ঘুম নেই

ঘুম নেই

ছটফট করছেন কাদের সাহেব, কিছুটা বিরক্ত তাঁর সাথে আসা ভদ্রলোকটিও। কাদের সাহেব এসেছেন ঘুমের সমস্যা নিয়ে। তাঁকে জানালাম দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে আসা ঘুমের বড়ি হিসেবে খেয়ে আসা ঔষধটিই এর জন্য দায়ী। এ কথাতেই সমস্যার শুরু। ঘুমের সমস্যা তাঁর অনেক বছরের। এই দীর্ঘ সময়ে দু’দণ্ড শান্তির ঘুম এনে দিয়েছিল যেই ঔষধ, সেটিই আবার ঘুম না হবার কারণ হতে পারে – এই ব্যাপারটাই মানতে পারছেন না তিনি। এখন যদি এই ঔষধ বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে কিভাবে বাঁচবেন! ঘুম ছাড়া কি মানুষ বাঁচতে পারে!

দেখেন ডাক্তার সাহেব, প্রয়োজন ছাড়া ঘুমের ঔষধ বেশিদিন খাওয়া উচিত না সেটি আমিও জানি। কথা হচ্ছে, আমার তো এটা প্রয়োজন। আমি নিজেই বন্ধ করে দেখেছি – কিন্তু পারিনি। কারণ, আমার ঘুম একেবারেই আসেনা। আর ঘুম না আসলে যে কি কষ্ট তা আপনি হয়তো বুঝতে পারেন- যেহেতু আপনি ডাক্তার।

ডাক্তার বলেই তো আমি জানি এই ঔষধ আপনার এখন বন্ধ করা দরকার।
কেন?
কারণ, এটা আপনার জন্য নেশার মত কাজ করছে।
মানে? জীবনে একটা বিড়িও খাইনি, আর আজ ঔষধ খেয়ে নেশা করব!
আপনি নেশা করেন তা তো বলিনি। কিন্তু, এটা এখন আপনার জন্য নেশা হয়ে দাঁড়াচ্ছে – সেটাই বললাম। আর এইটা বিশ্বব্যাপী একটা সমস্যা, আপনার একার নয়।
এতদিন এত ডাক্তার বলে আসল অসুবিধা নেই, প্রয়োজন হলে খেয়ে যান। আর আপনি এখন বলছেন নেশা। কিভাবে বুঝলেন যে এটা নেশা?
বেশ কিছু কারণেই বলা চলে এটা নেশার মত। যেমন- আপনি উচ্চ মাত্রায়, বেশীদিন ধরে এই ঔষধ নিচ্ছেন; কয়েকবার বন্ধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন; এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানা সত্তেও খেতে হচ্ছে; আগে যে মাত্রায় কাজ হত এখন সে মাত্রায় কাজ হচ্ছেনা- ফলে মাত্রা বাড়াতে হচ্ছে; বন্ধ রাখলেই ঘুম না হওয়া সহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যা হয়- যা দূর করতে আপনি আবার ঔষধটা নিয়ে নেন। আগেই বলেছি এটা নেশার মত। তবে একথা নিশ্চিত আপনি ঘুমের ঔষধের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

কাদের সাহেব বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে মাথা নাড়তে থাকেন। এবার তাঁর সাথের ভদ্রলোক কথা শুরু করেন।

ডাক্তার সাহেব, আপনার কথা আমি মোটামুটি বুঝতে পেরেছি। তবে, আপনিও তো দেখি আরেকটা ঘুমের ঔষধ লিখেছেন । ঘুমের বড়িতেই যদি এত সমস্যা তো আরেকটা কেন লিখলেন? এটাও তো নেশা করতে পারে। সেক্ষেত্রে আগেরটা কি দোষ করল?
হাতে যেহেতু অল্প সময় আছে, আপনাদের যদি তাড়াহুড়া না থাকে তাহলে, একটা গল্প বলি। আসলে গল্প না, একটা উদাহরণ আর কি।
সমস্যা নেই। বলেন।
ধরেন, কাদের সাহেব আর উনার স্ত্রী দুজনের সংসার। দুজনেই চাকরী করেন, ব্যস্ত। অফিস থেকে ফিরেই সংসারের যাবতীয় কাজ দুজনেই মিলেমিশে করে ফেলেন, তাই কোন কাজের লোক বা বুয়া রাখতে হয়না। জীবনের নিয়মে একদিন উনাদের ঘরে আসে নতুন অতিথি। উনার স্ত্রীর মাতৃত্বকালীন ছুটি থাকায় প্রথম ছয় মাস কোনভাবে সামলিয়ে নেয়া গেল। কিন্তু এরপর তো আর চলেনা। অফিস ম্যানেজ করে অনেক কষ্টে সপ্তাহ চলল। শেষে বাধ্য হয়ে একজন কাজের মহিলার সন্ধানে সরবরাহকারী একটা প্রতিষ্ঠানে গেলেন। একজন কাজের মহিলা পাওয়া গেল, পরদিন থেকেই। ধরা যাক উনার নাম রহিমা বেগম।

