ছেলের প্রতি মায়ের অসুস্থ ভালোবাসার ছায়া

ছেলের প্রতি মায়ের অসুস্থ ভালোবাসার ছায়া

ছেলের বিয়ের পরও প্রত্যেক মা আশা করেন তার ছেলে যেন আগের মতোই তাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা ও সম্মান করে, মায়ের প্রতি দায়িত্বগুলো যেন অবহেলার ধুলায় ঢেকে না যায়। এরই সাথে আশা করেন ছেলে তার বউ নিয়েও যেন সুখী হয়। তার নিজের কারণে যেন তাদের দাম্পত্য জীবনে কোন সমস্যা সৃষ্টি না হয়। ছেলে-সন্তানের প্রতি মায়েদের এই প্রত্যাশাগুলো চিরন্তন।

আবার ছেলে সন্তানের কাছে মা-বাবার আশাও একটু বড় আকারে থাকে। যেমন-ছেলে সুশিক্ষিত হবে, বড় চাকুরি করবে, সুসন্তান হবে, মা-বাবা ভাই-বোন অর্থাৎ পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল থাকবে। মা তার সমস্ত ভালোবাসা ও কষ্টের বিনিময়ে ছেলেকে বড় করেন এসব আশা পূরণের লক্ষ্যে। যতদিন ছেলে বড় করার প্রক্রিয়ায় তিনি থাকেন, চেষ্টা করেন তার ভালো বন্ধু হতে, তার ভাল- মন্দের খেয়াল রাখতে এবং সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে।

এভাবে ভালোই কাটতে থাকে মা-ছেলের জীবন। কিন্তু বেশ কিছু সংসারে এর এক অদ্ভূত জটিল রূপ দেখতে পাওয়া যায় ছেলের বউ আসার পর। কিছু কিছু মা চিরকাল যে আচরণগুলো করেন নি সেগুলোই করতে শুরু করেন। যেমন, ছেলের বউকে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেন, যেন ছেলেকে নিয়ে মা এবং বউ এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সেই প্রতিযোগিতায় তাকে (মা’কে) জিততেই হবে। বিয়ের আগে ছেলে অফিস থেকে এসেই মার খোঁজ নিতো, অনেক্ষণ সময় কাটাতো, কোথায় কী ঘটেছে, সারাদিন কেমন কেটেছে সব কিছু নিয়ে মা’র সাথে গল্প করতো। বিয়ের পরও ছেলে এমন আচরণ করছে কিনা সেটি মায়ের জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর বাড়াবাড়িও দেখা যায়। যেমন, প্রভাব বিস্তার করে চলছিলেন, ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার পরও তিনি একই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে চান। বিয়ের পর মায়ের এই দায়িত্বগুলো ছেলের বউকে তারই প্রতিনিধি হিসেবে সুন্দরভাবে ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয়াটাই ছিলো তার সবচাইতে বড় দায়িত্ব। কিন্তু তিনি তা না করে বরং ছেলের বউকে আরো ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টায় নামেন যে, তারা মা-ছেলে অত্যন্ত গভীর সম্পর্কে সম্পর্কিত, বউয়ের কোনো স্থানই তাদের মাঝে নেই। ছেলে তাকেই সবচাইতে বেশি ভালোবাসে ও সম্মান করে।

