বিশেষ সাক্ষাৎকার

রঙের ছোঁয়ায় মন আঁকি

রঙের ছোঁয়ায় মন আঁকি

কিছুদিন আগে চারুকলা ইনস্টিটিউটের জয়নুল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হলো “পরম্পরা” নামে তিনদিন ব্যাপি বাবা শ্রীবাস বসাক ও মেয়ে উর্মিলা শুক্লার যৌথ চিত্র প্রদর্শনী। জেনারেশন গ্যাপ বা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের দূরত্বের মাঝে দুই প্রজন্মের এমন যুথবদ্ধতা আমাদের আকৃষ্ট করেছে। তাই পূর্ব প্রজন্ম অর্থাৎ শ্রীবাস বসাকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর নিজের বেড়ে উঠা এবং কাছে থেকে দেখা তাঁর উত্তর প্রজন্মের চিন্তার ধারাটিকে তাঁর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে। কথা বলেছেন মুহাম্মদ মামুন।

মন ও চিত্রকলা এই দুটোর সম্পর্কটা কোথায়?
আমাদের দেখা, আমাদের মন, আমাদের চারপাশের পরিবেশ এর সব মিলিয়েই একটা অনুভূতি তৈরি হয়। আমরা সমাজে প্রতিনিয়ত যা কিছু দেখছি সেটাই মূলত একজন শিল্পীর ক্যানভাসে ফুটে উঠে।

ছবি আঁকার শুরুটা কীভাবে?
ছোটবেলায় মাকে দেখতাম সেলাই করে কাপড়ে সুন্দর নকশা তুলতে, কাপড় দিয়ে সুন্দর সুন্দর জিনিষ বানাতে। তার থেকে আমার মধ্যেও কিছু একটা তৈরি করার ইচ্ছে জাগতো, সেই ইচ্ছে জাগা থেকে মাটি দিয়ে পুতুল বানাতাম, হাতি ঘোড়ার প্রতিকৃতি তৈরি করতাম। এমনকি অনেক পূজোর প্রতিমাও তৈরি করেছি।

সেই পাড়া গাঁ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা। এতদূর আসার অনুপ্রেরণা পেলেন কীভাবে?
যেহেতু আমার বেড়ে উঠা পাড়াগাঁয়ে আর তখন পাড়াগাঁয়ে এত রঙ পাওয়া যেতো না। ইটের গুঁড়ো দিয়ে লাল রঙ বানাতাম। গাছের কষের সাথে চুন মিশিয়ে হলুদ রঙ বানাতাম, রান্না করা হাঁড়ির নিচ থেকে কালো রঙ জোগাড় করতাম এভাবে রঙ জোগাড় করে করে একটু আধটু আঁকার চেষ্টা করতাম। এরপর লক্ষী স্বরস্বতী ইত্যাদি প্রতিমা গড়তে লাগলাম। গ্রামের লোকজনও পালদের বদলে আমাকেই প্রতিমা তৈরি করতে বলতো। তাছাড়া গ্রাম বাংলার যে ট্র্যাডিশনাল কাজগুলো আছে যেমন পুতুল তৈরি অথবা চালের গুড়ো দিয়ে আলপনার নকশা কাটা এগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করতো।

ছবিতে সাধারণত একজন চিত্রকরের মনের আবেগটাই ফুটে উঠে। প্রকৃতি রঙে রূপে ভরপুর। সেখান থেকে যে যতটুকু পারে তুলে নেয়। মনের তাগিদেই মূলত রঙের ব্যবহারটা বেরিয়ে আসে। এই যেমন আমার কাছে অনেক রঙ থাকলেও একটা ছবি আমি সম্পূর্ণ সাদাকালো করেছি, এটা মনের ভেতর থেকে একটা তাগিদ আসে।

ছোটবেলার একজন আঁকিয়ে আর এই সময়ে এসে একজন পরিপূর্ণ আঁকিয়ে এই দুই সময়ের মধ্যে পার্থক্য কি?
পার্থক্য হলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে অভিজ্ঞতা বেড়েছে। সে প্রভাব হয়তো আঁকাআঁকির মধ্যেও পড়েছে। রঙের ব্যবহারেও অনেক পরিপূর্ণ হয়েছি, সাহসটাও বেড়েছে। এখন আমার ক্যানভাস আমার সাথে কথা বলে।

আমাদের দেশের আঁকাআঁকিতে অরিয়েন্টাল আর্টের যে ধারাগুলো রয়েছে তার প্রভাব কতটুকু?
কিছুটা আছে। এই যেমন টানা টানা চোখ, লতানো গাছ পাতা ইত্যাদি।

অরিয়েন্টাল আর্টের যে বিভিন্ন প্রকার রয়েছে যেমন চাইনিজ আর্ট, জাপানিজ আর্ট, বৌদ্ধ আর্ট, হিন্দু আর্ট তেমনি বাংলা আর্টকে কি আমরা স্বতন্ত্র কোনো ধারা বলতে পারি?
অঞ্চলভিত্তিক বা কোনো বিশেষ ধরনের আর্টকে একটি শ্রেণিভুক্ত করার ব্যাপারটা বেশ বিতর্ক সাপেক্ষ। তারপরেও আলোচনার সুবিধার্থে যদি ভাগ করা হয় তাহলে বাংলা আর্টও সেখানে স্বতন্ত্র একটি শ্রেণি বা শাখা হতে পারে। আমাদের এদেশ রঙ রূপে ভরপুর যা একজন চিত্রশিল্পীর সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

