কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার চিকিৎসা (ওষুধ ও পরিবার)

কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার চিকিৎসা (ওষুধ ও পরিবার)

এগারো বছরের ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চা ছেলে মাথাব্যথা নিয়ে আমাদের ওয়ার্ডে ভর্তি হল। অনেকদিন যাবত তার মাথা ব্যথা, তবে মাঝে মাঝে সেটা বেড়ে তীব্র হয় যেমনটি এবার হয়েছে। স্কুল যাওয়া বন্ধ। এজন্য মা খুব ব্যতিব্যাস্ত। মাথাব্যথার জন্য শিশু ডাক্তার, নিউরলজি ডাক্তারসহ আরও অনেককেই দেখানো হয়েছে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সবই স্বাভাবিক পাওয়া গেছে, ওষুধ নিয়মিত খাওয়ানো হয় কিন্তু মাথা ব্যথা কমে না। আমরা বাচ্চাটির সাথে বেশ কয়েকবার কথা বলে জানতে পারলাম বাচ্চাটি একটি সাইকেল কিনতে চেয়েছিল এবং মা দিতে চায়নি, তারপর থেকে তার মাথা ব্যথা চরম আকার ধারণ করে। আগের মাথা ব্যথাগুলোও দেখা যায় কোনো না কোনো আবদারের সাথে জড়িত। ছেলেটি তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার বড়। বাবা বিদেশ থাকেন, মা একা তিন বাচ্চা নিয়ে সংসার সামাল দিয়ে যাচ্ছেন।

ছেলেটি বেপরোয়া ধরনের। মায়ের কথা শোনে না, মাকে মাঝে মাঝে মারে, স্কুলে যেতে চায় না, খেলতে গেলে বন্ধুদের সাথে মারামারি করে, বিভিন্ন জায়গায় আগুনও লাগায়, ছোট ছোট পোকামাকড় ধরে ধরে টেনে টেনে তাদের ছিড়ে, ছোট ভাইবোনদের মারে, ইত্যাদি অত্যাচারে মা ভারী বিরক্ত। মা মাঝে মাঝে মারে বাচ্চাটিকে, কিন্তু বাচ্চাকে বুঝিয়ে কমই বলে, বাচ্চার ভালো কাজের প্রশংসা করা হয় না, জিনিস পত্র চাইলে সব ক্ষেত্রেই বাচ্চা ভাংচুর না করা পর্যন্ত দেয় না, অনেক সময় মা না দিলে বাচ্চাটির নানা নানী, মামা মামীরা তার আবদার পূরণ করে।

আমরা সবাই মিলে দেখে এই সিধান্তে উপনীত হলাম যে, বাচ্চাটির এবারের রোগটি হল ‘কনভার্সন ডিজঅর্ডার’, যেটা তার সাইকেল না পাওয়াতে মাথা ব্যথা দেখা দিয়েছে এবং তার আগে এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছে এবং এবার বাচ্চাটি সেইটাই প্র্যাকটিস করেছে। কিন্তু বাচ্চাটির আরেকটি আচরণগত রোগ আছে সেটা ‘কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার’।

এই বাচ্চার দুটি রোগের চিকিৎসায়ই ওষুধের ভূমিকা খুবই কম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা তার মাকে বিশ্বাস করানোই আমাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে গেলো। যদি বিশ্বাসই না করানো যায় তাহলে চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে যাবে। অনেকবার অনেকভাবে বোঝানোর পর বাচ্চাটির মা মেনে নিল এবং চিকিৎসা শুরু হল। কয়েকদিনের মধ্যে মাথা ব্যথা চলে গেলো। কনভার্সন ডিসঅর্ডার এবারের মত গেলো কিন্তু কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার তো চিকিৎসা করা দরকার। নিয়ম অনুযায়ী বাচ্চা, মা ও ডাক্তার বসে একটি বাস্তবায়ন যোগ্য রুটিন করা হল। মাকে বোঝানো হল প্যারেন্টিং এর সঠিক প্রশিক্ষণ। সামান্য ওষুধ, সাইকথেরাপি, রুটিন, প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ সব মিলিয়ে বাচ্চাটি উন্নতি বোধ করল ও ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেলো। আমরা দুই সপ্তাহ পরে বহিঃবিভাগে যোগাযোগ করতে বললাম। একমাস পরে আবার বাচ্চা ও তার মাকে দেখা গেলো। মা বললেন বাসায় গিয়ে ভালই ছিল বাচ্চাটি এবং মা সেখানো নিয়ম অনুযায়ী পালন করতে পেরেছিলেন, ছেলেটিও স্কুলে নিয়মিত হয়েছিল, রুটিন মেনে ছিল কিন্তু এবার ছেলেটি একটি ট্যাব কিনতে চায় এবং আবার মাথা ব্যথা দেখা দিয়েছে।

বাচ্চাদের রোগ ও রোগের চিকিৎসা দুটোতেই পরিবার ও বাবা-মার খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিদ্যমান। শুধু ওষুধে কাজ হবে এমন মানসিক ও আচরণগত রোগ পাওয়া বেশ কঠিনই।

আমাদের সমাজে কেন জানি সবাই ভাবতে থাকি রোগ হয়েছে ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যাবে। আমাদের রোগীদের সাথে সাথে বাবা মাদের নিয়ে যে কাজ করতে হয় তা রোগীদের নিয়ে কাজের চেয়ে কম নয় বেশি বৈকি। মুশকিল হয়ে যায়, যখন রোগীরা বোঝেন তাদের রোগের চিকিৎসার বিস্তারিত কিন্তু আমরা বাবা মাদের বুঝাতে পারি না তাদের ভূমিকা, রোগ হওয়া ও রোগের চিকিৎসায়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ডা. এস এম ইয়াসির আরাফাত

এমবিবিএস, এমবিএ, এমপিএইচ ও এম.ডি. ফেস-বি রেসিডেন্ট- সাইকিয়াট্রি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। অতিরিক্ত ফ্যাকাল্টি, এমপিএইচ প্রোগ্রাম, আশা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। গবেষক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল এর এডিটর। যোগাযোগঃ arafatdmc62@gmail.com