এই মায়েদের মধ্যে এক ধরনের ভয় জন্ম নেয় ছেলে হাত ছাড়া হওয়ার, সংসারে ছেলে বউয়ের হয়ে যাওয়ার, ছেলে বউকে মায়ের চাইতে বেশি ভালোবাসার। একই সাথে কিছু হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করেন, ছেলের কাছে নিজের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে। আবার তার চিরকালের প্রভাব বিস্তারকারী মনোভাব থেকেও সে বেরিয়ে আসতে পারে না। মায়ের যত ভয়, আত্মমর্যাদার হীনমন্যতা আর প্রভাব বিস্তারকারী মনোভাব এই তিনের সংমিশ্রণে এক জটিল মানসিক প্রক্রিয়া থেকেই ছেলের মা তার যত রকম স্বাভাবিক আচরণ পরিচালনা করতে থাকেন। তার এই প্রক্রিয়ায় আহত হতে শুরু করে একটি অন্য বাড়ির মেয়ে অর্থাৎ ছেলের বউ। ছেলে কখনও বুঝে আবার কখনও বুঝেনা। কখনও মাকে বুঝায় তো কখনও আবার বউকে। সে নিজেও বিবেক বিবেচনা হারিয়ে ফেলে এমন জটিল পরিস্থিতিতে। আর যদি কখনও প্রতিবাদ করে তাহলে মায়ের মন প্রকটভাবে বিগড়ে বসে। এ ধরনের প্রভাব বিস্তারকারী মায়েদের মধ্যে প্রচণ্ড রাগ ও অভিমান থাকে। ফলে সে বিভিন্ন প্রকার চরম দৃশ্য চিত্রায়ন করে বসেন। যেমন-বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া, কথা বা ভাষার মাধ্যমে ছেলেকে ব্ল্যাকমেইল করা, কান্নাকাটি, প্রচণ্ড হইচই বাঁধিয়ে দেয়া, আত্মীয় স্বজনকে ডেকে বিচার বসিয়ে দেয়া ইত্যাদি।

এ ধরনের মায়েদের মধ্যে আরো কিছু অসুস্থ লক্ষণ থাকে। যেমন-প্রচুর মিথ্যে কথা বলা, নাটকীয় আচরণ করা, ছলচাতুরি করা, অসুস্থতার ভান করা, কথায় কথায় কসম করা এবং অভিশাপ দেয়া ইত্যাদি। সকল মায়েদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এসব লক্ষণ একমাত্র মানসিকভাবে অসুস্থ মায়েদের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। বাসার অন্যান্য লোকজন মা ব্যক্তিটির সমস্যাটি জানেন, বুঝেন কিন্তু চুপচাপ থাকেন। তাকে সরাসরি কেউ কখনও কিছু বলেন না। ঘরের শান্তির দিকে তাকিয়েই কেউ তাঁকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চান না। এ ধরনের মা তার সন্তানটিকে বিবেক-বুদ্ধিতে কখনও স্বনির্ভর হতে দেন না। এমন কি কাজে কর্মেও মায়ের প্রতি নির্ভরশীল করে রাখেন। যেন এক ধরনের অন্ধ ভালোবাসা, নির্ভরশীলতা এবং বাধ্যবাধকতা ওই সন্তানের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। সন্তানটিও ঠিক পোষা বিড়ালের মতো মায়ের প্রতি নমনীয়, অবনত, বাধ্য ও বিবেকের দিক থেকে এক ধরনের প্রতিবন্ধীর মতো হয়ে যায়। মা-ছেলের এধরনের অসুস্থ সম্পর্ককে (অতি পর্যায়ে নির্ভরশীলতা) মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সিমবিওসিস’। আমাদের দেশে অসংখ্য মা-ছেলে এবং মা-মেয়ের মধ্যে এরকম সম্পর্ক পাওয়া যায়। এরা দু’জন দু’জনকে নিয়ে ভালোই থাকে কিন্তু সমস্যায় পড়ে যায় এদের মধ্যে যে তৃতীয় ব্যক্তিটি আসে অর্থাৎ ছেলের বউ অথবা মেয়ের জামাই।

লক্ষ্য করুন, দুজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক এবং স্বাভাবিক কাজকর্মে সক্ষম ব্যক্তি যখন দু’জন দু’জনের অস্বাভাবিক পর্যায়ে নির্ভরশীল থাকে, তখন তাঁকে কোন সুস্থ
স্বাভাবিক সম্পর্কের ছকে ফেলা যায় না। কেননা, তাদের এই সম্পর্কের কারণে পাশের মানুষগুলো অনেক ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকেন। আমাদের দেশে ডিভোর্স বা তালাকের অন্যতম কারণগুলোর একটি এই মা-ছেলে বা মা-মেয়ের এমন অসুস্থ সম্পর্ক।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।