রহিমা বেগম দুইদিনেই সবার মন জয় করে নিলেন। বাচ্চাকে তো সামলিয়ে রাখেনই, সংসারের অন্য অনেক টুকটাক কাজও করে ফেলেন। কাদের সাহেব আর তাঁর স্ত্রী খুব খুশি। কাদের সাহেবের বাচ্চা তো রহিমা বেগমের জন্য পাগল; মা-বাবা না হলেও যেন তার চলে, কিন্তু রহিমা বেগম ছাড়া চলে না। একটু খারাপ লাগলেও কাদের সাহেব আর তাঁর স্ত্রী ভাবেন- অন্তত নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

মাস ছয়েক পড়ে রহিমা বেগম জানালেন তিনি আর থাকতে পারবেন না। বাড়ি চলে যাবেন কি যেন বিশেষ কারণে। অনেক সাধাসাধির পর জানা গেল, বেশী বেতনের চাকরী পেয়েছেন তাই চলে যাবেন। শুনেই তড়িঘড়ি বেশী বেতন নিশ্চিত করে ধরে রাখা হল রহিমা বেগমকে। তবে, তিন মাস না যেতেই আবার বেতন বাড়ানোর জন্য বললেন রহিমা বেগম। সাফ জানিয়ে দিলেন, বেতন না বাড়ালে আর থাকা সম্ভব নয়। মেজাজ খুব খারাপ হলেও এই মুহুর্তে কিছু করার নেই। তাই, বেতন বাড়িয়ে দিয়েই রাখা হল রহিমা বেগমকে। অনেক টাকা, অহেতুক দিতে হচ্ছে এবং রহিমা বেগম উনার অসুবিধাকে পুঁজি করে অন্যায় সুবিধা নিচ্ছেন – এই চিন্তাটা মানসিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। তাই, আবার মাস তিনেক পর যখন বেতন বাড়ানোর জন্য বায়না ধরল, তখন কাদের সাহেব কঠিন মুখে জানিয়ে দিলেন বাড়ানো সম্ভব না। রহিমা বেগমও তাই চলে গেলেন।

কাদের সাহেবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। ছেলের খাওয়া দাওয়া বন্ধ, সারদিন কান্নাকাটি, ঘুমায় না- ইত্যাদি নানা রকম সমস্যা কাদের সাহেব আর তাঁর স্ত্রীর জীবন বিষিয়ে তুলল। এর মধ্যে আরো দু-একজন কাজের মহিলা এসে আবার বিদায় হয়েছে; তাদের সাথে বাচ্চার ঠিক মিলে না। অবশেষে বাধ্য হয়ে খুঁজে পেতে রহিমা বেগমকে ফিরিয়ে আনা হল আরও বেশী বেতন দিয়ে। কিন্তু শান্তি আর এলো না। রহিমা বেগম জেনেই গেছেন যে, তাকে ছাড়া কাদের সাহেব অসহায়- ছেলের অসুবিধার জন্য। তাই, বিভিন্ন রকম চোটপাট, মুখে মুখে তর্ক, কাজ করতে অনিহা সহ একগাদা ঝামেলায় জর্জরিত হতে লাগলেন কাদের সাহেব। ফাঁকে ফাঁকে খুঁজতে লাগলেন সমাধান।

বহুজন সাধ্যমত এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন সমাধান বাতলাতে থাকলেন। কাদের সাহেবও কিছু কিছু কাজে লাগাতে চাইলেন, তবে হলনা স্থায়ী কোন সমাধান। অবশেষে, সেই আগের প্রতিষ্ঠানেই গেলেন কাদের সাহেব। ওখানেই বলা হল, আপনি জরিনা বেগমকে নিয়ে যান, তাহলে সমস্যা কমবে। আবারো আরেকজন কাজের লোক নেওয়ার কথা শুনে আঁতকে উঠলেন কাদের সাহেব। তখন সরবরাহকারী তাঁকে আশ্বস্ত করলেন- জরিনা বেগম অনেকদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, ভদ্র এবং তাকে সহজে কথা শুনানো যায়। তবে, সেই সাথে আরো কিছু কাজও করতে হবে। যেমন- ধীরে ধীরে কাজের লোকের উপর বাচ্চার নির্ভরশীলতা কমাতে হবে, কিছু কিছু কাজ নিজেরাই করে নিতে হবে, বাচ্চার সাথে নিজেদের বোঝাপড়া বাড়াতে হবে, বাচ্চাকে কাছে টানতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কাদের সাহেব রহিমা বেগমকে বিদায় দিয়ে জরিনা বেগমকে নিয়ে এলেন। প্রথম কিছুদিন বাচ্চা বেশ ঝামেলাই করল। কিন্তু, কাদের সাহেব মুখ বুজে সহ্য করলেন এই সব ঝামেলা- সেই সাথে জরিনা বেগমও আদর যত্ন দিয়ে বাচ্চার মন অল্প অল্প করে জয় করে নিলেন। একই সাথে ঐ লোকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য ব্যাপারগুলোও মেনে চলতে লাগলেন। দেখা গেল, অচিরেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান হতে লাগল।

