তারকার মন সাক্ষাৎকার

প্রত্যেকটা মুহূর্তই মানুষের স্মৃতি: সঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভীন

ছবিঃ .

কিংবদন্তিতুল্য সঙ্গীত শিল্পী তিনি। বিশেষ করে লালন শিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি আকাশ ছোঁয়া। সঙ্গীতময় কর্মজীবনে তিনি গেয়েছেন লোকগান, আধুনিক গান, দেশাত্মবোধক গানসহ অসংখ্য গান। পেয়েছেন ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচারাল প্রাইজ, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ দেশে বিদেশে অসংখ্য পুরষ্কার ও সম্মাননা। তিনি ফরিদা পারভীন। মনেরখবর পাঠকদের এবার তিনি জানাচ্ছেন তাঁর মনের কথা, ভালোলাগার কথা, স্বপ্নের কথা, পরিকল্পনার কথা, জীবন দর্শনের কথা। তাঁর সাথে কথা বলেছেন মুহাম্মদ মামুন। 

মখ : কেমন আছেন?

ফরিদা পারভীন : আল্লাহ্‌র রহমতে ভালো আছি।

মখ : ভালো থাকার জন্য কী করেন?

ফরিদা পারভীন : ভালো থাকার জন্য একটু নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চলাফেরা, যেহেতু নিয়ন্ত্রণহীনতা বিপর্যয় ঘটায় সেহেতু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে লোভলালসা হতে একটু পরিশুদ্ধতা লাভের চেষ্টা করি।

মখ : মন খারাপ হয়?

ফরিদা পারভীন : হ্যাঁ মন খারাপ হয়।

মখ : মন খারাপ হলে কী করেন?

ফরিদা পারভীন : মন খারাপের ব্যাপারটা একদিক থেকে ভালো, এতে পরমেশ্বরের সান্নিধ্য লাভে একনিষ্ঠ হওয়া যায়। আর যেহেতু আমি সঙ্গীতশিল্পী, লালনের গান করি, সঙ্গীতের জন্য কষ্টটা খুব দরকার।

মখ : কেন?

ফরিদা পারভীন : কারণ সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত বেদনাটা এবং যিনি গান করেন তার বেদনটা যদি মিলে যায় তাহলে যিনি গান করেন বা যারা গান শোনেন তাদের হৃদয় উপশম হয়।

নতুনরা লোকসঙ্গীতের ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী হচ্ছে, তারা গাইছে, বাজাচ্ছে। আবার একই সাথে নতুনদের আরেকটু সচেতন হতে হবে, বিশেষ করে আমাদের লোকসঙ্গীতের যে ধারা রয়েছে, ট্র্যাডিশনাল বাদ্যযন্ত্রের যে ব্যবহার রয়েছে, সেটির শিক্ষায় পরিপূর্ণতা আনতে। নইলে সাময়িক উন্মাদনা তৈরি হলেও তা মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পারবে না।

মখ : লালন শিল্পী হয়ে উঠার ইচ্ছেটা কীভাবে এলো?

ফরিদা পারভীন : লালন শিল্পী হয়ে উঠার ইচ্ছে আমার ছিল না। আমার যে সঙ্গীতগুরু মোকসেদ আলী সাঁই উনি স্বাধীনতার পর এক লালন উৎসবে আমাকে গাইতে বললেন। স্টেজে আমার প্রথম লালনের গান ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ গাইলাম। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে লালনের গানের প্রতি ভালোলাগা তৈরি হলো।

মখ : রাগ হয়?

ফরিদা পারভীন : হ্যাঁ হয়। হয়তো বড় কারণে অনেক সময় রাগ হয় না কিন্তু ছোট ছোট কারণে রাগ হয়ে যায়।

মখ : রাগ হলে কী করেন?

ফরিদা পারভীন : রাগ হলে অভিমানটা বেড়ে যায়। এমন অনেক রাগ আছে মনে হয় যার উপর রাগ হলো তার সাথে আর বেশি সময় সম্পর্ক রাখবো না। রাগ হলে দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টে যায়।

মখ : রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন কীভাবে?

ফরিদা পারভীন : রাগ হলে সচরাচর সেটা কাউকে বুঝতে দিতে চাই না, তারপও অনেক সময় অবয়ব দেখে অনেকে বুঝতে পারে কোনো কারণে আমি মনোক্ষুণ্ন আছি।

মখ : রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন জিনিষটা সবচাইতে জরুরি?

ফরিদা পারভীন : রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটু ধৈর্য্যশীল হতে হবে। সাঁইজি তাঁর কথার মধ্যেও রাগ নিয়ন্ত্রণের কথা বলে গেছেন, আবার আমরা যারা মুসলমান তাদের পবিত্র গ্রন্থেও মানুষকে ধৈর্য্য ধারণ করতে বলা হয়েছে।

মখ : হিংসা আছে?

ফরিদা পারভীন : আছে

মখ : হিংসাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ফরিদা পারভীন : হিংসাটা যদি ভালো কাজে বা ভালো উদ্দেশ্যে হয় তাহলে সেটি বরং ভালো। যেমন সে একটা ভালো কাজ করছে আমি কেন করছি না। এমন একটা মনোভাব সবার জন্যই ভালো।

মখ : স্মৃতিকাতরতা আছে?

ফরিদা পারভীন : প্রত্যেকটা মুহূর্তই তো মানুষের স্মৃতি। এরপর একদিন অনন্তকালের কাছে চলে যেতে হবে, দুনিয়ার যা কিছু স্মৃতি সব নীরবে নিরাঞ্জন হবে, অর্থাৎ সব স্মৃতি পানিতে মিশে যাবে। তাই এ স্মৃতি মূল্যহীন। সেজন্যই সাঁইজি বলেছেন,
গুণে পড়ে সারলি দফা
করলি রফা গোলেমালে।
ভাবলিনে মন কোথা সে ধন
ভাজলি বেগুন পরের তেলে।।”

মখ : তারপরও যতক্ষণ আমরা বেঁচে থাকি দুনিয়ার কোনো না কোনো স্মৃতি আমাদের মনকে নাড়া দেয়?

ফরিদা পারভীন : যতক্ষণ শ্বাস আছে ততক্ষণ তো স্মৃতি রোমন্থনের ব্যাপারটাও আছে। ছোটবেলার স্মৃতি, কৈশোরের স্মৃতি, পরিণত বয়সের স্মৃতি, সন্তানের মা হওয়ার স্মৃতি। এ স্মৃতিগুলো রোমন্থন করতে ভালো লাগে।

মখ : কোন স্মৃতি আপনাকে সবচাইতে বেশি আনন্দ দেয়?

ফরিদা পারভীন : সবচাইতে বেশি আনন্দ লাগে মঞ্চে গান গাওয়ার স্মৃতিগুলো। গান গেয়ে যখন দর্শক শ্রোতাদের ভালোবাসা পাই বা আমার গাইতেও ভালো লাগে। আর ঐ মুহুর্তগুলোর স্মৃতি আমাকে অনেক বেশি আনন্দ দেয়। আবার কখনও উল্টোটাও হয়, কখনও হয়তো আমি গান গাওয়ার মুড পাচ্ছি না বা গান গাইতে গিয়ে নিজের কাছে নিজে আমি হোঁচট খাচ্ছি। শ্রোতারা হয়তো সেটি বুঝতে পারছে না কিন্তু নিজের কাছে নিজের এইযে হোঁচট খাওয়া সেটি আমাকে কষ্ট দেয় অনেকদিন।

মখ : স্বপ্ন দেখেন?

ফরিদা পারভীন : স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি আমার ফাউন্ডেশন নিয়ে আমার চিন্তা নিয়ে আমার সঙ্গীতের প্রতিষ্ঠান ‘অচিন পাখি’ নিয়ে।

মখ : কেমন সে স্বপ্নগুলো?

ফরিদা পারভীন : স্বপ্ন আছে আমার ফাউন্ডেশন দিয়ে লোকগানের জন্য কাজ করা। স্বপ্ন আছে ‘অচিন পাখি’ শিক্ষালয়ের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের গান শেখানো বা ছবি আঁকা শেখার কাজকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

মখ : বাংলা লোকগান নিয়ে আপনার পরিকল্পনাগুলো কী?

ফরিদা পারভীন : লোকগানের যেহেতু স্বরলিপি হয় না তাই লোকগানগুলো সবসময় পরিবর্তনশীল। আমি আমার গুরুর থেকে সঙ্গীতের যে তালিম পেয়েছি সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা আছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে আমি আমার “ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশন” এর মাধ্যমে একটি লালন গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার। সেখানে লোকগানের গবেষণা হবে। লোকগানের যে যন্ত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছে সেগুলোকে সংরক্ষণ করা। আগামি প্রজন্ম যাতে দেখে বুঝে যে এটিই আমাদের শেকড়, এটিই আমাদের পরিচয় বহন করে। আগামীর প্রজন্ম যাতে দেখতে পারে বুঝতে পারে যে অনেক অনেক জাতির চাইতে আমাদের ঐহিত্য অনেক অনেক সমৃদ্ধ। এখানে লালন ফকির আছেন, হাসন রাজা আছেন, রাধা রমণ দত্ত আছেন, উকিল মুন্সী আছেন, দুদু শাহ্‌ আছেন, জালাল খাঁ সহ আরো অনেক অনেক মরমী কবি যে দেশে রয়েছেন সেদেশের সংস্কৃতি অনেক অনেক সমৃদ্ধ।

মখ : পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পৃষ্ঠপোষকতা কেমন পাচ্ছেন?

