতাটা তাদের হাতে থাকে। তারা কীভাবে দেশ পরিচালনা করেন তার উপর নির্ভর করে দেশ গঠনের স্বপ্ন পূরণ। সেখানে আমার মনে হয় একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার জন্য যে রকম মেধাবী এবং নিবেদিত প্রাণ শাসকগোষ্ঠী এবং কর্মী বাহিনী থাকা প্রয়োজন আমাদের যুদ্ধের পরে বোধহয় এই জিনিষটার খুব ঘাটতি ছিল। যার কারণে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটা পূনর্গঠন করতে গিয়ে আমরা অনেকটা ব্যর্থ হয়েছি। স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাটা ঐ জায়গাটাতে।

মখ : অর্থাৎ আমরা স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে পারিনি?

হেলাল হাফিজ : স্বাধীনতার ফল ভোগ করেছে মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষ। স্বাধীনতার এই ফলটি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া যায়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সেই ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত এই ভূখন্ডের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ বিলাস এর সবগুলি একটি বিশেষ শ্রেণি ভোগ করছে। একেক পর্বে একেক ধরনের এবং একেক ধারণার লোকেরা করেছে শুধু। সে ফলটি বৃহত্তর গণ মানুষের দুয়ারে কখনও পৌঁছায়নি। সে দরজায় কখনও টোকা পড়েনি যে এই নাও তোমার জন্য কিছু সুখ নিয়ে এসেছি এটা গ্রহণ করো।

মখ : কেন এমনটি হলো?

হেলাল হাফিজ : ঐযে ফলটি মুষ্ঠিমেয়ে মানুষের কাছেই রয়ে গেছে। যেমন ধরো এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হলো কৃষক। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা এমন কোনো সরকার পেলাম না যারা কৃষি ও কৃষক বান্ধব। যে সরকার কৃষকের কথা ভাববে কৃষকের উন্নতির কথা ভাববে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে সুখ পৌঁছে দেয়ার জন্য যার বড্ড প্রয়োজন ছিল।

মখ : মন খারাপ হয়?

হেলাল হাফিজ : মন খারপ হয়। আমি যেহেতু একা মানুষ একা একা হোটেলে থাকি, মন তো একটু বিষণ্ন থাকেই।

মখ : মন ভালো করার জন্য কী করেন?

হেলাল হাফিজ : মন ভালো করার সবচাইতে ভালো উপাদান তো হলো একজন মানুষ যদি একজন মানুষের সঙ্গ পায়। তার আনন্দ বেদনা কারো সাথে ভাগ করতে পারলে সেটাই সবচেয়ে ভালো লাগে। যেহেতু আমি একেবারেই একা তাই কখনও বইয়ের আশ্রয় নেই কখনও ফেসবুকের আশ্রয় নেই।

মখ : কবি না হলে কি হতেন?

হেলাল হাফিজ : ছোটবেলায় ইচ্ছে ছিল খেলাধুলার মাঝে থাকার। কবি হওয়ার ইচ্ছে সেভাবে ছিল না। ফুটবল, টেবিল টেনিস, লন টেনিস এসব ভালো লাগতো। সেই ছোটবেলায় নেত্রকোনার মতো মহকুমা শহরে বসে আমি লন টেনিস খেলা শিখেছিলাম। কবি না হলে হয়তো খেলোয়াড় হতাম।

মখ : কবি হয়ে উঠা কীভাবে?