আপনার ছবির ক্ষেত্রে কোন জিনিষের ব্যবহার বেশি?
আমার ছবিগুলোতে সাধারণত আমি সহজ ভাব রাখার চেষ্টা করি এবং মোটা রেখার ব্যবহারটা বেশি করি। আমার ছবিগুলো এমন হয় যাতে সেটা সবাই বুঝতে পারে।

আপনার ছবিগুলোতে মানুষদের দলবদ্ধভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে, এটার কারণ কি?
ঐক্যবদ্ধতাই মানুষকে এতদূর এনেছে। আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটুন দেখবেন সবখানে মানুষ কোনো না কোনো ভাবে দলবদ্ধ। মানুষের অসম্পূর্ণতা, ভীতি, শংকা অথবা নতুন কিছুর প্রত্যয়ের তাগিদে মানুষ দলবদ্ধ হচ্ছে।

একজন চিত্রশিল্পীর মনের অবস্থার সাথে রঙের ব্যবহারের কোনো সম্পর্ক আছে কি?
ছবিতে সাধারণত একজন চিত্রকরের মনের আবেগটাই ফুটে উঠে। প্রকৃতি রঙে রূপে ভরপুর। সেখান থেকে যে যতটুকু পারে তুলে নেয়। মনের তাগিদেই মূলত রঙের ব্যবহারটা বেরিয়ে আসে। এই যেমন আমার কাছে অনেক রঙ থাকলেও একটা ছবি আমি সম্পুর্ণ সাদাকালো করেছি, এটা মনের ভেতর থেকে একটা তাগিদ আসে।

ছবিগুলোর মধ্যে মনের আবেগ কীভাবে ফুটে উঠে?
হয়তো কোনো কষ্টের স্মৃতি আমার মনের মাঝে উঠে আসলো তখন হয়তো রঙের ব্যবহার অতটা উজ্বল হয় না। আবার আনন্দের সময় রঙের উজ্বলতাটা বেড়ে যায়।

একজন আঁকিয়ে পিতা হিসেবে আপনি নিজেকে গর্বিত বলতে পারেন। কেননা আপনার মেয়েও আঁকছে। আপনার মেয়ের আঁকাআঁকিতে আপনার অনুপ্রেরণা কতটুকু?
ওকে দেখতাম পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে ছবি আঁকতো, ছবিগুলোর মধ্যে কোনো জটিলতা থাকতো না। আরেকটি জিনিষ লক্ষ্য করতাম পরিক্ষার খাতায় যার মধ্যে আঁকার জিনিষ আছে ও শুধু সেদিকে আগ্রহী হতো। তখনই আমার মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে ছিল যে, ও যদি ইন্টারমিডিয়েটে ভালো রেজাল্ট করে তাহলে ওকে চারুকলায় দিবো।

আপনার মেয়ের আঁকা ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছি আপনার আঁকার ধরনের চাইতে অনেকটাই আলাদা। বিশেষ করে ছবির মাঝে সূতো, কাপড় বা গাছের পাতা ইত্যাদির ব্যবহার একটু ভিন্ন মাত্রা এনেছে। এ ব্যাপারটি আমাদের একটু বর্ণনা করবেন কি?
প্রথমত হচ্ছে প্রতিটি শিল্পীই একেকজন স্বাধীন চিন্তার অধিকারী। সে তার নিজের মনে আঁকার একটি আপন ভুবন তৈরি করে নেয়। দ্বিতীয়ত আমার ধারণা যেহেতু আমাদের পূর্বপুরুষ বসাক অর্থাৎ তাঁতি সেহেতু হতে পারে পূর্বপুরুষের একটা অনুপ্রেরণা ওর নিজের মধ্যে আপনা থেকেই বেড়ে উঠেছে যার কারণে ওর ছবিগুলোতে সূতো অথবা কাপড়ে একটা ব্যবহার চলে আসছে।

বয়সের সাথে মানুষের চিন্তা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের প্রভাব কি আপনার ছবিতে পড়েছে?
যখন বয়স কম ছিল তারুণ্য ছিল তখনকার ছবিগুলো হতো এক ধরনের আবার এখন বয়স বেড়েছে তারুণ্য কমেছে এখনকার ছবিগুলো হয়েছে আরেক ধরনের।

অর্থাৎ ছবির মাধ্যমে একজন চিত্রশিল্পীর মনের ভাব অনেকটাই প্রকাশিত হয়ে যায়?
কিছুটা। বিশেষ করে আমার ছবিগুলো যেহেতু সহজ ভঙ্গিতে করা তাই এ ছবিগুলো সবাই আরো বেশি বুঝে যায়। তবে হয়তো আমি এক চিন্তা থেকে একটা ছবি এঁকেছি কিন্তু একজন দর্শক সেটি দেখতে দেখতে নিজের বোঝার কোনো পথও খুঁজে পেতে পারে।

আপনার ছবিগুলো একেক সময়ে একেকটা আঁকা। কখনও কি মনেহয় যে এই ছবিটা এমন না হয়ে এমন হলে ভালো হতো?
মাঝে মাঝে আমিও এটা ভাবি। এইযে দীর্ঘদিন ধরে ছবি আঁকলাম, প্রায় দুই হাজারের মতো ছবি আছে আমার। যখন মন ভালো থাকেনা তখন ছবিগুলো দেখি খুঁজি, তফাতটা বুঝতে চেষ্টা করি।

পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?
এখনকার ছেলেমেয়েরা অত্যন্ত ভালো ছবি আঁকে। আমি বিশ্বাস করি এখনকার ছেলেমেয়েরা এক্ষেত্রে অনেক ভালো করবে এবং আমাদের দেশের চিত্রকলার ভবিষ্যৎ অনেক উজ্বল।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে মনেরখবর পাঠকদের সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য।
ধন্যবাদ মনেরখবরকেও।