তারকার মন সাক্ষাৎকার

যতদিন বেঁচে আছি ততদিন জানতে চাই শিখতে চাই: বারী সিদ্দিকী

খ্যাতিমান সংগীত শিল্পী, গীতিকার ও বংশী বাদক তিনি। সঙ্গীত অঙ্গনে বংশী বাদক হিসেবে পরিচিত থাকলেও নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে সঙ্গীত শিল্পী হিসবে উঠে আসেন খ্যাতির শিখরে। লোকজ ধারার এবং মরমী সঙ্গীতই তাঁর গানের প্রধান উপজীব্য। তিনি বারী সিদ্দিকী। মনের খবরের মুখোমুখি হয়ে এবার তিনি জানাচ্ছেন তাঁর মনের কথা, গানের কথা, ইচ্ছার কথা, স্বপ্নের কথা, জীবন দর্শনের কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ মামুন। মখ : কেমন আছেন? বারী সিদ্দিকী : ভালো আছি। মখ : কি আপনাকে বেশি ভালো রাখে? বারী সিদ্দিকী : আমার দর্শন হচ্ছে জীবন যেখানে যেমন। অর্থাৎ সব পরিবেশেই নিজেকে ভালো রাখার বা ভালো থাকার চেষ্টা করি। কারণ জীবনটা কখনও এক রকম যাবে না বা একই অবস্থায় থাকবে না। জীবনের এই পরিবর্তন এবং উত্থান পতনকে সত্য ধরে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। এই সত্যটি আমরা যদি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি তাহলে ভালো থাকার ব্যাপারটি সার্বক্ষণিক সঙ্গী করা যাবে। মখ : তারপরও বিশেষ কিছু কি আছে যা পেলে আপনি আরো বেশি ভালো বোধ করেন? বারী সিদ্দিকী : যখন নিজের কাজের মধ্যে থাকি তখন ভালো থাকি। বিশেষ করে আমার সঙ্গীত আমার বাঁশি এসব আরকি। যখন গান করি, যখন গান লিখি যখন গানের মাঝে থাকি তখন বেশি ভালো থাকি।  আমার ধারণা প্রতিটা সৃষ্টিশীল মানুষই নিজের সৃষ্টির সময়টাতে বেশি ভালো থাকে।
সব বাংলা গানই যে মরমী গান তেমনটি নয়। আবার এটাও ঠিক বাংলা গানের একটা বড় অংশজুড়ে মরমীবাদ রয়েছে। প্রয়াত কবিগণ লিখে গেছেন। লালন সাঁই ছিলেন, হাসন রাজা ছিলেন, রাধারমণ ছিলেন এমন অনেক অনেক মরমী কবি গায়ক বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। আমাদের সংস্কৃতিতে মরমীবাদ খুব গভীরে মিশে আছে। জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার বন্ধন, পুরুষ ও প্রকৃতির যে দর্শন, ভক্তি ও ভালোবাসায় স্রষ্টার নৈকট্য লাভের চেষ্টা এর সবকিছু আবহমান কাল ধরে শুধু সঙ্গীতকে নয় আমাদের সম্পুর্ণ সংস্কৃতিকেই প্রভাবিত করেছে এবং এখনও করছে।
মখ : গান এবং বাঁশি এই দুটোর মধ্যে আপনার বেশি প্রিয় কোনটি? বারী সিদ্দিকী : এখন তো গানই আমার কাছে প্রধান। কালের স্রোতে এখন বয়স হয়ে গেছে তাই বাঁশি বাজাতে তেমন একটা জোর পাই না। তবে বাঁশিটা আমার হৃদয়ের গভীরে থেকে যায় সব সময়। মখ : বৈশ্বিক দৃষ্টিতে বাংলা গানকে কোন অবস্থানে দেখেন? বারী সিদ্দিকী : বাংলা গানের নিজস্ব একটা গতি আছে, নিজস্ব একটা ঐতিহ্য আছে এবং এই ঐতিহ্যটা সব দিক থেকে সমৃদ্ধ। বিশ্বের অন্যান্য লোকজ গানগুলোর দিকে তাকান তাহলে দেখবেন আমাদের আবহমান বাংলার গান তাদের কোনটির থেকেই কোন দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। নিজের গতিতেই বাংলা গান বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষীর কাছে ছড়াচ্ছে। আমি বিদেশে অন্য ভাষাভাষীদের সামনে যখন গান করেছি তখন দেখেছি তারা গানগুলো কতটা হৃদয় দিয়ে শ্রবণ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা গান নিয়ে গবেষণা হয়। মখ : বিভিন্ন স্থানে গান গাওয়ার ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? বারী সিদ্দিকী : এখানে তিন ধরণের অভিজ্ঞতা আছে। এক, বাংলাদেশে বাংলাভাষীদের