প্রতিবন্ধী শিক্ষাটাকে এদেশে সমাজকল্যাণ ইস্যু হিসেবে দেখা হয়

প্রতিবন্ধী শিক্ষাটাকে এদেশে সমাজকল্যাণ ইস্যু হিসেবে দেখা হয়

আজ ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের সার্বিক চিত্র, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে মনের খবরের সাথে কথা বলেছেন সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটি (সিএসআইডি)‘র নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম। বিশেষ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মুহাম্মদ এ মামুন।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের সার্বিক চিত্র কেমন?

খন্দকার জহুরুল আলম: তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকদের জীবন যাপনের সুযোগ সুবিধা এমনিতেই কম, এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীরাও ব্যতিক্রম নয়। তবে আশার কথা হলো, সরকারের পলিসি লেভেলে প্রতিবন্ধীদের জন্য আইন ও নীতিমালা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও একটা সমস্যা আছে। আর তা হলো, যতটুকু আলোচনা হচ্ছে ততটুকু কর্মপরিকল্পনা নেই, বিনিয়োগ নেই। তবে যেহেতু প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক বেশি সচেতন ও আন্তরিক সেহেতু আমাদের প্রত্যাশা এটি নিয়ে আরো কাজ হবে।

বছর কয়েক হয় ‘প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন’ নামে একটা আইন প্রণীত হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

খন্দকার জহুরুল আলম: অবশ্যই এটি একটি প্রশংসনীয় কাজ। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে জাতিসংঘের যে সনদ রয়েছে, সে সনদ অনুযায়ী আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইনের একটি দিক নিয়ে আমি বলতে চাই, সেটি হলো প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা। আইনে বলা আছে, শুধু প্রতিবন্ধীতার কারণে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো ভর্তিচ্ছুর ভর্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। আসলে প্রতিবন্ধী শিক্ষাটাকে এদেশে সমাজকল্যাণ ইস্যু হিসেবে দেখা হয়। এখন প্রাথমিক শিক্ষার কথা আমরা যদি চিন্তা করি, তাহলে বাড়ির পাশের স্কুলটাতে আমি না হয় ভর্তি হলাম, কিন্তু আমার শিক্ষার পদ্ধতি কি হবে? প্রতিবন্ধীতা বিভিন্ন ধরনের রয়েছে এবং তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু সেসব এডুকেশন মেটারিয়াল সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই।

সম্প্রতি সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য সারা দেশে ৬০৬টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় করার ঘোষণা দিয়েছে। এটি প্রতিবন্ধীদের জন্য কতটা সহায়ক হবে বলে আপনি মনে করেন?

খন্দকার জহুরুল আলম: শুধু প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো অবশ্যই একটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু একই সাথে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য আলাদা শিক্ষক বা শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করলে আরো ভালো হতো। কারণ প্রতিবন্ধীদের জন্য কাছের কোনো স্কুল, যেমন উপজেলা সদরে বা অন্য কোথাও, সেখানে পড়াশুনা করতে হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন প্রতিবন্ধীকে প্রতিদিন হয়ত ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। এমনটা হলে সব প্রতিবন্ধী তো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে না। আগেই বলেছি, আমি প্রতিবন্ধী হই বা না হই বাড়ির পাশের স্কুলটাতে পড়া আমার অধিকার।

সাধারণ স্কুলগুলোতে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার জন্য কি করা যেতে পারে?

খন্দকার জহুরুল আলম: প্রথম কথা হলো- শিক্ষা বিষয়টা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষাটা রয়ে গেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। এর একটি সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ শিক্ষা পদ্ধতি কেমন হবে, শিক্ষার উপকরণ কি হবে এগুলো ঠিক করা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। আর যেহেতু সাধারণ স্কুলগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে তাই সেখানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে একটি সমন্বয় প্রয়োজন অথবা প্রতিবন্ধী শিক্ষাটাকেও পুরোপুরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এমনিতেই প্রতি ক্লাসে ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্রছাত্রী দেখা যায়। এর মধ্যে একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রতিবন্ধীদের প্রতি আলাদা যত্ন নেওয়া কতটুকু সম্ভব হবে বলে আপনি মনে করেন?

খন্দকার জহুরুল আলম: এটি একটি সমস্যা। এমনিতেই শিক্ষাদানের পাশাপাশি একজন শিক্ষককে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, আদমশুমারি, নির্বাচনের কাজসহ অনেক কিছু করতে হয়। এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি সমস্যা। তাই প্রতিটি স্কুলে প্রতিবন্ধীদের জন্য একজন বা দুইজন বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান আছে কি?

খন্দকার জহুরুল আলম: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে সারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে এদেশে মোট প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ১৫ লক্ষের মতো। এটা সঠিক পরিসংখ্যান কিনা সেটা নিশ্চিত নয়। মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশও যদি প্রতিবন্ধী হয় তাহলেও সংখ্যাটি কোটি ছাড়িয়ে যায়।

 সরকার কি তাহলে শুধু এই ১৫ লক্ষের ওপর ভিত্তি করেই তার পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে?

খন্দকার জহুরুল আলম: অনেকটা তাই। যার কারণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না বা পাওয়া গেলেও তা অপ্রতুল। সরকারের উচিত এক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানোর সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মাঝে সমন্বয় বাড়ানো।

প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বেসরকারিভাবে কতটুকু কাজ হচ্ছে?

খন্দকার জহুরুল আলম: বেসরকারি ভাবেও অনেক কাজ হচ্ছে। তবে সেটিও আশানুরূপ নয়। আমরা যারা এনজিওতে আছি তারা বলি যে, আমরা দেশের ৬৪টা জেলাতে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে জেলার কত অংশ জুড়ে আমরা কাজটা করছি। উপজেলা পর্যায়ে অনেক জায়গাতেই আমাদের যাওয়া হয় না। এমনকি কিভাবে যাওয়া হবে সেটারও কোনো সুনির্দিষ্ট দিকরেখা নেই।

প্রতিবন্ধীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়?

খন্দকার জহুরুল আলম: প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইনে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকটি আসেনি। প্রস্তাবিত মানসিক স্বাস্থ্য আইনে বিষয়টি রয়েছে কিনা সেটি আমার জানা নেই। প্রতিবন্ধীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বিভিন্ন কারণে মানসিক দিকে প্রভাব ফেলে। এদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিবন্ধী নারীদের মানসিক সমস্যা তুলনামূলক বেশি। এছাড়াও দারিদ্র্যের সাথে প্রতিবন্ধীতার একটি সম্পর্ক রয়েছে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের মধ্যে কাদের নিয়ে কাজ বেশি হয়?

খন্দকার জহুরুল আলম: মানসিক প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজের পরিমাণ তুলনামূলক কম। তবে ইদানিং অটিজম ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বেশ কিছু কাজ হচ্ছে। সব ধরনের প্রতিবন্ধীতার মধ্যেই কাজের সমতা আনতে হবে, যাতে তারা তাদের স্বাধীন জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারে বা পরনির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। সেজন্য সরকারের যেমন উদ্যোগী হতে হবে তেমনি তৈরি করতে হবে প্রশিক্ষিত জনবল।

সাধারণ মানুষের এক্ষেত্রে করণীয় কি?

খন্দকার জহুরুল আলম: সকলের সহযোগিতা লাগবে। অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধী আছে কিন্তু তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এক্ষেত্রে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যেমন- চেয়ারম্যান, মেম্বার, ডাক্তার, মসজিদের ইমাম তাঁরা সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রতিবন্ধীদের চলাচলে বা কাজকর্মে যাতে সমস্যা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের দেশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই বা বাস ট্রান্সপোর্টগুলো তাদের ব্যবহার বান্ধব নয়, রেলের ক্ষেত্রেও একই কথা। এসব যেহেতু হচ্ছে না সেহেতু আমাদের সবাইকে মিলেই তাদের সমর্থনে এবং তাদের এগিয়ে চলার পথে সহযোগী ও অংশীদার হতে হবে।

মনের খবরের পক্ষ থেকে অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
1
খন্দকার জহুরুল আলম: ধন্যবাদ মনের খবরকেও।