এইডস এবং মানসিক স্বাস্থ্য

arfaislammk@yahoo.com'
এইডস এবং মানসিক স্বাস্থ্য

আজ ১ ডিসেম্বর ‘বিশ্ব এইডস দিবস’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮৯ সাল থেকে বছরের এই দিনটিকে এইডস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এইডস সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান প্রাণঘাতী রোগের একটি। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও রোগটির ক্রমবর্ধমান বিকাশ এবং এই রোগজনিত মৃত্যু হার বেড়েই চলছে। সচেতনতার অভাব এবং রোগটিকে গোপন রাখার প্রবণতা বাংলাদেশের এইডস চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ বাঁধা। শুধু শারীরিক নয়, এইডসের সাথে মানসিক রোগেরও রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক।

জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক সংস্থার (UNAIDS)-এর তথ্য অনুযায়ী

বর্তমানে সারা বিশ্বে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ৩ কোটি (৩৬.৭ মিলিয়ন)।
২০১৬ সালে নতুন এইচআইভি সংক্রমিতের সংখ্যা ১৮ লক্ষ (১.৮ মিলিয়ন) যা ২০২০ সালের এইচআইভি/এইডস-এর প্রাদুর্ভাব নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং এইডস সংক্রান্ত মৃত্যুর পরিমাণ ১০ লক্ষ (১ মিলিয়ন)।
এইডস সংক্রান্ত মৃত্যু ২০০৫ সালের তুলনায় কমেছে ৪৮ শতাংশ হারে (২০০৫ সালে এইডস সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১.৯ মিলিয়ন এবং ২০১৬ সালে তা ছিল ১ মিলিয়ন)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী

এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে সারাজীবনে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত হবার হার ৩৮ শতাংশ থেকে ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত যা সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশী।
এমনকি, ২০ শতাংশ এইচআইভি আক্রান্তের মধ্যে এইডস-এর প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা যায়।
আবার মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্ত হবার হার ৫ থেকে ২৩ শতাংশ যা সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ।

কেস স্টাডি

মুন্নী (ছদ্মনাম) ২৫ বছর বয়সী একজন এইচআইভি পজিটিভ এবং এইচআইভি পজিটিভদের সেবা প্রদানকারী একটি সংস্থার সেবা গ্রহণকারী সদস্য। মুন্নীকে প্রতি ছয় মাস পর একজন নতুন সঙ্গীর সাথে দেখা যায়। ঐ নতুন সঙ্গীদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যায় তারাও এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে গেছে। এরকম চারবার ঘটার পর তাকে নিয়ে সিনিয়র কাউন্সেলর এবং ডাক্তার সেশনে বসলো এবং জানতে চাইল- কি কারণে এমন করছেন আপনি? কি কারণে অন্যদেরকেও এইচআইভিতে সংক্রমিত করছেন? কথাবার্তার এক পর্যায়ে মুন্নী জোড়ে কেঁদে ওঠে এবং বলে- “আমার কি দোষ ছিল? আমার কেন এমন হল? আমিতো নিরপরাধ ছিলাম। তবুও তো ভুক্তভোগী হতে হল। তাই আমি অন্য পুরুষদের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছি।”

মুন্নীর বয়স যখন ১৭ বছর তখন পারিবারিক মতে তার বিয়ে হয়েছিল প্রবাসী এক ছেলের সাথে। বিয়ের দুই বছরের মাথায় তার স্বামী ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে ভর্তি করালে ডাক্তার জানায় উনি (স্বামী) এইডস-এ আক্রান্ত। ডাক্তারের পরামর্শে মুন্নীর রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যায় মুন্নীও এইচআইভি পজিটিভ। কিছুদিন পরই তার স্বামী মারা যায়। তখন সবাই মুন্নীকেই দোষারোপ করতে থাকে। বলে যে, মুন্নী চরিত্রহীনা। মুন্নী  বলে- “অথচ স্বামী ছাড়া অন্য কোন পুরুষের দিকে কোনদিন তাকাইনি পর্যন্ত।” পরিবার সমাজ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে তাকে আশ্রয়ের জন্য। বহু মানুষের কটু কথা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। তখন থেকেই মুন্নীর মনে জন্ম নেয় প্রচণ্ড ঘৃণা এবং প্রতিশোধ স্পৃহা।

