সেপারেশন এনজাইটি ডিজঅর্ডার: শিশু কিশোরদের বিশেষ মানসিক সমস্যা

সেপারেশন এনজাইটি ডিজঅর্ডার: শিশু কিশোরদের বিশেষ মানসিক সমস্যা

সেপারেশন এনজাইটি ডিজঅর্ডার শিশু-কিশোদের বিশেষ এক ধরনের মানসিক সমস্যা। শিশুটিকে দেখভাল করা মানুষটি যখন কোনো কারণে দূরে যায় বা যেতে হয়, শিশুটি সেই অবস্থাকে মেনে নিতে পারে না। তারা বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। কেউ কেউ চরম অস্থিরতা প্রদর্শন করে, এমনকি অজ্ঞানও হয়ে যেতে দেখা যায়। সেসব প্রতিক্রিয়া তাদের বয়স ও পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। অনেক সময় সরাসরি দূরে যাওয়া নয়, শিশুটি যদি ভাবে, দূরে যেতে হবে বা হতে পারে, তখনও এমন সমস্যা হতে পারে।

সেপারেশন এনজাইটি ডিজঅর্ডার

একজন শিশুকে যখন কোনো কারণে মা-বাবা থেকে আলাদা হতে হয়, কিংবা বাড়ি থেকে কোথাও যাবার প্রয়োজন হয়, তখন তাদের মাঝে হঠাৎ করেই এক ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত এমন প্রতিক্রিয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রস্তুতি থাকে না। শিশুটি ভয়ে কুঁচকে থাকে, কান্না শুরু করে, আঁকড়ে ধরে বসে থাকে, খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়, হাত-পা ছোঁড়ছুঁড়ি করতে থাকে কিংবা অস্বাভাবিক অন্য কোনো আচরণ শুরু করে। বিশেষ করে, মা-বাবা অফিসে যাবার সময় বা নিজের স্কুলে যাবার সময় এই আচরণগুলি বেশি দেখা যায়। আচারণগুলি সাধারণত শিশু কিংবা কিশোরটির বয়স, সময় বা পরিস্থিতির সাথে সংগতিপূর্ণ হয় না বলেই গুরুত্ব সহকারে দেখতে হয়। এধরনের আচরণ যদি কারো মাঝে টানা এক মাস সময় ধরে চলতে থাকে তবেই সেটা ‘সেপারেশন এনজাইটি ডিজঅর্ডার’। এর ফলে শিুশুটির প্রতিদিনের জীবন প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে ব্যহত হয়। তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, একাডেমিক এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব পড়ে। সাধারণত কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মাঝে বেশি হয়ে থাকলেও ১৮ বছর বয়সের আগে যে কোনো সময় এ ধরনের সমস্যা দেখা যেতে পারে।

এই একই সমস্যা বড়দের মাঝেও হতে পারে। যদি এমন সমস্যা কমপক্ষে ছয় মাস চলতে থাকে তখন সেটা বড়দের ‘সেপারেশন এনজাইটি ডিজঅর্ডার’ বলা হবে।

কেন হয়?

জন্মের পর থেকে শিশুর মানসিক বৃদ্ধি বা বিকাশ হয়ে থাকে বিভিন্ন ধাপে ধাপে। ধাপে-ধাপেই তারা পরিণত হয়। মানসিক ডেভলপমেন্ট বা মানসিক বিকাশের শুরুর দিকে, অর্থাৎ জন্মের পর পর অনেকের সাহায্য পেয়ে থাকলেও বিশেষ একজনের উপরই তারা সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভর করার বিষয়টিকে, অন্যভাবে বলতে গেলে দুজনের ভিতর এই বোঝাপড়ার বিষয়টিকে মানসিক স্বাস্থ্যের ভাষায় বলা হয় ‘এটাচমেন্ট’। যার উপর নির্ভরতা আসে, সেই মানুষটিকে বলা হয় ‘এটাচমেন্ট ফিগার’। সাধারণত শিশুটির ‘মা’য়ের সাথেই এই এটাচমেন্ট তৈরি হয়। তাই এটাচমেন্ট ফিগারটি হয়ে থাকেন ‘মা’। মা ভিন্ন, বাবা কিংবা অন্য যেকেউই হতে পারে, যার সাথে শিশুটির মানসিক বা ইমোশনাল সম্পর্ক তৈরি হয়।

শিশুটি যখন এটাচমেন্ট ফিগার থেকে কোনো কারণে দূরে যায় তখনই তারা এসব প্রতিক্রিয়া দেখায়। অনেকে আবার, যে ঘরে বা বাড়িতে থাকতে অভ্যস্ত সেটি থেকে দূরে যাবার ভয়েও আমন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। সেটাকেও একই সমস্যা মনে করতে হবে। তবে এদের সংখ্যা কম। অর্থাৎ কখনো পরিচিত পরিবেশের বাইরে গেলেও শিশুদের মাঝে এমন উদ্বিগ্নতা দেখা দিতে পারে। এভাবে আলাদা বা সেপারেটেড হওয়ার জন্য এনজাইটি বা উদ্বিগ্নতা তৈরি হয় বলেই সেটিকে বলে ‘সেপারেশন এনজাইটি’।

অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা বা পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে না গেলেও, যেতে হতে পারে বা আলাদা হতে প্রয়োজন হতে পারে এমন চিন্তা করেও শিশুটির মাঝে এমনসব লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। দেখা যায় একবার কোনো কারণে এটাচম্যান্ট (মা-বাবা) ফিগারটি আলাদা হলো, বা শিশুটিকে বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে কোথাও কোনো ধরনের ঝামেলায় পড়তে হলো, তখন পরবর্তীতে এমন আলাদা হতে হবে বা দূরে থাকতে হবে এমন চিন্তা করেও এ সমস্যা তৈরি হতে পারে।

কী হয় সেপারেশন এনজাইটিতে?