হেলাল হাফিজ : যখন আমার তিন বছর বয়স, যখন আমি কিছু বুঝিনা তখনই আমার মা মারা যান। এই মাতৃহীনতার ঘটনাটা বা বেদনটা আমার জীবনে ভয়ানকভাবে প্রভাবিত করেছে। বয়স যত বাড়তে লাগলো মাতৃহীনতার বেদনা আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেললো যে আমি আর এটা থেকে বেরুতে পারলাম না। যত বড় হতে লাগলাম ততই দেখলাম এই খেলাধুলা দিয়ে আমার বেদনা প্রশমিত হচ্ছে না। আমি নিজেকে কবিতায় নিয়ে আসলাম।

মখ : তারপর কবি হেলাল হাফিজ হয়ে উঠা?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ইন্টারমেডিয়েটে পড়ার সময় সায়েন্স নিয়েছিলাম ডাক্তার হব বলে। কিন্তু কলেজে পড়াকালীন আমার মাথায় পোকা ঢুকে গেল যে আমি কবি হব কবিতা লিখবো। ডাক্তারি পড়ার চাপ বেশি তাই কবিতা লেখায় সময় দিতে পারবো না, এই ভেবে পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। ভালো ফল করার জন্য যেকোনো বিষয়ের পড়াশুনাই অনেক কঠিন তবে ভাবলাম বাংলা পড়লে হয়তো মোটামুটি পড়েই চালিয়ে নিতে পারবো এবং বাকী সময় কবিতা লিখতে পারবো। এরপর ৬৯ এ যখন “নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়” কবিতাটি প্রকাশ হলো তখন বলা চলে রাতারাতি আমি তারকা খ্যাতি পেয়ে গেলাম। তখন কবিতার নেশা আরো বেড়ে গেল।

ছবিঃ

মখ : কবির কবিতা থেকে আমাদের প্রাপ্তি অনেক। কবির প্রাপ্তি কতটুকু?

হেলাল হাফিজ : কবির প্রাপ্তি সকলের ভালোবাসা। আমি খুবই সৌভাগ্যবান একজন কবি। আমার মতো ভাগ্যবান কবি খুব কম আছে। একটা মাত্র বই ছাপ্পান্নটা কবিতা। এত অল্প লিখে মানুষের এত ভালোবাসা এটা সমগ্র বাংলা সাহিত্যে এমন নজির আর দ্বিতীয়টি নেই।

মখ : কবি হেলাল হাফিজের থেকে মানুষের প্রত্যাশা কি আরো অনেক বেশি ছিল?

হেলাল হাফিজ : এজন্য সকলের কাছে আমি লজ্জিত অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর অনেকটা নির্বাসিত জীবন যাপন করেছি। আমার আলস্য এত বেশি প্রকট যে কোনো কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। অনেক সময় দেখা যায় যে আলস্যটা আমার কাছে নারীর চেয়েও প্রিয়। অলসতা আমার এতোটাই ভালো লাগে।

মখ : পাঠকরা কি আপনার থেকে আর কোনো বই পাবে না?

হেলাল হাফিজ : ইচ্ছে আছে আরেকটি কবিতার বই বের করার। আমার দ্বিতীয় কবিতার বইটি বের করতে পারলে আমি গদ্যে চলে যাবো। দ্বিতীয় কবিতার বইটি বের হলে আমি আত্মজীবনী লেখায় মনোনিবেশ করব। আমার দিন তো ফুরিয়ে আসছে, পরমায়ু প্রায় শেষের পথে অথবা শেষ বললেই চলে। যেকোনো সময় বিদায় নিতে হবে। যদি পরামায়ুতে কুলিয়ে উঠে তাহলে এই দুটো কাজ করে যেতে চাই। এই দুটো কাজ করতে পারলেই আমার আর কোনো অতৃপ্তি থাকবে না।

মখ : রাগ হয়?

হেলাল হাফিজ : মাঝে মাঝে তো হয়ই।

মখ : রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কী করেন?