সামনে গান করা। দুই, বিদেশে বাংলাভাষীদের সামনে গান করে। তিনি, বিদেশে বিদেশিদের সামনে গান করা। দেশের মানুষ ভাষাটা বোঝে এবং অনেকেরই গানগুলো আগের থেকে শোনা থাকে বলে অনেক সময় সবাই একসাথে গান শোনার প্রতি মনোযোগী হয় না। এক্ষেত্রে বিদেশিরা ভীষণ মনোযোগী। বিদেশিদের সামনে গান করার সময় লক্ষ্য করেছি একেবারে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করে। সবাই মন দিয়ে গান শোনে। এর একটা কারণও অবশ্য আছে, অনেক বিদেশির কাছে গানটি বা সুরটি থাকে একেবারের নতুন এবং ভিন্ন ধরণের। আবার অন্য ধরণের বিদেশি শ্রোতা আছেন যারা বিভিন্নজনের থেকে শুনে বা বিভিন্ন গবেষণায় বাংলা গানের কথা জেনে আমাদের গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মখ : সঙ্গীতে আসলেন কীভাবে? বারী সিদ্দিকী : আমরা তিন ভাই ছিলাম। বড় ভাইয়েরা বাজাতো তাঁদের পথ অনুসরণ করেই মূলত আমার সঙ্গীতে আসা। পরবর্তীতে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় নেত্রকোনায় শ্রী গোপাল দত্তের থেকে ক্লাসিক্যাল মিউজিকের তালিম নেই। এরপর ঢাকা এসে উস্তাদ আমিনুর রহমানের কাছে শিখি। উস্তাদ আমিনুর রহমানের মাধ্যমেই সঙ্গীতের বিভিন্নজনের সাথে পরিচিতি ও মেলামেশার সুযোগ পাই। এভাবেই সঙ্গীতে আমার পথচলা। গায়ক হিসবে আমার যে পরিচিতি সেটি আসে মূলত নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মাধ্যমে। মখ : একজন শিল্পীর কি কি গুণাবলী থাকা প্রয়োজন? বারী সিদ্দিকী : প্রতিটা জিনিষের পেছনে কাজ লাগে, সাধনা লাগে। কার কি কাজ সেটি বুঝতে হবে এবং সে বিষয়ে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আর সঙ্গীতের ব্যাপারটাই এমন যে এটি একা একা শেখা যায়। সঙ্গীত সম্পূর্ণ গুরুমুখী বিদ্যা। গুরুর বাড়ি থেকে তালিমপ্রাপ্ত হয়ে তবেই সঙ্গীতে আসতে হবে। আর আমরা যে কেউ আসলে কিছুই জানিনা সেটিকে নিজের ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে হবে। মখ : বিভিন্ন লোকজ গানকে এখন দেখা যায় বিভিন্ন সুরের বৈচিত্র্য তৈরি করে পরিবেশন করা হয়। এটা ঠিক কতটুকু গ্রহণযোগ্য? বারী সিদ্দিকী : সুর পরিবর্তন করলে সেটা হবে মহা অন্যায়। তবে বাদ্যযন্ত্রের উন্নতি করা যেতে পারে। সবকিছু ডিজিটালাইজ হচ্ছে, সঙ্গীতও সেক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। যারাই গান করুক বা সুর বাজাক তাদের সবারই সুর আর বেসুরের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। বুঝতে হবে কোথায় কি মেশালে তার স্বাদ বিস্বাদ হয়ে যায় না। মখ : বাংলা গানে মরমীবাদ একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এই দিকটি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? বারী সিদ্দিকী : সব বাংলা গানই যে মরমী গান তেমনটি নয়। আবার এটাও ঠিক বাংলা গানের একটা বড় অংশজুড়ে মরমীবাদ রয়েছে। প্রয়াত কবিগণ লিখে গেছেন, লালন সাঁই ছিলেন, হাসন রাজা ছিলেন, রাধারমণ ছিলেন এমন অনেক অনেক মরমী কবি গায়ক বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। আমাদের সংস্কৃতিতে মরমীবাদ খুব গভীরে মিশে আছে। জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার বন্ধন, পুরুষ ও প্রকৃতির যে দর্শন, ভক্তি ও ভালোবাসায় স্রষ্টার নৈকট্য লাভের চেষ্টা এর সবকিছু আবহমান কাল ধরে শুধু সঙ্গীতকে নয় আমাদের সম্পুর্ণ সংস্কৃতিকেই প্রভাবিত করেছে এবং এখনও করছে। মখ : মরমীবাদের যে বিভিন্ন ধারা যেমন