এভাবেই, কাদের সাহেবের বাচ্চা একটু বড় হয়ে উঠলে জরিনা বেগমকেও বিদায় করে দিলেন। এখন, কাজের লোক না থাকলেও আর সমস্যা নেই। কারণ, বাচ্চার নিজের কাজগুলো নিজেই করার অভ্যাস গড়ে উঠেছে, মা-বাবার সাথে গভীর বন্ধুত্ব। আর, বড় কাজগুলো আগের মতই কাদের সাহেব আর তাঁর স্ত্রী মিলেমিশেই করে ফেলেন। বলা চলে, “অতঃপর তাঁহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলেন”।

কি বুঝলেন?
কিছুটা বুঝতে পেরেছি। তবে আপনি আরেকটু ভালোভাবে বুঝিয়ে বলেন, আমার সাথে এই গল্পের কি মিল?
গল্পের কিছু জিনিষ স্বাভাবিকভাবেই বাদ দিতে হয়। সেগুলো বাদ দিলে এ গল্প আসলে আপনারই। গল্পের কাদের সাহেব আর আপনি তো একই মানুষ। বাচ্চা হচ্ছে আপনার ঘুমের সমস্যা- যে আসার আগে আপনার জীবন সুন্দর ভাবেই কাটছিল।  সরবরাহকারী হিসেবে ভাবুন ডাক্তারকে যিনি আপনাকে একটা ঘুমের বড়ি সেবন করতে দিলেন, মানে রহিমা বেগমকে। এই ঘুমের বড়ি প্রথমদিকে খুব ভালোই কাজ করছিল, কিন্তু পরে ডোজ বাড়িয়েও কাজ হয়নি। তাই, বেশ কয়েকবার বন্ধ করে দিয়ে দেখেছেন এবং ঘুমের সমস্যার কারণে আপনার ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন। বেশী ডোজের কারণে অন্যান্য অনেক অসুবিধাও শুরু হল, আর ঘুমের পরিমাণও বাড়ছিল না। বিভিন্ন জনের পরামর্শে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করলেন কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসল না। আবার দেখা করলেন ডাক্তারের সাথে মানে আমার সাথে। আমি আপনাকে আরেকটা ঘুমের বড়িই দিলাম- মানে জরিনা বেগমকে, যা খুব সহনীয়- সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং নির্দিষ্ট নিয়মে কমানোর মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া যায়। সেই সাথে আমি আরো কিছু নিয়ম মেনে চলতে বলে দিব- ইংরেজিতে যাকে বলে Sleep Hygiene. এখন আপনি যদি আমার পরামর্শ মত চলেন- তাহলে প্রথম দিকে কিছু অসুবিধা আপনার হবেই। তবে, সেসব সহ্য করে এবং ধৈর্য ধরে কিছুদিন চালিয়ে গেলেই আপনার ঘুমের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং একসময় এই নতুন ঔষধ ছাড়াই চলতে পারবেন বলে আশা রাখছি।

হুম, বুঝলাম। দেখি, আপনি যখন এত করে বললেন- না হয় কিছুদিন চেষ্টা করেই দেখি। আল্লাহ যদি কপালে ভাল লিখে থাকেন তবে হয়তো আপনার উছিলায় উন্নতি হবেই।

এইটা খুবই ভাল বলেছেন। সুস্থ হবার একটা অন্যতম শর্ত হচ্ছে আশা না হারানো, ধৈর্য ধরা। পরামর্শমত চলবেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর দেখা করবেন, সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে চিকিৎসা চলবে- আর এভাবেই একসময় সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।

ভদ্রলোক বিদায় নিলেন।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য। স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রাম। তবে, কলেজ শিক্ষক মায়ের চাকুরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে শৈশব। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবং উচ্চ-মাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। মেডিক্যালে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ। তাই, ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ধারিত সময়ের চাকুরি শেষে ভর্তি হন মনোরোগবিদ্যায় এম.ডি(রেসিডেন্সি) কোর্সে। বর্তমানে তিনি বি.এস.এম.এম.ইউ-র মনোরোগবিদ্যা বিভাগে অধ্যয়নরত। বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত শিক্ষকতার ধারা বজায় রেখে চিকিৎসক ও শিক্ষক হওয়াটাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বই, সঙ্গীত আর লেখালেখিতেই কাটে অবসর সময়ের বেশির ভাগ। স্বপ্ন দেখেন - মেধা ও মননশীলতার চর্চায় অগ্রগামী একটা বাংলাদেশের।