হেলাল হাফিজ : এমনিতেই আমি মিতভাষী মানুষ, তাই রাগটা সেভাবে প্রকাশ হয় না। আর রাগ নিয়ন্ত্রণটা অনেকটা অভ্যাস ও অধ্যবসায়ের বিষয়। তাৎক্ষণিকভাবে রাগ যদি উঠেই যায় তাহলে রাগটা হজম করে নেয়ার একটা চেষ্টা থাকে।

মখ : স্মৃতি কাতরতা আছে? হেলাল হাফিজ : অনেক বেশি স্মৃতি কাতর আমি। মখ : কোন স্মৃতি আপনাকে সবচাইতে বেশি প্রভাবিত করে? হেলাল হাফিজ : যে স্মৃতি আমাকে সবচাইতে বেশি প্রভাবিত করেছে তার কোনো স্মৃতিই আসলে আমার কাছে নেই। সেটি হলো আমার মাতৃ বিয়োগের ঘটনা। যার দ্বারা আমার জীবন পুরোপুরি প্রভাবিত।

মখ : প্রেমে পড়েছেন কখনও?

হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, একাধিকবার তো প্রেমে পড়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি। নানা কারণে সেগুলো আর পরিণতি লাভ করেনি। কখনও মাঝ পথে ভেঙ্গে গেছে। সংসার করা আর হয়ে উঠেনি।

মখ : আপনার জীবনে প্রেমের প্রভাব কতটুকু?

হেলাল হাফিজ : প্রেম তো আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রেম ছাড়া তো বাঁচা অসম্ভব। প্রেম ছাড়া কী করে মানুষ বাঁচে! প্রেম খুব বড় বিষয়। শুধু ব্যক্তি জীবনের প্রেম নয়, সামষ্ঠিক বা সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রেমটা খুব জরুরি বলে মনে করি।

মখ : বিশ্ব দরবারে বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কোথায়?

হেলাল হাফিজ : আমাদের বাংলা সাহিত্যে অনেক বড় বড় কবি, ঔপন্যাসিক, লেখক, ছোটগল্পকার রয়েছেন। তারপরও আমাদের সাহিত্য বিশ্ব দরবারে সেভাবে পরিচিতি পায়নি তার কারণ হচ্ছে ভাষা। বাংলা সাহিত্যগুলোকে ভালো ভালো হাতে আরো বেশি বেশি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হলে বিভিন্ন দেশের মানুষের হাতে পৌঁছাবে।

মখ : মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন কখনও?

হেলাল হাফিজ : আমার আলস্য। অলসতা আমার একেবারে রোগের পর্যায়ে চলে গেছে। কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। এই যে শারীরিক অসুস্থতা দূর্বলতা এখানেও মনেহয় থাক। মানে অসুখ পোষাটাও এক ধরনের অভ্যেস হয়ে গেছে। আমি মনে করি এটা খুবই অবৈজ্ঞানিক একটা বিষয় এবং মোটেই কোনো সুস্থ মানুষের লক্ষণ নয়।

মখ : পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

হেলাল হাফিজ : পাঠকদের কাছে একমাত্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়া আর কিছু আমার বলার নেই। তারা যে ভালোবাসা আমায় দিয়েছেন অত ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি নই। আমি তাদের কাছে সশ্রদ্ধ চিত্তে বিনয়াবনতভাবে তাদের এই ভালোবাসার ঋণ স্বীকার করছি। এবং তারা যেন দোয়া করেন আমার জন্য যাতে আমার শরীরটা সুস্থ থাকে। যেহেতু আমি একা মানুষ একটু অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে দেখারও লোক নেই। একটু সুস্থ থেকে অল্প কিছু লেখালেখির যে ইচ্ছে আছে সেটি যেন সম্পন্ন করে যেতে পারি এই দোয়াটুকু চাই।

মখ : ধন্যবাদ আপনাকে মনেরখবর পাঠকদের পক্ষ থেকে? সুস্থ থাকুন, আরো দীর্ঘায়ু লাভ করে আমাদের জন্য আরো লিখুন এই প্রত্যাশা থাকলো।

হেলাল হাফিজ : ধন্যবাদ পাঠকদেরও। তারা যেন আমার জন্য দোয়া করেন।