তারকার মন সাক্ষাৎকার

কবিতা মানুষের আত্মাকে আলোকিত করে: আবৃত্তি শিল্পী মাহিদুল ইসলাম মাহি

ছবিঃ আবীর শ্রেষ্ঠ
খ্যাতিমান আবৃত্তি শিল্পী তিনি। একই সাথে তিনি একজন আবৃত্তি সংগঠক। নির্জন ভোরে অথবা কবিতার মাঝে ভালো থাকেন তিনি। বাংলাদেশের আবৃত্তি চর্চাকে তিনি ছড়িয়ে দিতে চান বিশ্বব্যাপি। তিনি মাহিদুল ইসলাম মাহি। মনেরখবরের সাথে আলাপচারিতায় তিনি বলেছেন তাঁর মনের কথা, ভালোলাগার কথা, ইচ্ছার কথা, স্বপ্নের কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ মামুন।   মখ : কেমন আছেন? মাহিদুল ইসলাম : মানুষের ভালো মন্দ থাকাটা আপেক্ষিক বিষয়। এক কথায় ভালো বললেও শেষ হয় না, আবার ভালো নেই বললেও শেষ হয় না। মখ : ভালো থাকার আপেক্ষিকতা কোথায়? মাহিদুল ইসলাম : কোনো মানুষ একা ভালো থাকতে পারে না। চারপাশের প্রকৃতি পরিবেশ মানুষ দ্বারা তার ভালো মন্দ নিয়ন্ত্রিত হয়।  মখ : কোন পরিবেশে আপনি ভালো থাকেন? মাহিদুল ইসলাম : একদম ভোর বেলা যখন ঘুম থেকে উঠি আমার মনে হয় সে সময়টাতেই আমি সবচাইতে ভালো থাকি। আর যদি আরেকটু ভালো থাকার কথা বলা হয় তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে কবিতা।
যতোই আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি, সমাজতন্ত্রের কথা বলি বা অন্য কোনো ধারার কথা বলি সবশেষে দেখা যায় সকল সমীহ সেই শাসক গোষ্ঠীকে ঘিরে। শাসক হলে প্রথমেই আমি এটা বদলে দিতাম। যেখানে সমীহ শাসকের সমীহ হওয়ার কথা জনগণের প্রতি সেখানে জনগণের সমীহ কেন শাসকের প্রতি আদায় করা হয়। মানুষকে তো আরেকটু ডানা মেলার কথা।
মখ : কবিতা কি ভালো রাখতে পারে? মাহিদুল ইসলাম : হ্যাঁ কবিতা সকলকে ভালো রাখতে পারে। মখ : অনেকে তো আবার কবিতা দেখলেই রীতিমতো আতংকিত বোধ করে? মাহিদুল ইসলাম : হাটের লোকে তো কত কথাই বলে কবিতার ভালো লাগা নিয়ে, আর আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে আমি বলি কবিতা তো একটি শিল্প যা মানুষের বোধকে স্পর্শ করে। এটা নির্ভর করে একজন ব্যক্তির শিল্পবোধের উপর। মখ : মন খারাপ হয়? মাহিদুল ইসলাম : হ্যাঁ হয়। মখ : মন ভালো করার জন্য কী করেন? মাহিদুল ইসলাম : মন ভালো করতে পরচর্যা করি! (হাসি) মখ : হিংসা আছে? মাহিদুল ইসলাম : আমার মধ্যে হিংসা ভাবটা কম। আমার যে জীবনবোধ তা দিয়ে আমি হিংসা এবং ঈর্ষা নামক যে রিপু মানুষের মধ্যে কাজ করে সেটিকে বিনাশ করেছি। মখ : হিংসা কি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি নয়? মাহিদুল ইসলাম : সহজাত প্রবৃত্তি তবে এটি সহজাত নেতিবাচক প্রবৃত্তি, যা মানুষের দূর করা প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ তার জ্ঞান, অভিজ্ঞান, প্রজ্ঞা দিয়ে এটিকে দূর করতে পারে। মখ : রাগ হয়? মাহিদুল ইসলাম : রাগ তো হয়ই। মখ : রাগ হলে কী করেন? মাহিদুল ইসলাম : রাগ হলে তৎক্ষণাৎ ঝেড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।  মখ : এই ইচ্ছেটুকু নিয়ন্ত্রণ করেন কীভাবে? মাহিদুল ইসলাম : রাগ হলে তখন যুক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি, ভেবে দেখার চেষ্টা করি যে এই ঘটনা কেন ঘটেছে বা তার পেছনের ঘটনা কী। মখ : স্মৃতিকাতরতা আছে? মাহিদুল ইসলাম : আলবৎ আছে। মখ : কোন স্মৃতি আপনাকে বেশি নাড়া দেয়? মাহিদুল ইসলাম : শৈশব কৈশরের স্মৃতি আমার গ্রামের স্মৃতি এসবই বেশি নাড়া দেয়, আবার যে আমাকে দুঃখ দিয়েছে তাঁকেও বেশ মনে পড়ে।  মখ : আবৃত্তি শিল্পী না হলে কি হতেন? মাহিদুল ইসলাম : ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হতাম। মখ : আরেকটি জীবন পেলে কি হতে চাইবেন? মাহিদুল ইসলাম : আরেকটি জীবন পেলে শিল্পী হতে চাইবো না, অন্তত বাংলাদেশে। আরেকটি জন্ম এদেশে আমার হলে আমি শাসক হতে চাইবো। মখ : শাসক হলে বর্তমানের কোন জিনিষটাকে পরিবর্তন করতে চাইতেন? মাহিদুল ইসলাম : যতোই আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি, সমাজতন্ত্রের কথা বলি বা অন্য কোনো ধারার কথা বলি সবশেষে দেখা যায় সকল সমীহ সেই শাসক গোষ্ঠীকে ঘিরে। শাসক হলে প্রথমেই আমি এটা বদলে দিতাম। যেখানে সমীহ শাসকের সমীহ হওয়ার কথা জনগণের প্রতি সেখানে জনগণের সমীহ কেন শাসকের প্রতি আদায় করা হয়। মানুষকে তো আরেকটু ডানা মেলার কথা। মখ : আপনারা অর্থাৎ আপনাদের প্রজন্ম সামরিক সরকারকে হঠিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলো। এই সময়ে এসে তার ঠিক কতটুকু সুফল জনগণ ভোগ করছে? মাহিদুল ইসলাম : তখন সবে কৈশোর পেরেয়িছে, মনে হচ্ছিলো গণতন্ত্র হলো আমাদের সুখের চাবিকাঠি। তবে আমি আশাবাদী মানুষ, সুষ্ঠ সমাজকাঠামো গঠনের জন্য একটু সময় তো আমাদের দরকার। আমার মতে আমরা সেই সময়ের মধ্যবর্তী সংকট সময়টা অতিক্রম করছি। হয়তো গণতন্ত্রের যে সুফল সেটা আমরা ভবিষ্যতে পাবো।  মখ : আবৃত্তি শিল্পীর পাশাপাশি আপনি একজন সাংস্কৃতিক সংগঠকও। সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আপনি কতটুকু খুশি বা কতটুকু অখুশি? মাহিদুল ইসলাম : অপ্রিয় সত্য হলো যে আমাদের সাংগঠনিক চর্চার যে অবয়ব সেটাও কিন্তু এখন রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির অনেকটা সমার্থক হয়ে গেছে। এই রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে বাইরে বের হয়ে আসতে পারলে আরো ভালো হতো। তবে ব্যক্তিগতভাবে সংগঠক হিসেবে আমি সন্তুষ্ট একজন মানুষ। আমার সংগঠনের ব্যানারে কিছু ছেলে মেয়ে আবৃত্তি চর্চা করছে, আবৃত্তি শিখছে, তারা ভালো করছে, প্রয়োজনে তারা গণমানুষের পাশে দাঁড়ায়, বৃহত্তর প্রয়োজনে তারা রাজপথে দাঁড়ায়, সমাজের সংকটে তারা পাশে দাঁড়ায়। আর যদি মূল পয়েন্টে ফোকাস করি যেটা আমাদের প্রধান কাজ আবৃত্তির বিকাশে কাজ করাও আমাদের সংগঠনের দায়িত্ত্ব, সে জায়গায় হয়তো আমাদের আরো অনেক কিছু করার ছিল। মখ : ঢাকার বাইরে আবৃত্তি চর্চা কেমন চলছে? মাহিদুল ইসলাম : ঢাকার বাইরে সবগুলো জেলা শহরেই তো আবৃত্তির সংগঠন রয়েছে। তারা নিয়মিতি বিভিন্ন কর্মশালা করে যাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও নিয়মিত ঢাকার বাইরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা কর্মশালায় অংশগ্রহণ করি। মখ : দেশের বাইরে? মাহিদুল ইসলাম : দেশের বাইরে অত বেশি আমার যাওয়া হয়নি। তবে যতটুকু গিয়েছি তাতে প্রবাসীদের আবৃত্তির প্রতি গভীর অনুরাগ আমাকে অনেক বেশি উৎসাহিত করেছে। প্রবাসীদের কাছে আবৃত্তিকে আরো ছড়িয়ে দিতে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যেতে আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুত। মখ : যতদূর জানি আগামী সপ্তাহে আপনার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে? মাহিদুল ইসলাম : হ্যাঁ, আগামী ১২ নভেম্বর থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, ক্যানবেরা ও মেলবোর্ণে আমার আবৃত্তি করার কথা রয়েছে। এছাড়া ১৭ ডিসেম্বর সিডনিতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করবো। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াতে বেশকিছু কর্মশালাতেও অংশগ্রহণ করবো। মখ : বাংলা কবিতা শুধু কবিতা নয় একই সাথে শক্তিশালী দর্শন। এ দর্শন বিশ্ব দরবারে আমরা কতটুকু তুলে ধরতে পেরেছি? মাহিদুল ইসলাম : সেই অনেক আগে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার সময় বিশ্ববাসী জেনেছিল যে বাংলা একটি শক্তিশালী ভাষা। কিন্তু তারপর আর সেভাবে হয়নি। এসময়ে এসে আমরা শামসুর রাহমান বা সৈয়দ শামসুল হকের কোনো কবিতা বা সাহিত্য বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পারিনি। মখ : কেন পারা যায়নি? মাহিদুল ইসলাম : ঐ যে একটু আগে বললাম আমাদের সবকিছু একটা ফ্রেমে বন্দি। যা পুরষ্কার পাওয়ার তা পায় আমাদের সরকার আমাদের প্রশাসন। সত্যিকারের শিল্পী যারা তাদের কিন্তু সেভাবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। একই কারণে আমাদের রক্তের ভেতরে যে গান, অনুভবের ভেতরে যে গান সে গানকেও সেভাবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না বা হচ্ছে না।
ছবিঃ
মখ : অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে সব দেশই যেখানে প্রতিযোগিতায় মত্ত নিজের সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সেখানে আমাদের বাংলাদেশের কোনো আয়োজন নেই বললেই চলে। এটার প্রচারে আমাদের কী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন? মাহিদুল ইসলাম : এটি করতে হলে রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্ব নিতে হবে। যতোই সরকারের সমালোচনা করি না কেন এটি করতে হলে রাষ্ট্র বা প্রশাসনের সহায়তাতেই করতে হবে। আমি মনে করি এ বিষয়ে আমাদের সরকার আন্তরিক, তবে শুধু সরকার আন্তরিক হলেই তো হবে না, এটা একটা চেইন বা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এখন এই চেইনের মধ্যে যারা থাকবে সবাইকে এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে, আন্তরিক হতে হবে ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতা নিয়ে যে শুধু নয় মাস যুদ্ধ করেই এদেশ স্বাধীন হয়নি, দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য একটি জাতির যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ঠ্য স্বতন্ত্র সংস্কৃতি এর সবকিছু রয়েছে।  মখ : রাষ্ট্র কীভাবে আমাদের দেশ নিয়ে বৈশ্বিক প্রচারণায় সফল হতে পারে সে ব্যাপারে কোনো পরামর্শ আপনার আছে কি? মাহিদুল ইসলাম : এ বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের জন্য সঠিক লোক আমি নই। তবুও একান্তই যদি আমার ব্যক্তিগত মতামত জানতে চাওয়া হয় তাহলে বলবো, আমাদের যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে অধিদপ্তরগুলো রয়েছে তাদের মহাপরিচালকগণ সম্মিলিতভাবে এ বিষয়ে আলাদা একটি উপ-কমিটি করে একটি রূপরেখা দাঁড় করায় দেশের মানুষের এবং বিদেশের মানুষের সামনে দেশকে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাহলে আমার মনে হয় এটি সম্ভব হবে। সুশৃঙ্খল এবং সুপরিকল্পিত স্বচ্ছ চিন্তার একটি প্রস্তাবনা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে পৌঁছালে আমাদের সংস্কৃতি বান্ধব সরকার নিশ্চই এটি অনুমোদন দিবেন সে বিশ্বাস আমার আছে। মখ : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন। মাহিদুল ইসলাম : নতুন প্রজন্মের আমার শ্রোতা ও ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলবো রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটি লাইন বলে, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে করেনা কখনও বঞ্চনা।’ আবৃত্তি শিল্প একটু কঠিন কিন্তু এর গভীরে পৌঁছাতে পারলে এটা অশেষ, এটা অনন্ত অন্মেষার পথ। এটি মানুষের আত্মাকে আলোকিত করে।  মখ : মনেরখবরে সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। মাহিদুল ইসলাম : ধন্যবাদ মনেরখবরকেও।