আমাদের সন্তান, আমাদের আচরণ, আমাদের সমস্যা

আমাদের সন্তান, আমাদের আচরণ, আমাদের সমস্যা

আমাদের হাসপাতালে ১২ বছরের একটি ছেলে বাচ্চা ভর্তি হল, খুব সুন্দর চেহারা, সুন্দর পোষাক পরিহিত। বাবা মায়ের কাছে কিছু জানার আগে গেলাম বাচ্চাটির সাথে কথা বলতে। বাচ্চাটি আমাকে দেখে বলল, “আপনাকে দেখে তো ডাক্তার মনে হয় না, আমি আপনার সাথে কথা বলব না”। কর্তব্যরত নার্স গেলে বাচ্চাটি বলল আপনি তো সিনিয়র না, আপনি আমাকে কোন ওষুধ দিলে আমি খাব না। বাচ্চাটির এই আচরণে আমি ধাক্কা খেয়েছিলাম। পরে এসে মা বাবার কাছে ইতিহাস নিতে গিয়ে জানলাম, বাচ্চাটি মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে, ঠিক মত স্কুলে যেতে চায় না। বলে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আইনস্টাইন তো বেশি লেখাপড়া করে নাই, আমার এত পড়ার কি দরকার। তারপর জেনে বেশ আশ্চর্যই হলাম যে, বাচ্চাটি নিয়মিতই তার বাবা এবং মায়ের গায়ে হাত তোলে, পরিবারের অন্যান্য লোকদের তার শুনতে বাধ্য করে, তা না করলে ভাংচুর করে। আমি খুব করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ও আচরণগুলো শিখলো কোথায়? পরিবারে বা আশেপাশের কারো আচরণ সে প্রত্যক্ষ করে কিনা ও সেটা নিজে করে কিনা? বাচ্চাটির বাবা মা নিশ্চিত করে বলেছিল পরিবারের কারোরই এমন আচরন নাই।

পরেরদিন শোনলাম বাচ্চাটি রাতে অন্য রোগীদের প্ররোচিত করেছে যে রাতে হাসপাতালের তালা ভেঙে এক সাথে পালাবার জন্য। বাচ্চাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি এখানে ভর্তি কেন? বাচ্চাটি বলেছিল, আমি জানি না কেন ভর্তি, তবে ধারণা করছি। যদি আমার ধারণা ঠিক হয় তাহলে আমার আগে আমার বাবাকে ভর্তি করা দরকার। কয়েকদিন পড়ে বাচ্চাটির কাউন্সিলরের কাছে জানতে পারলাম বাচ্চাটির সকল আচরন তার বাবার আচরনের কার্বন কপি।

বাচ্চাটিকে উপযুক্ত চিকিৎসা, সাইকথেরাপি, ব্যবহার পরিবর্তন চিকিৎসা প্রদানে আচরণে অনেক পরিবর্তন হল।

হাসপাতাল থেকে ছুটি হওয়ার সময় পরিবারের সবাইকে নিয়ে আচরণগুলো নিয়ে কথা বলার সময় বললাম, বাচ্চা কি করলে বাবা মা কি করবেন। এক পর্যায়ে বললাম যদি আমাদের, আপনাদের কথা অনুযায়ী না চলে তাহলে প্রয়োজনে বেঁধে ফেলবেন। বাবা মা চমকে উঠলেন বললেন ডাক্তার সাহেব, আমাদের ছেলেকে বাঁধতে পারব না, আপনি ওষুধ দেন যাতে আর আমার বাচ্চা এমন না করে। নিজের বাচ্চাকে কেমনে বাধি?

ডাক্তার হিসাবে এই প্রশ্নের মুখোমুখি প্রায়ই হই এবং তা আমাদের সব সময়ই বিচলিত করে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ডা. এস এম ইয়াসির আরাফাত

এমবিবিএস, এমবিএ, এমপিএইচ ও এম.ডি. ফেস-বি রেসিডেন্ট- সাইকিয়াট্রি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। অতিরিক্ত ফ্যাকাল্টি, এমপিএইচ প্রোগ্রাম, আশা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। গবেষক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল এর এডিটর। যোগাযোগঃ arafatdmc62@gmail.com