কেস স্টাডিতে উল্লেখিত মুন্নীর এই মানসিক প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় বিষাদ বা তীব্র শোকের প্রতিক্রিয়া (Grief Reaction)। সাধারণত যখন কারো প্রিয়জন বা কাছের মানুষ মৃত্যু বরণ করে অথবা কেউ যদি বড় কোন বা দীর্ঘমেয়াদী অসুখে (যেমন- ক্যান্সার, হাঁপানি, হৃদরোগ প্রভৃতি) আক্রান্ত হবার বা দুর্ঘটনায় শিকার হবার কথা জানে অথবা অঙ্গহানি বা সম্পদহানির সম্মুখীন হয় তখন যে মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তাকেই বলে বিষাদ বা তীব্র শোকের প্রতিক্রিয়া (Grief Reaction)।

এই বিষাদ বা তীব্র শোকের প্রতিক্রিয়া (Grief Reaction) একটি চক্রাকারে চলে; যার পাঁচটি পর্যায় রয়েছে। এই চক্র শুরু হয় তীব্র শোক এর প্রতি উদাসীনতা বা অস্বীকৃতি (Denial) দিয়ে। তারপর আসে রাগ (Anger), যুক্তি তর্ক বা তর্কাতর্কি (Bargaining), বিষণ্নতা (Depression) এবং মেনে নেয়া (Acceptance)।

যখনই কোন ব্যক্তি কোন তীব্র শোক বা আঘাতের সম্মুখীন হয় তখন সেই ব্যক্তি সেই শোকাবহ ঘটনাকে অস্বীকার (Deny) করে অবিশ্বাস (Disbelief) করে। তার মনে হয় যে এটা ঘটেনি। ঘটতে পারে না। এটা আসলে ব্যক্তির এক ধরণের আবেগীয় প্রতিরোধ (Emotional Protection/Defence/Defence) প্রচণ্ড দুঃখবোধ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য।

প্রাথমিক শোক এবং আঘাত কেটে যাবার পরই মানুষ অসহায় বোধ করে যা থেকে জন্ম নেয় রাগ বা ক্রোধ। এ পর্যায়ে মানুষ অন্যদেরকে এমনকি সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করে তার দুঃখজনক পরিস্থিতির জন্য।

পরবর্তী পর্যায়ে মানুষ যুক্তি তর্ক বা তর্কাতর্কি শুরু করে। এ পর্যায়ে মানুষ যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও হারিয়ে যাওয়া স্বজন বা সুস্বাস্থ্য ফিরে পেতে চায়।

এরপরই আসে বিষণ্নতা বা বিমর্ষতা। এ পর্যায়ে শোকগ্রস্ত মানুষ বিষাদগ্রস্ত ও আশাহত হয়ে পড়ে এবং অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে চলে। পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র এমনকি আনন্দদায়ক কাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে নেয়।

এই চক্রের সর্বশেষ পর্যায়ে মানুষ তার পরিস্থিতিকে মেনে নিতে শিখে এবং বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শুরু করে। এখান থেকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সূচনা বা চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

উপরের চিত্রের মাধ্যমে এই চক্রকে খুব সহজে বোঝা যায়। এই চক্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল যেকোনো পর্যায় থেকে ব্যক্তি আবারও পূর্বের পর্যায়ে এমনকি প্রথম পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। যেমন: যুক্তিতর্কের পর্যায় থেকে মানুষ উদাসীনতা বা অস্বীকৃতির পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। আবার বিষণ্নতা থেকে রাগের পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে।

