মূল পাতা / ফিচার / ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম: পেটের সমস্যাও কি তবে মানসিক রোগ?

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম: পেটের সমস্যাও কি তবে মানসিক রোগ?

মুনির সাহেব দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যায় ভুগছেন।  প্রায় প্রতিদিন বিশেষ করে সকালের দিকে পেটে ব্যাথা হয় আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাকে বাথরুমে যেতে হয়। এমনটা দিনে বেশ কয়েকবার হয়। বহুদিন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন কিন্তু অবস্থার আশানুরূপ সমাধান হয়নি। ওষুধ আর খাদ্যাভাসের নিয়ম মেনে কিছুটা যাও ভালো হন, তবে তা আবার দীর্ঘস্থায়ী নয়।  মুনির সাহেবকে এক সময় বলা হলো মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে।  দ্বিধায় পরে যান তিনি। তবে কি তিনি কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন?

কিন্তু তিনি তো নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থই ভাবেন, পরিবার বা সমাজ তো তাকে পাগল বলে না।  তবে কেন তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে? তিনি বুঝতে পারছেন না কি করবেন।

পাক ও পরিপাকতন্ত্র বিভাগ থেকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাওয়া রোগীদের একটি বড় অংশই ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (Irritable bowel syndrome) বা বিরক্তিকর বা অস্বস্তিকর পেটের সমস্যা সংক্ষেপে আইবিএস (IBS) এর রোগী।  এ বিভাগ থেকে রোগীকে যখন পরবর্তীতে  একজন মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয় তখন অধিকাংশ রোগীই মুনির সাহেবের মতো দ্বিধায় পড়ে যান।

স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে আইবিএস কি কোনো মানসিক রোগ?

আইবিএস মানসিক রোগ কিনা বা এর চিকিৎসায় মানসিক চিকিৎসকের ভূমিকাই বা কী তা জানার আগে জানতে হবে আইবিএস কী, কেন হয়, এর লক্ষণ কী  এবং এর চিকিৎসাই বা কী?

আইবিএস (IBS) কী?
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রম সংক্ষেপে আইবিএস (IBS) হচ্ছে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতার ত্রুটিজনিত সমস্যা।  বিভিন্ন গবেষণায় এর কারণ হিসেবে নানা থিওরি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেই একে বলা হয় ফাংশনাল গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল ডিজঅর্ডার (Functional Gastrointestinal Disorder) ।  অন্য নামে একে বলা হয় স্পাসটিক কোলন (Spastic Colon). সর্বশেষ  ‘Rome III Diagnostic Criteria’ অনুসারে আইবিএসকে বর্ণনা করা হয় এভাবে-
বারবার পেট ব্যাথা বা অস্বস্তি যদি মাসে কমপক্ষে তিন দিন সর্বশেষ তিন মাসে দেখা যায় এবং সেই সাথে  আরো দুই বা ততোধিক লক্ষণ থাকে, যেমন- মলত্যাগের পর অবস্থার উন্নতি হওয়া, মলত্যাগের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া বা মলের ঘনত্ব ও অবস্থার পরিবর্তন হওয়া- তাহলে প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া যায় যে আপনি ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রমে ভুগছেন।

কোথায় ও কাদের বেশি হয়?
সারা বিশ্বে প্রায় ১১ ভাগ লোক এই সমস্যায় ভোগেন। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ আমেরিকায়, যেখানে প্রায় ২১ ভাগ মানুষের মধ্যেই এই রোগ দেখা যায়।  তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এর সংখ্যা কিছুটা কম যা প্রায় ৭ ভাগ।

গবেষণায় দেখা গেছে ২০-৪০ বছর বয়সী মানুষের বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ সমস্যাটি বেশি দেখা যায়।

রোগের লক্ষণ
>) পেট ব্যাথা বা অস্বস্তি যা মলত্যাগের ফলে কমে যায়
>) মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন,  এ ছাড়া পাতলা পায়খানা অথবা পায়খানা শক্ত হয়ে যাওয়া।  কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুটি একসাথেও থাকতে পারে।

