তারকার মন সাক্ষাৎকার

বাস্তবতা মেনে নিয়ে চলতে পারাটাই ভালো থাকা: ফুটবলার কায়সার হামিদ

ছবিঃ

বাংলাদেশ ফুটবলের স্বর্ণালী সময়ের তারকা ফুটবলার তিনি। বাবা বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ। মা রাণী হামিদ খ্যাতিমান দাবাড়ু এবং প্রথম বাংলাদেশি মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার। আশি ও নব্বইয়ের দশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মোহামেডার স্পোর্টিং ক্লাবের। দলনেতা হিসেবে খেলেছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে। তিনি কায়সার হামিদ। মনেরখবর পাঠকদের মুখোমুখি হয়ে এবার তিনি জানাচ্ছেন তাঁর মনের কথা, ভালো লাগার কথা, ভালো থাকার কথা, খেলাধুলা নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ মামুন।  

মখ : কেমন আছেন?

কায়সার হামিদ : আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি।

মখ : ভালো থাকতে কী করেন?

কায়সার হামিদ : ভালো খারাপ মিলিয়েই জীবন। জীবনে চলতে গেলে ভালো মন্দ সবকিছুই সামনে আসবে। বাস্তবতা মেনে নিয়ে চলতে পারাটাই ভালো থাকা।

এটা দুঃখজনক যে ফুটবলে আমাদের সেই মানটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এখন অনেক জায়গায় লীগ হয় না। লীগ না হওয়ার কারণে সম্ভাবনাময় তরুণ খেলোয়াড়দের আমরা বের করে আনতে পারছি না। বিশ্বকাপে আমরা অনেক দেশ দেখি যাদের জনসংখ্যা ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাইতেও কম, কিন্তু তারপরও তারা সুন্দর দল তৈরি করেছে, কিন্তু আমাদের এত জনসংখ্যা থাকার পরও আমরা দল তৈরি করতে পারছি না।

মখ : মন খারাপ হয়?

কায়সার হামিদ : হ্যাঁ, সবার মাঝেই মন খারাপের ব্যাপারটা খুব সাধারণ।

মখ : কী কী কারণে বেশি মন খারাপ হয়?

কায়সার হামিদ : যখন দেখি কোনো কিছু মন মতো হচ্ছে না, প্রত্যাশিত কাজটি করতে পারছি না, কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছি ইত্যাদি কারণগুলোতে বেশি মন খারাপ হয়।

মখ : মন ভালো করার জন্য কী করেন?

কায়সার হামিদ : যে সমস্যাটার জন্য মন খারাপ সেটাকে সমাধান করার চেষ্টা করা অথবা যদি সমাধানের পথ না পাই তাহলে অপেক্ষা করা।

মখ : স্মৃতিকাতরতা আছে?

কায়সার হামিদ : ভালো। হ্যাঁ আছে। অতীতের বিভিন্ন ঘটনা, কোনো সুখস্মৃতি অথবা কোনো ভুল-ত্রুটি এসব নিয়ে ভাবনা আসে কখনও কখনও।

মখ : জীবনের জন্য স্মৃতি কাতরতার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি?

কায়সার হামিদ : ভালো। প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক স্মৃতি রোমন্থন মানুষের মাঝে থাকবেই। তাছাড়া স্মৃতি কাতরতা বা পুরোনো স্মৃতি মনে করে কখনও নিজের ভুলগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো শুধরে নেয়ার একটা প্রচেষ্টা চালানো যায়।

মখ : কোন স্মৃতিগুলো আপনাকে বেশি কাতর করে?

কায়সার হামিদ : এমন তো অনেক স্মৃতি আছে। ছোটবেলার স্মৃতি, স্কুল জীবনের স্মৃতি, খেলোয়াড়ি জীবনের স্মৃতি।

মখ : খেলোয়াড়ি জীবনের একটি স্মৃতি আমাদের বলবেন কি?

কায়সার হামিদ : মোহামেডানের হয়ে প্রথম দিকের এক দুইটা ম্যাচ খেলার পর মোটামুটি বেশ ভালো পরিচিতি পাই। কিন্তু নতুন খেলোয়াড় বলে আসল নামটা সেভাবে আসেনি। কাউসার আহমেদ, কায়সার উদ্দিন একেক জায়গায় একেক নাম। আমার এক ক্লাসমেট ছিল মোহামেডানের সাপোর্টার। সে আমাকে এসে বলছে, “দোস্ত শোনলাম মোহামেডানে নতুন এক ডিফেন্ডার আসছে। ভাবছি সামনের ম্যাচ দেখতে যাবো। তুই যাবি?” এটা শুনে আমি হেসে দিলাম। আরেকটু রহস্য করার জন্য তাকে কিছু বললাম না।

মখ : খ্যাতির সাথে নাকি খ্যাতির বিড়ম্বনাও থাকে। আপনার ক্ষেত্রে কোনো বিড়ম্বনা?

কায়সার হামিদ : আমরা যখন খেলতাম তখন ফুটবলের কোনো ঘটনা ছিল সারা দেশের আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে প্রথম সাড়ির ক্লাবগুলোর খেলোয়াড়দের সবাই চিনতো। সে সময় বাইরে বের হলে মানুষের ভীড় জমে যেতো যার কারণে স্বাভাবিকভাবে পথে চলতে পারতাম না। তাছাড়া দল কোনো কারণে হেরে গেলে তো কথাই ছিল না, দুই তিন ঘন্টা পর পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে মাঠ থেকে বের হতাম আমরা।

মখ : ফুটবলে এলেন কীভাবে?

কায়সার হামিদ : কিছুটা হঠাৎ করেই আমার ফুটবলে আসা। ১৯৮২ তে টাংগাইলে “ডিসি কাপ” ফুটবলে আমরা গুলশান বনানীর কলেজ পড়ুয়ারা মিলে একটা টিম করে খেলতে গিয়েছিলাম। সেখানে মঞ্জু ভাই আমার খেলা দেখে প্রথমে আমার নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর বললেন রহমতগঞ্জ ক্লাবে একজন ডিফেন্ডার লাগবে তুমি রহমতগঞ্জের হয়ে খেলো। তারপর মঞ্জু ভাই নিজ উদ্যোগে আমাকে রহমতগঞ্জ ক্লাবে নিয়ে গেলেন সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, রেজিস্ট্রেশন করিয়ে দিলেন। তারপর সেখান থেকে আমার আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

মখ : র্তমানে মাঠে দর্শক হয় না, ফুটবল নিয়ে আপনাদের সময়ের মতো উত্তোজনাও এখন আর দেখা যায় না। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

কায়সার হামিদ : এখন অনেক চ্যানেল, টিভি খুললেই মানুষ বিশ্ব মানের খেলা দেখতে পারছে। মাঠে দর্শক না থাকার এটা একটা কারণ হতে পারে। আরেকটা কারণ হতে পারে, খেলার মান আগের থেকে অনেক কম। এক সময় নাইজেরিয়া, রাশিয়া, ইরান এসব দেশের জাতীয় দলের বিখ্যাত খেলোয়াড়রা এখানকার ক্লাবগুলোতে খেলে গেছে। আমাদের সময় মোহামেডান একবার এশিয়ান ক্লাব কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। বর্তমানে এমন অর্জনের কথা ভাবাই যায় না।

মখ : বাংলাদেশ ফুটবলের এই বিপরীতমুখি গতি কেন?

কায়সার হামিদ : এটা দুঃখজনক যে ফুটবলে আমাদের সেই মানটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এখন অনেক জায়গায় লীগ হয় না। লীগ না হওয়ার কারণে সম্ভাবনাময় তরুণ খেলোয়াড়দের আমরা বের করে আনতে পারছি না। বিশ্বকাপে আমরা অনেক দেশ দেখি যাদের জনসংখ্যা ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাইতেও কম, কিন্তু তারপরও তারা সুন্দর দল তৈরি করেছে, কিন্তু আমাদের এত জনসংখ্যা থাকার পরও আমরা দল তৈরি করতে পারছি না।

মখ : ফুটবলের মান উন্নয়নে কি করা যেতে পারে?

কায়সার হামিদ : একটা কাজ করা যেতে পারে, স্কুল লেভেলে অনূর্ধ ১০/১২ বছর বয়সী ছেলেদের থেকে আমরা যদি খেলোয়াড় বাছাই করতে পারি এবং তাদের সাত আট বছর সঠিক ট্রেনিং দিতে পারি তাহলে সেখান থেকে খুব ভালো একটা দল বের হয়ে আসবে বলেই আমার বিশ্বাস। তাছাড়া বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতিষ্ঠান বা তার সহ-প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকেও ভালো খেলোয়ার প্রস্তুত করা সম্ভব। তবে সবকিছু তখনও সম্ভব হবে যখন সত্যিকারের ভালো সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের এরমধ্যে নিয়ে আসা যাবে। কারো অনুরোধে বা কারো ফোনে নয়। তাহলে শুধু ফুটবল নয়, সব সেক্টরেই দেশ ভালো করবে।

ছবিঃ

মখ : আবারো ব্যক্তিগত প্রশ্ন। ফুটবলার না হলে কি হতেন?

কায়সার হামিদ : ইন্টারের পর আমার আমেরিকা চলে যাওয়ার কথা ছিল। সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম এবং সবকিছু ঠিকঠাকও হয়ে গিয়েছিল। ফুটবলে এভাবে একটা সুযোগ তৈরি না হলে হয়তো আমেরিকা চলে যেতাম।

মখ : অবসরে কি করেন?

কায়সার হামিদ : অবসরে ফেসবুক ব্যবহার করি, টিভি দেখি। এইতো।

মখ : প্রেমে পড়েছেন কখনও?

কায়সার হামিদ : একবারই প্রেমে পড়েছিলাম, যে বর্তমানে আমার স্ত্রী। তাই আর প্রেমে পড়ার সুযোগ হয়ে উঠেনি। (হাসি)

মখ : আরেকবার প্রেমে পড়ার সুযোগ পেলে কি করবেন?

কায়সার হামিদ : এখন তো আর সে সুযোগ নেই। তাই সুযোগ পেলে কি করব সেটা ভাবারও সুযোগ নেই।

মখ : আরেকটি জীবন পেলে কি হতে চাইবেন?

কায়সার হামিদ : যেহেতু পারিবারিকভাবে খেলাধুলার আবহের মধ্যে বড় হয়েছি, তাই আরেকটি জীবন পেলেও চাইবো খেলাধুলার মাঝেই থাকতে।

মখ : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমরাও চাই আপনি খেলাধুলার মাঝেই থাকুন এবং যুগে যুগে কায়সার হামিদেরা এদেশের ফুটবলকে নেতৃত্ব দিক।

কায়সার হামিদ : ধন্যবাদ মনেরখবরের সকলকে।