এইচআইভি আক্রান্তদের (এইচআইভি পজিটিভ) মাঝে Grief Reaction লক্ষ্যণীয়ভাবে বিদ্যমান। প্রত্যেক এইচআইভি কাউন্সেলরকেই প্রতিটি নতুন এইচআইভি পজিটিভ রোগীকে এ বিষয়ে কাউন্সেলিং বা পরামর্শ প্রদান করতে হয় বা হয়েছে। নতুবা ফলাফল হয় মুন্নীর মত অথবা আরও ভয়াবহ রকমের।

এইচআইভি আক্রান্তদের মাঝে আরও যেসব মানসিক সমস্যা লক্ষ্য করা যায় তা হলোঃ বিষণ্নতা, ম্যানিয়া, মাদকাসক্তি (এমনকি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে নেশা গ্রহণ), স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া, আত্মহত্যার প্রবণতা, ব্যক্তিত্বের গোলযোগ এমনকি জটিল মানসিক সমস্যার (যেমন- সিজোফ্রেনিয়ার) লক্ষণ যেমন- অলীক প্রত্যক্ষণ, সন্দেহ প্রবণতা প্রভৃতি।

মিড এবং তার সহযোগীরা (২০১২) দেখেন যে- বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং এইচআইভি উভয়ে আক্রান্তদের মাঝে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ এবং ওষুধ খাবার প্রতি অনীহা প্রদর্শনের প্রবণতা বেশী।

মার্টিন এবং তার সহযোগী (২০১১) দেখেন যে- এইচআইভি আক্রান্তদের মাঝে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (Post Traumatic Stress Disorder)- এর হার ৪০ শতাংশ।

ফস্টার এবং তার সহযোগীরা (২০০৩) দেখেন যে- এন্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধের প্রভাবে জটিল মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দেয় এবং এন্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ বন্ধ করার সাথে সাথেই লক্ষণসমূহ দূরীভূত হয়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (২০০৮) প্রতিবেদন অনুযায়ী-

মানসিক সমস্যা এবং মাদকাসক্তি এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
মানসিক সমস্যা এইচআইভি সংক্রমিতদের মাঝে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে থাকে।
মাদকাসক্তি এইচআইভি সংক্রমণকে ত্বরান্বিত করে এবং ওষুধের গ্রহণের প্রবণতা কমিয়ে দেয়।
এইচআইভি পজিটিভদের মাঝে সাধারণ জনগোষ্টীর তুলনায় বিষণ্নতা এবং উদ্বেগে ভোগার হার বেশী পরিলক্ষিত হয় বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশে।
এইচআইভি সংক্রমণ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপরও প্রভাব ফেলে যার ফলশ্রুতিতে এইচআইভি এনসেফালপ্যাথী (HIV Encephalopathy), বিষণ্নতা (Depression), ম্যানিয়া (Mania), বাইপোলার ডিজঅর্ডার (Bipolar Disorder), কগনিটিভ ডিজঅর্ডার (Cognitive Disorder), ফ্র্যাঙ্ক ডিমেনশিয়া (Frank Dementia) প্রভৃতি সমস্যা দেখা যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই একধিক সমস্যা একসাথে দেখা যায়।

এইচআইভি এবং মানসিক স্বাস্থ্য অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। উভয়েই উভয়কে প্রভাবিত করে থাকে। যেমন- এইচআইভি আক্রান্তদের মাঝে মানসিক সমস্যাগ্রস্থ হবার হার বেশী আবার মানসিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিদের মাঝে এইচআইভি আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশী পরিলক্ষিত হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের মত আমাদের দেশেও এখন পর্যন্ত এইচআইভি/এইডস-এর ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে তেমন গুরুত্ব প্রদান করা হয় না।

বহু এইচআইভি সেবা প্রদানকারীদের মাঝে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব রয়েছে। আবার বহু মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারীরাও এইচআইভি সম্পর্কে সঠিক এবং হালনাগাদ তথ্য জানেন না। তাই এইচআইভি প্রতিরোধে প্রয়োজন শারীরিক এবং মানসিক সেবার সমন্বয় সাধন।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।