অন্যান্য লক্ষণ
>) পেট ভরা ভরা লাগা
>) পায়খানার বেগ বা চাপ বেড়ে যাওয়া
>) পায়খানার সাথে স্লেমা জাতীয় পদার্থ বের হওয়া
>) মলত্যাগের পরেও মনে হয় সম্পূর্ণ হলো না ।

রোগের কারণ
যদিও মূল কারণ জানা যায়নি তবুও এর কারণ হিসেবে নানাবিধ থিওরি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। যেমন-
>) মস্তিষ্ক-অন্ত্র চক্র বা অক্ষে জটিলতা:  মস্তিষ্ক অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, আবার অন্ত্র মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে।  এভাবে মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে যে চক্র বা অক্ষ গড়ে ওঠে, সেই চক্রে বা অক্ষে ত্রুটির জন্য এটি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
>) হাইপোথেলামাস-পিটিউটারি অক্ষে জটিলতা: Stress বা চাপ আইবিএস এর সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এর কারণ হিসেবে দেখা যায় Stress বা চাপ  হাইপোথেলামাস-পিটিউটারি অংশের এবং সিমপেথেটিক নার্ভাস সিস্টেমের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়।
>) অন্ত্রের সক্রিয়তার পরিবর্তন: অন্ত্রের সক্রিয়তার পরিবর্তনও এ রোগের অন্যতম একটি কারণ। যেমন- অন্ত্রের অধিক সংযোজনশীলতা, অন্ত্রের প্রদাহ, শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত কার্যকারিতা, ক্ষুদ্রান্তে ব্যাকটেরিয়ার অতিরিক্ত বৃদ্ধি, আইলিয়াম  (Ilium)  এ সেরটনিন (Serotonin) পরিবহনকারীর (transporter) অতিরিক্ত বৃদ্ধি, অতিরিক্ত সাইটোকাইন (Cytokine)।
>) বংশগত: যেমন-২৮৬ জিন ডায়রিয়া প্রধান আইবিএসএ দেখা যায়।

বর্তমান ধারণা
>) অন্ত্রের স্বাভাবিক ভাবে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়ার (Bactorial florae)  মধ্যে সমস্যা, যেমন- Backterioidetes ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা হ্রাস
>) মস্তিষ্কের গ্রে মেটারের মধ্যে পরিবর্তন বিশেষ করে নারীদের।

কখন শুরু হয়?
সুনির্দিষ্ট কারণ না থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়-
>) জীবাণু সংক্রমণের পর: ১০ ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অন্ত্রের জীবাণু সংক্রমণের পর আইবিএস শুরু হতে পারে। কোনো কোনো প্রোটোজোয়া যেমন- Blastocystis hominis, Dientamoeba Fragilis এর সংক্রমণের পর আইবিএস শুরু হতে পারে।
>) দীর্ঘদিন জ্বরে ভোগার পর
>) দুঃশ্চিন্তা বা বিষন্নতায় ভোগার ফলে
>) এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এ রোগ দেখা দিতে পারে।

শ্রেণিবিন্যাস
>) আইবিএস-ডি (IBS-D) যেখানে ডায়ারিয়া বা পাতলা পায়খানা প্রধান  সমস্যা
>) আইবিএস-সি (IBS-C) যেখানে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান
>) আইবিএস-এম (IBS-M) কখনো পায়খানা পাতলা হয় আবার কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে
>) আইবিএস-ইউ (IBS-U)  এটাকে কোনো বিশেষ শ্রেণিতে ফেলা যায় না
>) আইবিএস-পিআই  (IBS-PI) এটা ইনফেকশনের পর শুরু হয়।