সেপারেশন এনজাইটি এমনিতে ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু যখন অস্বাভাবিকভাবে টানা একমাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে থাকে তখনই সেটাকে আমলে আনতে হবে। এটাচমেন্ট ফিগার থেকে দূরে যাবার ভয়ে তাদের মাঝে যেসব ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে, অস্থির হয়ে থাকে, হীনমন্যতায় ভোগে, বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। অথাৎ সেই এটাচমেন্ট ফিগারই একজন শিশুর জন্য প্রায় সব ধরনের নিশ্চয়াতার প্রতীক।

এটাচমেন্ট ও এটাচমেন্ট ফিগার

এটাচমেন্ট তৈরি হওয়া এমনিতে ক্ষতিকর কিছু নয়। বরং দরকারী। যাদের সাথে এটাচমেন্ট গড়ে উঠে তাদের সান্নিধ্যে থাকা অবস্থায় শিশুরা নিজেদেরকে নিরপদ মনে করে, কনফিডেন্ট অনুভব করে। তাদের মানসিক, এমনকি মস্তিষ্কের গঠনেরও উন্নতি হয় বলে ধারণা করা হয়। অপরপক্ষে তাদের অনুপস্থিতি বা দুর্বল এটাচমেন্ট বা এটাচমেন্ট হীনতা শিশুকিশোরের স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় হিসেবে থেকে যায়। যার প্রতিক্রিয়া পরবর্তী জীবনের যেকোনো সময় পড়তে পারে বলে ধারণা করা হয়। অপর্যাপ্ত এটাচমেন্ট নিয়ে গড়ে উঠা মানুষগুলোর মাঝে, সারাজীবনই হীনমন্যতা বা নিরাপত্তাহীনতা দেখা যেতে পারে। মজার বিষয় হলো, শিশুটি যদি কোনো কারণে বুঝতে পারে, সে এটাচমেন্ট ফিগার থেকে খুব দূরে নয়। কিংবা প্রয়োজনে যেকোনো সময় তাঁর সহযোগিতা পাওয়া যাবে তাহলে তাদের মাঝে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।

তবে সেই এটাচমেন্ট যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তখনই এমন বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। দেখা যায় কোনো কোনো মা-বাবা আছেন যারা শিশুদেরকে অন্যদের হাতে দিতে চান না। অন্যদের সাথে মিশতে দিতে চান না। এমনকি বিভিন্ন পরিবেশের সাথে নিয়ে যেতেও ভয় পায়। সেসব শিশুদের ভেতরেই এমন সমস্যা হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

সেপারেশন এনজাইটিতে করণীয়

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার, শিশুটির প্রতিক্রিয়ার বেশিরভাগ অংশই থাকে তাকে নিয়ে, যার সাথে এটাচমেন্ট গড়ে উঠে। তাকে ছাড়তে চায় না, তাকে ধরে রাখতে চায় বা তার সাথেই সবখানে যেতে চায়। মূলত তার কাছে থেকেই সে নিরাপত্তা আশা করে। অনেকে এমনতর অস্বাভাবিক আচরণের কারণে বিরক্ত হয়ে যায়, ক্ষেপেও যান। তারা এটাকে সমাধানযোগ্য সমস্যা কিনা সেটা জানেনা না।

চিকিৎসা

চিকিৎসার বেশিরভাগটা নির্ভর করে এই বিষয়টিকে বোঝার উপর। এটাচমেন্ট ফিগার কোনো কারণে বা প্রয়োজনে দূরে যেতে হলেও যাতে শিশুটি নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। সেভাবে পূর্ব থেকে প্রস্তুত রাখাতেই চিকিৎসার মূল অংশটুকু নির্ভর করে। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই একটু দূরে সরিয়ে রাখা। অন্যদের সাথে মিশতে দেয়া। পরিবারের অন্যরাও তাকে নিরাপত্তা দিতে পারে সেব্যাপারটি নিশ্চিত করা। সমস্যা বেশি হলে, সামান্য ওষুধ ব্যবাহার করা যেতে পারে যাতে তার এনজাইটি কমে। দূরে গিয়ে বা যেতে হলে, বর্তমানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বারবার আস্বস্ত করা যেতে পারে।

একটি মজার বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, যৌথ পরিবারের ছেলে মেয়েদের এ সমস্যা কম হয়। গ্রামের ছেলে মেয়েদের বা শিশুদের ভেতর এই সমস্যা কম দেখা যায়। তাই পরিবারের এবং অন্য মানুষদের সাথে মিশতে দিলে সেটা শিশু কিশোরের মানসিক উন্নতির জন্য সহায়কই হয়। মাঝে মাঝে ভিন্ন পরিবেশে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া বা ভিন্ন পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত করে তোলাও জরুরি।

অনেক সময়, সমস্যাটি ভালো করে বুঝতে পারলে নিজেরাই বুঝে বুঝে সমাধান করা সম্ভব হয়। যদি সমস্যা বেশি হয় বা দীর্ঘদিন যাবত চলতে থাকে তবে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করবেন।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব

সহযোগী অধ্যাপক ও কোঅর্ডিনেটর- সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক (পিএসসি) মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এবং প্রাক্তন মেন্টাল স্কিল কনসালট্যান্ট, বিসিবি।