বাউল, মুর্শিদি, চৈতন্য ইত্যাদি দেখতে পাই এগুলোর মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি? বারী সিদ্দিকী : কথা বা সুর এসবের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও মূল উদ্দেশ্য সবার এক। সবাই তাঁদের গান ও দর্শনের মাধ্যমে পরমাত্মা বা মহান স্রষ্টার সন্ধান করে গেছেন। জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিশে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া সেটাই তাঁদের গানের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে।

মখ : ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। মন খারাপ হয়? বারী সিদ্দিকী : আমার মানসিক স্তরটা একটু ভিন্ন। আমি যেকোনো অবস্থাতেই ভালো থাকি। এই আমি আসলে আমার নই, আমি সেবক মাত্র। সর্ব-স্রষ্টা যিনি রয়েছেন সবকিছু তাঁরই। তিনি আমাকে যে অবস্থায় রাখেন সেটাই আমার অবস্থা। তাই নিজেকে মানসিকভাবে কখনও খারাপ মনে করি না। যদি কোন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ি তখন ভাবি আমার চাইতেও অনেক অনেক খারাপ অবস্থায় মানুষ রয়েছে। যা হচ্ছে সবই মহান স্রষ্টার ইচ্ছা। মখ : স্বপ্ন দেখেন? বারী সিদ্দিকী : যতদিন বেঁচে আছি ততদিন জানতে চাই শিখতে চাই। এটাই আমার একমাত্র স্বপ্ন। মখ : ব্যক্তি জীবনে চাওয়া পাওয়ার দূরত্ব কতটুকু? বারী সিদ্দিকী : একটা সময় ছিলো যখন অনেক চাওয়া ছিলো কিন্তু এখন আর নেই। মহান আল্লাহ্‌ পাক আমাকে এত বেশি দিয়েছেন যে এরপর আসলে চাওয়ার আর কিছু থাকে না। কোনদিন ভাবিনি যে এক সময় সারা দেশের মানুষ আমাকে চিনবে জানবে। আমার জীবদ্দশায় এত জনপ্রিয়তা পাবো মানুষের এত ভালোবাসা পাবো এটা ছিলো আমার কল্পনারও অতীত। মখ : সফল হতে গেলে বা জনপ্রিয় হতে গেলে কি করা প্রয়োজন? বারী সিদ্দিকী : এগুলো সব ভাগ্যের লিখন। কে সফল হবে আর কে বিফল হবে সেটি স্রষ্টার ইচ্ছা। আমাদের সবার দায়িত্ব শুধু নিজের কাজটুকু ঠিকমতো করা। কর্মটুকুই আমার, ফলের উপর আমার কোন হাত নেই। ফল কি হবে সেটা আল্লাহ্‌ পাকই ঠিক করবেন। মখ : বাংলা সঙ্গীতকে কোন অবস্থানে দেখতে চান? বারী সিদ্দিকী : দেখতে চাই আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা গান ভালো করছে। ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্টিভালের মতো এমন আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন এদেশেও অনেক হচ্ছে। এসবই আমার চাওয়া। মখ : আপনার গাওয়া গানগুলোর মধ্যে প্রিয় গান কোনটি? বারী সিদ্দিকী : অনেকগুলো গান আছে। সুয়া চান পাখি, আমি একটা জিন্দা লাশ, আমার মন্দ স্বভাব ইত্যাদি অনেক গান। মখ : শ্রোতা ভক্তদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন। বারী সিদ্দিকী : শ্রোতা ভক্তদের উদ্দেশ্যে শুধু এইটুকুই বলবো তাঁরাই আমার সবকিছু। তাঁদের থেকে যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি তাঁর প্রতিদান দেয়ার সাধ্য আমার নেই। সবার থেকে এত ভালোবাসা যে আমি পাবো সেটি কখনও ভাবিনি। মহান স্রষ্টার ইচ্ছায় মানুষ আমাকে ভালোবেসেছেন, আমার গাওয়া গানগুলোকে গ্রহণ করেছেন, জনপ্রিয়দের তালিকায় আমার নাম তুলেছেন এজন্য আমি অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি। মখ : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে মনের খবরে সময় দেয়ার জন্য? বারী সিদ্দিকী : মনের খবরকেও ধন্যবাদ আমার সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য।