পরীক্ষা-নীরিক্ষা
রোগ নির্ণয়ে কোনো বিশেষ পরীক্ষা-নীরিক্ষা নেই।  মূলত রোগের লক্ষণ দেখেই রোগ নির্ণয় করা হয়। তবে এই লক্ষণগুলো অন্য কোনো রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে কিনা যেমন-জিয়ারডিয়াসিস (Giardiasis), সিলিয়াক ডিজিস (Coeliac Disease), পিত্তথলীল পাথর (Gall Stone), বিলিয়ারি ডিজিস (Billiary Disease) তা দেখার জন্য কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার প্রয়োজন হয়। যেমন-
>) মল পরীক্ষা (Stool R/M/E)
>) রক্ত পরীক্ষা (CBC)
>) লিভার বা যকৃত পরীক্ষা (LFT)
>) আলট্রাসনোগ্রাম (USG)
>) অ্যান্ডোসকপি (Endoscopy)
>) হাইড্রোজেন ব্রেদ টেস্ট ইত্যাদি।

চিকিৎসা
এটা দীর্ঘমেয়াদী একটি সমস্যা। কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে রোগের লক্ষণ অনুসারে কিছু কিছু ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও খাদ্যাভাসের পরিবর্তন এর চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে চলে আসছে।

ওষুধ
এ রোগের ওষুধ হিসেবে এন্টিস্পাজমোটিক যেমন-হাইসোমাইড (Hysomide), এলভেরিন সাইট্রেট ((Alverine Citrate) খাওয়া যেতে পারে । এ ছাড়া এন্টিডায়রিয়াল ওষুধ লোপেরামাইড (Loperamide), এন্টিবায়োটিকস হিসেবে রিফাক্সিমিন (Rifaximine), এন্টিডিপ্রেসেন্ট হিসেবে অ্যামিট্রিপটালিন (Amitryptaline) এবং লেক্সেটিভ (Laxatives) ও প্রোবায়োটিকস (Probiotics) ব্যবহার করা হয়। তবে অবশ্যই তা চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক গ্রহন করতে হবে।

সাইকোথেরাপি
এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সাইকোথেরাপিও নিতে পারেন। সে হিসেবে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) ও হিপনোথেরাপি  (Hypnotherapy) নিলে তারা উপকার পাবেন।

খাদ্যাভাসের পরিবর্তন
খাদ্যাভাসের পরিবর্তন করেও  এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।  সে দিক থেকে যেসব খাবারে এই সমস্যা বাড়ে এসব খাবার পরিহার করতে হবে। যেমন- দুধ বা দুধ জাতীয় খাবার, কিছু কিছু শাক, ভাজা-পোড়া ও তৈলাক্ত খাবার, কৃত্রিমভাবে তৈরি চিনি, ক্যাফেইন জাতীয় খাবার, মদ জাতীয় পানীয়। এ ছাড়া খাদ্যের একটি ডায়েরি বা নিয়ম মেনে চললে উপকার পাওয়া যেতে পারে। যেমন- অল্প অল্প করে বার বার খাওয়া, FODMAP (গ্লুটিনমুক্ত, আইবিএসের জন্য উপযুক্ত) খাবার খাওয়া।

এই পর্বে আইবিএস সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী পর্বে আইবিএসের সঙ্গে মানসিক রোগের সম্পর্ক এবং এর চিকিৎসায় মানসিক চিকিৎসকের ভূমিকা কি তা জানানোর চেষ্টা থাকবে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ডাঃ ওয়ালিউল হাসনাত সজীব। জন্ম ১০ই জুন। পৈত্রিক নিবাস দিনাজপুরে হলেও বাবা-মা এর চাকুরিসূত্রে জন্ম ও শৈশব ঢাকার অদূরে সাভারে। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও ঢাকা কলেজ হতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্ব সমাপ্তির পর ভর্তি হন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন ২০১০ সালে। ২০১৩ সাল হতে বিএসএমএমইউ এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগে এম.ডি (রেসিডেন্সি) কোর্সে অধ্যয়নরত। মেডিকেলে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ভালবাসেন বই পড়তে, ঘুরে বেড়াতে। অবসর সময়ের বেশির ভাগ কাটে গান শুনে, সিনামা দেখে। ইচ্ছে আছে মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে, ইচ্ছে আছে অটিস্টিক চাইল্ডদের মানসিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার।