স্কুল রিফিউজাল বা শিশুদের স্কুলে যাওয়ার ভীতি

স্কুল রিফিউজাল বা শিশুদের স্কুলে যাওয়ার ভীতি

স্কুল যাওয়া বাচ্চাদের ভিতর বিশেষ এক ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা যায়। তারা হঠাৎ স্কুলে যেতে চায়না, স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, স্কুলের সময় হলে প্রচন্ড ভয় ভীতি কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। পিতা মাতা অভিভাবরা, ছেলেমেয়েদের এমন আচরণে দিশাহারা অনুভব করেন। অনেকের ভিতর বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বোধ কাজ করে। কি করা উচিত বুঝতেও পারেন না।

স্কুল রিফিউজাল:
অনেকে এ বিষয়টি স্কুল ফোবিয়াও বলেন। অর্থাৎ স্কুলের প্রতি ভয়। ভয়টা হয় অযৌক্তিক। আপত দৃষ্টিতে সব দিক থেকে ভালো থাকা সত্বেও, হঠাৎ একদিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। প্রথম দিকে নিয়মিত গেলেও কেউ কেউ আস্তে আস্তে স্কুলে যাওয়া কমিয়ে দেয়। কিছুদিন পর থেকে দেখা যায় ফাঁকে ফাঁকে বা মাঝে মাঝে যেতে রাজী হয়। কেউ কেউ আবার স্কুলে যায়, কিন্তু যাবার আগে কান্নাকাটি, মা বাবাকে আকড়ে ধরে বসে থাকা, লাফা লাফি ঝাপাঝাপি, খেপে যাওয়া, খারাপ ব্যবহার করা কিংবা বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। কাউকে কাউকে স্কুলের দিন গুলিতে অস্বাভাবিক ভয় এবং অস্থির থাকতেও দেখা যায়। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকলে অনেকেই আবার স্বাভাবিক থাকে। অনেকে বিষয়টিকে ভান মনে করেন। পরামর্শ, গল্প, উপদেশ বা শ্বাসন করেও স্কুলের স্বাভাবিক প্রয়োজনীয়তা বাচ্চাটিকে বোঝানো যায়না।

স্কুল ফোবিয়ার লক্ষন:
স্কুলের সকালে অনেক বাচ্চাকে দেখা যায়, মাথাব্যথা, পেটব্যথা, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দমবদ্ধ লাগা সহ বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গের কথা বলে। স্কুলের বা একাডেমীক কাজের বিষয়ে তারা চরম অনিহা প্রকাশ করে থাকে। স্কুল সংক্রান্ত যে কোনো ব্যাপারে এক ধরনের অসহযোগিতার মনোভাবও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু স্কুলের বাইরের যেকোনো বিষয়ে অনেকে বেশ আগ্রহ দেখাতেও দেখা যায়।

সম্ভাব্য কারণ:
মা বাবা বা এটাচমেন্ট ফিগার, যার কাছে থাকতে বাচ্চাটি স্বাচ্ছন্দ অনুভব করে থাকে এমন মানুষের কাছ থেকে আলাদা হবার ভয়।
স্কুলের যাবার সময় রাস্তা, বাস, রিক্সা, জ্যাম, গরম কিংবা এমন যেকোনো বিষয়ের প্রতি বিরক্তি। যা তার মনের বিরক্তিভাব নিয়ে আসে।
স্কুলে থাকা অবস্থায় ক্ষুধা লাগা বা খাবারের যেকোনো ধরনের কষ্ট।
স্কুলের টয়লেট বিষয়ক কোনো কিছু। বিশেষ কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের সাথে সম্পর্ক। পড়াশুনা সংক্রান্ত কোনো বিশেষ বিষয়। বিশেষ কোনো বিষয়ে দুর্বলতা। বিশেষ কোনো ঘটনা যা, সে মনে করছে কাউকে বলার মতো না। বিশেষ কোনো শিক্ষকের কোনো আচরণ। পরিবারের ভিতরের বিষয়ও অনেক সময় এসমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত আহ্লাদ। স্কুল বা অন্য কোনো নিয়মের দিকে অভিভাবকদের খেয়াল না রাখা। স্কুলের উপস্থিতি ও ফলাফল সম্বন্ধে কোনো তথ্য বা ধারনা না রাখা। ফলাফল এর বিষয়ে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা ও বকাঝকা করা।

monon-600

যে বাচ্চাদের বেশি হতে পারে: 
ছেলে মেয়ে সবারই ক্ষেত্রে সমানভাবে ঘটার সম্ভাবনাই থাকে। তবে মজার বিষয় হলো, ৫-৬ বছর বয়স এবং ১৪-১৫ বছর বয়সে এই সমস্যা বেশি দেখা যেতে পারে। দুটি বয়সই মানসিক ভাবে পরিবর্তন এবং নতুন কিছু গ্রহণ করার বয়স।

রোগ হিসেবে স্কুল ফোবিয়া:
বই এবং তথ্য অনুযায়ী নিজে কোনো রোগ না, তবে এটি বেশ কয়েকটি মানসিক রোগের কারণে হতে পারে। যেমন: সেপারেশরন এনজাইটি ডিজঅর্ডার (গত লেখায় প্রকাশিত), সোশাল ফোবিয়া, কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার ইত্যাদি)।

চিকিৎসা:
চিকিৎসার প্রথম এবং প্রধান কথাই হলো, যেভাবেই হোক স্কুলে যাওয়া চালিয়ে যেতে হবে। অনেক অভিভাবকরা স্কুলে যাবার সময় বাচ্চারা বিভিন্ন সমস্যা করে বলে ভয়ে, স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এটা আত্মঘাতী। তাতে করে যে কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়, সে সমস্যা বাড়তেই থাকে।

প্রয়োজনীয় এবং সঠিক চিকিৎসার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ, যেমন শিক্ষক এবং যারা শিশুটির সাথে সম্পর্ক রাখে তাদের সাথে পরিবারের মানুষের সাথে এক ধরনের কার্যকর সম্পর্ক দরকার হয়। দুপক্ষের বোঝাপরার মাধ্যমেই এই চিকিৎসা এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়।

শিশুটিকে ধীরে ধীরে বিষয়গুলিতে অভ্যস্থ করে তুলতে হবে। ভিতরের কারণ খুঁজে বের করে, সেটির সঠিক চিকিৎসা করতে হবে। এনজিওলাইটিক অর্থাৎ টেনশান দূর করার ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। যে অংশটুকু করতে পারবে, তার প্রশংসা করতে হবে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

প্রফেসর ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব

অধ্যাপক ও কোঅর্ডিনেটর- সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক (পিএসসি) মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এবং প্রাক্তন মেন্টাল স্কিল কনসালট্যান্ট, বিসিবি।