মূল পাতা / জীবনাচরণ / ফেসবুক ব্যবহারের কারণে আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে

ফেসবুক ব্যবহারের কারণে আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে

খুব বেশি না, ১৫ বছর আগেও আমরা আজকের পৃথিবীর এই রূপটা কল্পনাতেও আনতে পারতাম না। যোগাযোগ মাধ্যমের বিষ্ময়কর বদলহাতের মুঠোয় পৃথিবী- বদলে দিয়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রূপরেখা। সেই সাথে বদলে দিয়েছে আমাদের মনোজগৎ । বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক আমাদের দৈনন্দিন রুটিনের অপরিহার্য একটি অংশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার; ভাববারও ব্যাপার বটে যে- ফেসবুক আমাদের মনোজগতকেও দখল করে নিচ্ছে। এটা হয়তো আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে উপলব্ধি করি। ফেসবুক কীভাবে মনের ওপর প্রভাব ফেলছে সেটা নিয়েই কথা বলেছেন প্রভা (ছদ্মনাম)। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মনের খবরের বিশেষ প্রতিবেদক সাদিকা রুমন। মখ : আপনি কী করেন? প্রভা : আমি সদ্য স্নাতকোত্তর পাশ করেছি। জীবিকা উপার্জনের জন্যে কিছু করছি না এখনো। মখ : ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন? প্রভা : আমি প্রায় একমাস ধরে ফেসবুক ব্যবহার করছি না। বর্তমানে শুধু Google+ ও Youtube ব্যবহার করি। মখ : ফেসবুকে কতটুকু সময় দিতেন? প্রভা : আমি স্নাতকোত্তর পাশ করার পরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটা বড় সময়ই ফেসবুক ব্যবহার করে কাটাতাম। সময়ের শুরুটা হতো ঘুম থেকে উঠেই। এখন আমি কেবল প্রয়োজনের সময়ে Google+ ব্যবহার করি। আর দিনে ২-৩ ঘণ্টা Youtube ব্যবহার করি। মখ : যখন ফেসবুক ব্যবহার করেছেন তখন কি নিজের ভেতর কোনো মানসিক পরিবর্তন অনুভব করতেন? প্রভা : হ্যাঁফেসবুক ব্যবহার করার সময়ে মানসিক পরিবর্তন অনুভব করতাম। মখ : কী কী প্রতিক্রিয়া কাজ করত? প্রভা : ফেসবুক যখন ব্যবহার করতাম তখন আমি আসলে একা থাকতে বেশি পছন্দ করতাম। কিন্তু ফেসবুক তো আসলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। আমিও পারস্পরিক যোগাযোগ সহজতর বিবেচনা করে ফেসবুক ব্যবহার করতে শুরু করি। ফেসবুক ব্যবহার করে সাম্প্রতিক খবরাখবর সম্পর্কে আমি অবগত থাকতামএকথা খুব সত্য। তবে আমার ফেসবুকে কী ঘটছে এই খোঁজ রাখার একটা বিশেষ তাগিদ থাকতো। এক পর্যায়ে আমি খেয়াল করি যেদিনের একটা বড় অংশই ফেসবুকের পেছনে ব্যয় করেছি। আমার উপলব্ধি হয় যেএটি আমার প্রোডাক্টিভ  অ্যাক্টিভিটিসকে ব্যাহত করেছে। এছাড়া বিভিন্ন পোস্ট আমার মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। একটা সময়ে আমি বুঝতে পারিফেসবুক ব্যবহার করার কারণে আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। আর অনেক সময় এমন দেখা যেত যেবন্ধু কিংবা স্বজনেরা এক জায়গায় থেকেও যে যার মতো ফেসবুক ব্যবহার করছি। এটি মূলত একটি নেশাদ্রব্যের মতো হয়ে গিয়েছিলো। মখ : এমন কি হয়েছে যে আপনি ফেসবুকে নেই, তারপরও এই মাধ্যমের টুকিটাকি বিভিন্ন বিষয় আপনার ভাবনাকে দখল করে আছে? প্রভা : হ্যাঁ, ফেসবুকে না থাকলেও সেখানে কী ঘটছে তা জানার আকাঙ্ক্ষা অধিকাংশ সময়েই কাজ করতো। মখ : এই মানসিক প্রতিক্রিয়াগুলো কি আপনার দৈনন্দিন জীবনে অন্যান্য কাজে প্রভাব ফেলত? প্রভা : হ্যাঁ, প্রভাব ফেলতো। মখ : অন্যদের দেখে ঈর্ষা বোধ কিংবা হতাশাবোধ কাজ করতো? মানে এমন মনে হতো- সবাই অনেক কিছু করছে, আমি পিছিয়ে আছি? প্রভা : আমি যে সময় ফেসবুক একাউন্ট চালু করিততোদিনে ফেসবুক প্রায় সবার মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছে। ফেসবুক সম্বন্ধে খুব বেশি না জেনেই আমি ফেসবুক চালাতে শুরু করি। প্রথমদিকে আমার উদ্দেশ্য ছিলো নেটওয়ার্কিং বা সকলের সাথে সংযোগ বজায় রাখা। ধীরে ধীরে আমি উন্নয়নশীল নানা পেইজ ও গ্রুপ দেখি। ঈর্ষাবোধ বললে ভুল হয়আমি বরং উৎসাহিত হতাম। বিনয়ের সাথেই বলছিসংগঠনমূলক কিংবা উন্নয়নমূলক সেই সব বিষয়ের মধ্যে কতগুলো বিষয় সম্পর্কে আমার আত্মবিশ্বাস ছিলো যেএ কাজগুলো আমার পক্ষেও করা সম্ভব। আমার পরিচিত অনেকেই ফেসবুকের কল্যাণে বিভিন্ন ব্যবসা করে সাফল্য অর্জন করেছে। দুই-একজনকে দেখে প্রথমে আমার মনে হয়েছিলোআমি পিছিয়ে আছি। তবে আমি যে মূহুর্তে বুঝতে শুরু করি যেফেসবুকের জগৎ আমাকে সবসময় একটা ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন করে রাখছেতখন আমি নিজের সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। এখনো আমি আমার আশপাশের মানুষদের উন্নয়নের সংবাদ পাই এবং সেখানে ফেসবুকের অগ্রগণ্য ভূমিকার কথা জানতে পারি। শুরুর দিকে হতাশ হতামমনে হতো আমি অনেক পিছিয়ে আছি। তবে এই নেতিবাচক চিন্তা থেকে আমি নিজেকে অনেকটাই মুক্ত রাখতে পারি বলেই বোধ করি। বর্তমানে অশরীরী কৃত্রিম পরিবেশে ঘেরা এক জগতে সশরীরে হাজির থাকার প্রবল তাড়নার চেয়ে নিজের মন-মস্তিষ্কের ওপর আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কাই অগ্রগণ্য আমার কাছে। 
আমিও পারস্পরিক যোগাযোগ সহজতর বিবেচনা করে ফেসবুক ব্যবহার করতে শুরু করি। ফেসবুক ব্যবহার করে সাম্প্রতিক খবরাখবর সম্পর্কে আমি অবগত থাকতাম, একথা খুব সত্য। তবে আমার ফেসবুকে কী ঘটছে এই খোঁজ রাখার একটা বিশেষ তাগিদ থাকতো। এক পর্যায়ে আমি খেয়াল করি যে, দিনের একটা বড় অংশই ফেসবুকের পেছনে ব্যয় করেছি। আমার উপলব্ধি হয় যে, এটি আমার প্রোডাক্টিভ ক্টিভিটিসকে ব্যাহত করেছে। এছাড়া বিভিন্ন পোস্ট আমার মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। একটা সময়ে আমি বুঝতে পারি, ফেসবুক ব্যবহার করার কারণে আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। আর অনেক সময় এমন দেখা যেত যে,বন্ধু কিংবা স্বজনেরা এক জায়গায় থেকেও যে যার মতো ফেসবুক ব্যবহার করছি। এটি মূলত একটি নেশাদ্রব্যের মতো হয়ে গিয়েছিলো।
মখ : আপনার মত অনেকেই এক ধরনের বিরক্তিবোধ নিয়েও ফেসবুকে সচল থাকে, সময়ে অসময়ে উঁকি মেরে দেখে হোম পেইজ- এই বিষয়টাকে কি মানুষ চাইলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? প্রভা : আমার মতেনিজের মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রত্যেকের মাঝে থাকা জরুরি। খারাপ অভ্যাসগুলো বদলে ফেলার জন্য ইচ্ছাটাই খুব বেশি জরুরি। ফেসবুক ব্যবহার খারাপ কোনো কাজ তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে ফেসবুককে দৈনন্দিন অন্যান্য কাজের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া অবশ্যই অনুচিত বলে আমি মনে করি। বিরক্তিবোধ সহকারে সময়ে-অসময়ে হোম পেইজে উঁকি মেরে দেখার বিষয় যদি ঘটে থাকে, তবে তা অবশ্যই মানুষের অভ্যাসের দাসত্বমূলক কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই অভ্যাস বদলানোর ক্ষমতা প্রত্যেকের অবচেতনে অবশ্যই আছে। ভালো-মন্দের বিচারে ইচ্ছা পোষণের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রত্যেকেরই আছে। কিন্তু চর্চাটা সম্ভবত সবার থাকে না। মখ : কেন ফেসবুক মানুষের মানসিক জগতের ওপর এতটা আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? প্রভা : বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক। অনেকের ফেসবুক ব্যবহার আসক্তির পর্যায়ে চলে গিয়েছে। ফলে তারা নিজেদের আবেগ-অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

বিশ্বের সবাইকে সংযুক্ত করার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে মাসিক সক্রিয়তার হিসাবে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২০৭ কোটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারী অন্যদের পোস্টকমেন্টভিডিওপিকচার কিংবা কোনো কোনো ওয়েব লিঙ্কের প্রবাহ যাকে আমরা নিউজ ফিড বলে জানিতা দ্বারা কখনো কখনো ভীষণ উৎসাহিত হচ্ছে বটেকিন্তু কোনো কোনো কনটেন্টের কারণে আত্মহত্যার মত সংবাদও আমাদের কানে এসেছে। মানসিকতার উপরে ফেসবুক যে এহেন আধিপত্য বিস্তার করতে পারেএই বিষয়টি অন্তত আমার কাছে ভীষণ বিরক্তিকর।

ব্যবসায় ও মার্কেটিং কিংবা নেটওয়ার্কিং-এর জন্য ফেসবুক অত্যন্ত কার্যকরী মাধ্যম। এসব কাজের জন্য অনেক মানুষ এর ওপর ইদানীং নির্ভর করছে এবং সফলও হচ্ছে। ফেসবুকের চালনা পদ্ধতি সহজতর হওয়ার কারণেও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এর মুখাপেক্ষী হয়। তাছাড়া একই সাথে শত মানুষের সাথে সংযুক্ত হতে পারার বিষয়টি ব্যবহারকারীদের কাছে আকর্ষণের একটা কারণ।

মানুষ আবেগের বাইরে নয়। এখনকার দিনে সব শ্রেণির মানুষের কাছে ফেসবুক প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। ফেসবুকের পোস্টের ধরন অনুযায়ী মানুষ অবচেতনেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সচেতনতার অভাবেউদাসীনতায় মানুষ নিজেই ফেসবুককে নিজের মানসিকতাসুখের-দুঃখের বোধের উপর আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দিচ্ছে।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে কোনোভাবেই আমাদের জীবন থেকে ফেসবুক নামক সামাজিক মাধ্যমটি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। যেকোনো আসক্তিই ক্ষতিকর। একটু সচেতন হলে ক্ষতিগুলোকে এড়ানো সম্ভব। পরাধীনতা কে চায়! অথচ ভেবেছেন কি- ফেসবুক আমাদেরকে কীভাবে তার অধীন করে ফেলেছে আমাদের অজান্তেই? কেমন করে প্রভাব ফেলছে আমাদের চিন্তার জগতে, কর্মজগতে,সম্পর্কের জগতে? প্রতিদিন যদি নিজের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞেস করি- আজ আমি রক্ত-মাংসের মানুষের সমাজে কতটা সক্রিয় ছিলাম আর কতটা বায়বীয় বা ভার্চুয়াল সমাজে? তাহলে নিজেই নিজেকে বিচার করতে পারব। আর নিজেকে বিচার করতে পারলেই সক্রিয় হবে আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা।

 

এসআর/এমএসএ