ফরিদা পারভীন : পৃষ্ঠপোষকতা হয়তো সেভাবে আমি চাইনি। তবুও কিছু মানুষ আমার ফাউন্ডেশনের কথা জানে। এখানে একটু অভিমানও কাজ করে। কাউকে জাতীয় ভাবে পুরস্কৃত করা হলে সরকারেরও বোধহয় কিছু দায়িত্ব থাকে যে কারণে একজনকে জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হলো তাকে সে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহযোগিতা করা।

ছবিঃ

মখ : বাংলাদেশে এখন বেসরকারি পর্যায়ে লোক সঙ্গীতের উপর আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। এটা লোক সঙ্গীতকে কতটা অনুপ্রাণিত করছে বলে মনে করেন?

ফরিদা পারভীন : অবশ্যই এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গীতের শেকড় এসে আমাদের দেশে মিশছে। আমাদের দেশের মানুষ নিজেদের সঙ্গীতের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গীতের সাথে পরিচিত হচ্ছে।

মখ : আমাদের যে লোকগানের ধারা সেটার মূল সুরটা কি অন্য দেশের মানুষজনের কাছে পৌঁছুচ্ছে?

ফরিদা পারভীন : এ ব্যাপারটা একটু প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। যন্ত্রের অতি ঝনঝনানির মধ্যে লোকগানের মূল সুরটা হয়তো অনেকটাই হারিয়ে যায়।

মখ : বাংলা লোকসঙ্গীতে এখন অনেক নতুন মুখ আসছে। এটা কি বাংলা লোকসঙ্গীতের একটা বিপ্লব হিসেবে আমরা বলতে পারি না?

ফরিদা পারভীন : অবশ্যই এটা একটি শুভ সংবাদ। নতুনরা লোকসঙ্গীতের ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী হচ্ছে, তারা গাইছে, বাজাচ্ছে। আবার একই সাথে নতুনদের আরেকটু সচেতন হতে হবে বিশেষ করে আমাদের লোকসঙ্গীতের যে ধারা রয়েছে ট্র্যাডিশনাল বাদ্যযন্ত্রের যে ব্যবহার রয়েছে সেটির শিক্ষায় পরিপূর্ণতা আনতে। নইলে সাময়িক উন্মাদনা তৈরি হলেও তা মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পারবে না।

মখ : আপনি নিজে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের লোকসংগীতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন একই সাথে দেশে বিদেশে পেয়েছেন অনেক অনেক সর্বোচ্চ পুরষ্কার ও সম্মাননা। বাংলা লোকগান নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

ফরিদা পারভীন : আসলে সুর সঙ্গীত এগুলো হলো শাশ্বত। যে দেশ যে ভাষাই হোক, সুরের অনুভূতিটা সব দেশেই সব জাতিতেই এক। যেমন আমি আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা বলি, সুইডেনের এক অনুষ্ঠানে আমি গান করছি, গান শুনে দেখলাম সুইডেনের রাণি কাঁদছে। গান শেষে উনি আমাকে বললেন, আমি তোমার ভাষা বুঝিনা। কিন্তু গানের সুরটাই আমাকে বলে দিচ্ছে এটি একটি মরমী গান।

মখ : ব্যক্তি জীবনে আপনার মধ্যে চাওয়া পাওয়ার দূরত্ত্ব কতটুকু?

ফরিদা পারভীন : চাওয়ার চাইতে পেয়েছি অনেক বেশি। এক সময় চাওয়া ছিল শুধু রেডিওতে গান গাইতে পারার। এরপর একে একে টেলিভিশন, গানের অ্যালবাম, বিভিন্ন দেশে বাংলা লোকগানের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ, দেশে বিদেশে পুরষ্কার ও সম্মাননা, মানুষের ভালোবাসা। পরিশেষে আল্লাহ্‌র অভিপ্রায় ছাড়া কোনো কিছু সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ্‌ আমাকে দিয়েছেন অনেক।

মখ : সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

ফরিদা পারভীন : পাঠকদের উদ্দেশ্যে লালন সাঁই-এর বলা দু’টি কথা বলবো শুধু। এক, সময় গেলে সাধন হবে না। দুই, সত্য বল সুপথে চল। সময় থাকতে সাবাই সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক সুন্দর জিনিসগুলোকে গ্রহণ করে সত্য ও সুপথে চলার বাসনা তৈরি করুক সবাই। আমাদের এই বাংলা ভাষায় অনেক অনেক সুন্দর উপাত্ত রয়েছে সুন্দর গল্প কবিতা গান রয়েছে সেগুলো তারা গ্রহণ করুক এবং অসুন্দরকে প্রত্যাখ্যান করুক।

মখ : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

ফরিদা পারভীন : ধন্যবাদ আপনাকেও।