মূল পাতা / তারকার মন / গান মনে শান্তি আনে বলেই চিকিৎসায় গান থেরাপি ব্যবহার করা হয়: রথীন্দ্রনাথ রায়
গান মনে শান্তি আনে বলেই চিকিৎসায় গান থেরাপি ব্যবহার করা হয়

গান মনে শান্তি আনে বলেই চিকিৎসায় গান থেরাপি ব্যবহার করা হয়: রথীন্দ্রনাথ রায়

বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের প্রখ্যাত শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় । ভাওয়াইয়া গানের এই শিল্পী দেশাত্মবোধক গান গেয়ে মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন । তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন করে মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা পালন করেন এবং কণ্ঠযুদ্ধশিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন । নিউইয়র্কে বসবাসকারী একুশে পদকজয়ী এই শিল্পী সম্প্রতি দেশে এসেছেন। প্রতি বছরেই তিনি ছুটে আসেন নাড়ির টানে । পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মনের খবর-এর সাথে কথা বলেছেন নিজের মন, গান ও অন্যান্য নানা প্রসঙ্গ নিয়ে । সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মামুন মিজানুর রহমান ।
‘আমি হতাশাকে পাত্তা দিই না । হতাশ হওয়ার আগে নিজের ভুলগুলো খুঁজি । আমার চাহিদা কম, তাই হতাশ হতে হয় না । আমি সুস্থ শরীর নিয়ে, সুন্দর মন নিয়ে, মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে চাই । ।
মখ : কেমন আছেন? রথীন্দ্রনাথ রায় : ভালো আছি, ভালো আছি বলেই কথা বলতে পারছি। মখ : ভালো থাকার জন্য কী প্রয়োজন? রথীন্দ্রনাথ রায় : ভালো থাকার জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ থাকা, মনকে পবিত্র রাখা এবং মিথ্যা না বলা। মখ : গান শিখতে হলে কীভাবে মনের যত্ন নেওয়া উচিত? রথীন্দ্রনাথ রায় : গান শিখতে হলে শুধু মনের যত্ন নেওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রচুর শ্রম দিতে হবে । শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকতে হবে গানের প্রতি । শুদ্ধতায় থাকাই সব চেয়ে বড়। মনের পবিত্রতা ছাড়া সৃষ্টি করা যায় না । শুধু গান নয়, যেকোনো কাজ ভালোভাবে করতে হলে প্রচুর মনযোগ দিতে হবে । মখ : কখন রেগে যান? রেগে গেলে কী করেন? রথীন্দ্রনাথ রায় : কোনো কিছু নিজের মতের বিপক্ষে গেলে মানুষ রেগে যায় । আমি সাধারণত কেউ মিথ্যা বললে রেগে যাই । এক্ষেত্রে আমি নিজের দুর্বলতা ও যুক্তিগুলো ব্যবহার করি, তাতেই রাগ কমে আসে । মখ : রাগ কমাতে গান কি কোনো সাহায্য করতে পারে? রথীন্দ্রনাথ রায় : অবশ্যই গান এক্ষেত্রে সাহায্য করে । গান মনে পবিত্রতা আনে । গান বিশেষে ব্যক্তির উপর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া হয় । গানের মাধ্যমে পৃথিবীর নানা দেশে এখন রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। গান মনে শান্তি আনে বলেই চিকিৎসায় গান থেরাপি ব্যবহার করা হয়। মখ : স্বপ্ন দেখেন? কী ধরনের স্বপ্ন দেখেন? রথীন্দ্রনাথ রায় : এখনও আমি অনেক স্বপ্ন দেখি । ব্যক্তিজীবন নিয়ে, দেশ নিয়ে এখনও নানা স্বপ্ন দেখি । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতাম । স্বপ্ন মানে পরিকল্পনা । স্বপ্ন ছাড়া মানুষ উঁচুতে যেতে পারে না । স্বপ্ন ছাড়া অগ্রসর হওয়া যায় না । মখ : স্মৃতিতাড়িত হন? রথীন্দ্রনাথ রায় : আমি স্মৃতিতে হারিয়ে যেতে পছন্দ করি । স্মৃতি আমার কাছে বেদনার নয়, আনন্দের । দুঃখের স্মৃতিও মাঝে মাঝে আমাকে তাড়িতে করে, তবে তা ক্ষণিকের জন্য । মুক্তিযুদ্ধ এখনো আমাকে স্মৃতিতাড়িত করে । সেই স্মৃতি এখনো এতটাই জীবন্ত, মনে হয়, এই তো সেদিন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে । মখ : প্রবাস জীবনে কীভাবে মন ভালো রাখার চেষ্টা করেন? রথীন্দ্রনাথ রায় : পিতা হিসেবে সন্তানদের সময় দিই । চাকুরি ছেড়ে ৪ বছর অসুস্থ মায়ের সেবা করেছি । কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা, গান ও আড্ডায় মন ভালো রাখি। মখ : কখনো হতাশায় ভুগেন? রথীন্দ্রনাথ রায় : আমি হতাশাকে পাত্তা দিই না । হতাশ হওয়ার আগে নিজের ভুলগুলো খুঁজি । আমার চাহিদা কম, তাই হতাশ হতে হয় না । আমি সুস্থ শরীর নিয়ে, সুন্দর মন নিয়ে, মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে চাই । মখ : ব্যক্তি কীভাবে হতাশা থেকে মুক্তি পেতে পারে? রথীন্দ্রনাথ রায় : হতাশা থেকে মুক্তির উপায় প্র্যাকটিকেল হওয়া। বাস্তবতা বুঝে চললে হতাশা কমবে। হতাশা তৈরির কারণ বুঝে মুক্তির চেষ্টা করতে হবে। মখ : গানের প্রতি ভালোবাসার জন্ম কীভাবে? রথীন্দ্রনাথ রায় : আমার বাবা হরলাল রায় ছিলেন ভাওয়াইয়ার একনিষ্ঠ সাধক—গীতিকার, সুরকার, শিল্পী। নিজে দোতারা বাজিয়ে গান করতেন। সে সূত্রে আমরা ভাইবোনেরা গান করতাম । খুব ছোটবেলা থেকেই গানের সাথে এভাবে ভালোবাসায় জড়িয়ে যাই। মখ : আপনার গান শেখার শুরুটা হয় কীভাবে? রথীন্দ্রনাথ রায় : ১৯৫৬ সাল থেকে বাবা ঢাকা রেডিওতে জড়িয়ে পড়েন। মাঝেমধ্যে বাড়ি এলে বৈঠকখানায় প্র্যাকটিসে বসতেন। তখন আমি খুব ছোট—টু-থ্রিতে পড়ি, বৈঠকখানায় ঢোকার তো অনুমতি ছিল না। গোপনে তাঁর গানের খাতাটি নিয়ে দুপুরের কড়কড়ে রোদে আধা মাইল-এক মাইল দৌড়ে দূরে চলে যেতাম। ক্ষেতের আইলে বসে গতকাল যে গানটি তিনি করেছেন, সেটি বের করে চিত্কার করে গাইতাম। আবার সন্ধ্যায় তাঁর গান প্র্যাকটিসের সময় খেয়াল করে শুনতাম—কোন জায়গায় ভুল হয়েছে। এভাবে কারেকশন করতাম। মখ : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিলেন কীভাবে? রথীন্দ্রনাথ রায় : ঢাকা থেকে খুব কষ্ট করে পালিয়ে কলকাতায় চলে গেলাম ১৯৭১ সালের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। নিচতলায় বিএসএফ গার্ড আটকাল। বললাম, ‘ঢাকা থেকে আসছি, আমি শিল্পী।’ ওপরে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ. মান্না হক, মোকছেদ আলী সাঁইদের সাথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে জড়িয়ে গেলাম। আপেল মাহমুদের সাথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রথম ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’ গানটি গেয়েছি। এইভাবে শুরু হলো স্বাধীন বাংলা বেতারের জীবন। এর পরে গেয়েছি—‘চাষাদের মুটেদের মজুরের/আমার এ দেশ সব মানুষের’, ‘তারা এই দেশের সবুজ ধানের শিষে/চিরদিন আছে মিশে’, ‘ও বগিলারে, কেন বা আলু বাংলাদেশে/মাছের আশা নিয়া।’ মখ : মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তির সাথে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? রথীন্দ্রনাথ রায় : মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তির সাথে খুব আন্তরিকভাবে মিশতে হবে। তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। তাকে ভালো ভালো কথা বলতে হবে, ধর্মের কথা বলতে হবে। তাকে নানাভাবে আশাবাদী করে তুলতে হবে। তার মন ভালো রাখার জন্য তাকে ভালো গানও শোনাতে হবে। মখ : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ । রথীন্দ্রনাথ রায় : আপনাকেও ধন্যবাদ।