মূল পাতা / মানসিক স্বাস্থ্য / মায়ের শারীরিক-মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের ওপরই বাচ্চার ভবিষ্যত নির্ভর করে

মায়ের শারীরিক-মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের ওপরই বাচ্চার ভবিষ্যত নির্ভর করে

একজন গর্ভবতী মায়ের সুস্থতা বলতে শুধু শারীরিক সুস্থতাই বোঝায় না। মানসিক সুস্থতাও তার সার্বিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গর্ভবতী মায়ের নিজের সুস্থতার জন্য, স্বাভাবিভাবে সুস্থ সন্তান জন্মদানের জন্য মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব বিষয়ে মনের খবর প্রতিনিধির সাথে কথা বলেছেন বারডেম হাসপাতাল এবং ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের প্রসূতি বিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. শামসাদ জাহান শেলী।

প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে যেসব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় সেগুলোকে আপনি কীভাবে মোকাবিলা করেন?

কোনো ডাক্তারই তো রোগীর খারাপ চান না। একজন রোগী একটি সুস্থ বাচ্চা জন্ম না দেয়া পর্যন্ত বা একটা সুস্থ বাচ্চা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের দুশ্চিন্তা থাকেই। বাচ্চার জন্ম এবং জন্মের পর কী করণীয় এগুলো তো সবাই জানে না। একটা বাচ্চা ভবিষ্যতে কোন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠবে এগুলো কিন্তু মায়ের পেটে থাকতেই নির্ধারিত হয়ে যায়। আমাদের দেশে একটা বাচ্চার জন্মের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে স্টাডি হয় না। একটা বাচ্চার জন্ম, তার বৈশিষ্ট্য, তার জন্মের সময় মায়ের কী কন্ডিশন ছিল এগুলো নিয়ে স্টাডি হলে কিন্তু অনেক কিছু বেরিয়ে আসে। একটা বাচ্চা সুস্থ হবে কিনা সেটা নির্ভর করে একজন মায়ের গর্ভকালীন সময় থেকেই। আমি বাচ্চা জন্মানোর পর খাওয়ালাম, যত্ম করলাম সেটাতে কিন্তু কিচ্ছু আসবে যাবে না। কোনো বাচ্চা যদি মানসিক কোনো সমস্যা নিয়ে জন্মায় সেগুলো কিন্তু তার গর্ভে আসার সময় থেকেই শুরু হয়। সেজন্য একজন মায়ের গর্ভধারণের আগে থেকেই প্রস্তুতির প্রয়োজন। আমাদের দেশে তো মেয়েরা এমনিতেই নিপীড়িত, অবদমিত। ভাই-বোনের মধ্যে মেয়েকে না দিয়ে ভালো খাবারটা ছেলেকে দেয়া হয়। বিয়ের পরেও তাই। স্বামীর খাওয়া, সুযোগ সুবিধা আগে। এমনকি কোনো মহিলা যদি চাকরিও করেন তবুও তাকে ঘরে ফিরে সব কাজের দেখাশোনা করতে হয়। এতদিন ধরে রোগী দেখার অভিজ্ঞতায় এগুলো আরো বেশি করে আমি পর্যবেক্ষণ করেছি। আমার একজন রোগী ছিল তার শ্বাশুড়ি বলতো, ‘আমরা তো খাই নাই, এত খেতে হবে কেন? বাচ্চা বড় হয়ে গেলে নরমাল ডেলিভারি হবে না।’ পরে দেখা গেল তার আট মাসের বাচ্চার বৃদ্ধি ছয় মাসের সমান। একজন মায়ের শারীরিক-মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের ওপরই বাচ্চার ভবিষ্যত নির্ভর করে। এজন্য মায়ের শারীরিক স্বাস্থ্যের সাথে সাথে মানসিক স্বাস্থ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর একজন রোগীর এই সার্বিক বিষয়েই আমাদেরকে সচেতন থাকতে হয়, পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

গর্ভাবস্থায় বা প্রসব পরবর্তী সময়ে কী ধরনের মানসিক সমস্যা হতে পারে?

প্রেগনেন্সির সময় হরমোনগুলো বেড়ে যায়। হরমোনের এই বৃদ্ধি কিন্তু ডিপ্রেশনও তৈরি করে। এমনিতেই তো একজন মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তার ওপর সে মানসিকভাবে বিষণ্ন থাকে। এগুলো সে ইচ্ছে করে করেনা। মানসিকভাবে কেউ যদি বিষণ্ন থাকে, হতাশ থাকে তাহলে তো তার খেতে বা নিজের প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে ইচ্ছে হবে না। মানসিক বিষণ্নতায় থাকলে গর্ভবতী মায়ের ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মায়ের ডায়াবেটিস হওয়া মানে বাচ্চার ওপর তার প্রভাব পড়া। মায়ের ডায়াবেটিস হলে অনেক সময় ইনম্যাচিউরড ডেলিভারিও হতে পারে। কাজেই মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলেই মায়ের স্বাস্থ্য, সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে। সুস্থভাবে একটি সুস্থ বাচ্চা প্রসবে সক্ষম হওয়ার জন্য গর্ভবতী মায়ের খাদ্য, পুষ্টি, বিশ্রামের যেমন প্রয়োজন তেমনি অত্যাবশ্যক প্রয়োজন মায়ের মানসিক সুস্বাস্থ্য।

যে কোনো গর্ভবতী মায়েরই কি এই সমস্যাগুলো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?

যে কোনো মায়েরই এই সমস্যাগুলো হতে পারে। তবে যাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রি আছে তাদের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা বেড়ে যায়। হয়তো তার ভেতর লক্ষণগুলো সুপ্ত অবস্থায় থাকে। কিন্তু যে পরিমাণ মানসিক চাপে তার মস্তিষ্কের ঐ এরিয়াটা স্টিমুলেটেড হবে সেই চাপটা কখনো পড়েনি। প্রেগনেন্সিতে সে সেই চাপটার মুখোমুখি হয়ে মানসিক সুস্থতা হারাতে পারে।

একজন গর্ভবতী মায়ের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাটাই মুখ্য। আর সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব স্বামীর। অন্যরা যতই যত্ন করুক, দেখাশোনা করুক তাতে কিন্তু স্বামীর জায়গাটা পূরণ হবার না। বাচ্চাটা তো স্বামীরও। মেয়েটা তো শারীরিকভাবে সন্তানকে বহন করছে। স্বামী শুধু পাশে থাকবে, মানসিক সান্ত্বনা দেবে। এটাই যথেষ্ট। কিন্তু এটাও আমাদের দেশে হয় না।

যদি কোনো গর্ভবতী মায়ের মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ পায় সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

এক্ষেত্রে যে ডাক্তার তাকে দেখাশোনা করছেন তার ভূমিকাই মুখ্য। হঠাৎ করে তো কোনো সমস্যা শুরু হয়ে যায় না। আমি যদি পেশেন্ট এর সাথে মিশে যেতে পারি তাহলে সে যেকোনো সমস্যাই আমার সাথে শেয়ার করতে দ্বিধা করবে না। আর তা যদি না করে তাহলে ডাক্তার হিসেবে আমি সফল নই। হয়তো প্রথমেই সবাই বলতে চায় না। কিন্তু পেশেন্ট এর সাথে ডিল করতে করতে তো আমরা বুঝে যাই যে কোন জায়গাটায় সমস্যা হয়। অনেক কিছুই হয়তো স্বামী বা পরিবারের অন্য কারো সাথে শেয়ার করা যায় না। সেক্ষেত্রে আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন কিন্তু আমি খুবই কাছের। সেজন্য অনেক পেশেন্ট এসে তার সমস্যাগুলো বলে। এসব ক্ষেত্রে আমি স্বামী বা লিগ্যাল গার্জিয়ানদেরকে আসতে বলি। লিগ্যাল গার্জিয়ান বলতে বাবা-মা না। বাব-মা তো সমস্যা না। মেয়েটির শ্বশুরবাড়ির থেকে কাউকে আসতে বলি। তারপর তাদেরকে বুঝিয়ে বলি। অবশ্যই সরাসরি সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করি না। পরোক্ষভাবে তাদের বোঝাই।

মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য একজন গর্ভবতী মায়ের নিজের কী দায়িত্ব?

একজন মাকে মনে করতে হবে তার সুস্থতার ওপর নির্ভর করছে তার সন্তানের সুস্থ জীবন, সুস্থ ভবিষ্যত। কাজেই সন্তানের সুস্থ জীবনের জন্যই তাকে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে।

টিভি সিরিয়ালে উপস্থাপিত বউ চরিত্রটির মত সর্বত্যাগী বধূ পেতেই এখনো আমাদের সমাজ আগ্রহী। নারী চরিত্রগুলো আমাদের সমাজে এমনভাবেই নির্মিত হয় যে পরিবারের অন্য সদস্যদের খাওয়ার আগে খেতে, মাছ-মাংসের ভালো টুকরোটা পাতে তুলতে তাদের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। দুধ, ডিম তো বহু দূরের কথা। কিন্তু একজন মা গর্ভে সন্তান এলে নিজের প্রতি উদাসীন থাকতে পারেন না। তিনি নিজের খাওয়া দাওয়া, শারীরিক সুস্থতার প্রতি যত্নবান হন। তবে এটুকুতেই তার দায়িত্ব ফুরোয় না। তাকে নজর দিতে হবে তার মানসিক সুস্থতার দিকেও। মনে রাখতে হবে গর্ভধারণ কেবল প্রাকৃতিক ঘটনামাত্র নয়। গর্ভধারণ একটি নতুন যাত্রার অঙ্গীকার। একজন মাকে অবশ্যই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে একটি দীর্ঘ যাত্রার। আর পরিবারকে হতে হবে সহায়। কেননা সহানুভূতিশীল পারিবারিক পরিমণ্ডল ছাড়া গর্ভবতী মায়ের মানসিক সুস্থতা বজায় থাকা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় ভবিষ্যত মানুষটির শরীর ও মনের স্বাভাবিক বিকাশ।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম