ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা জনিত রোগ

ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা জনিত রোগ

নিদ্রা বা ঘুম মানব জীবনের একটি অতি জরুরী শারীরিক প্রক্রিয়া। ঘুম না হলে আমরা দৈনন্দিন কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারিনা। সহজে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ, বেশী বেশী ভুল করতে থাকা এবং সৃষ্টিশীল কাজের গতি হ্রাস পায়। সর্বোপরি অনিদ্রা যখন একজন মানুষের জীবনের সঙ্গী হয়ে যায় তখন সেই বোঝে এই অসহ্য যন্ত্রণার জ্বালা। আর ঘুমের সমস্যা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে তখন মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত ডায়গনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল ফর মেন্টাল ডিসঅর্ডার (ডিএসএম-৫) ইনসোমনিয়া ডিসঅর্ডার এর কতগুলো লক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

এক্ষেত্রে নিদ্রা বা ঘুমের পরিমাণ এবং গুনগত মান নিয়ে ব্যক্তির মনে উল্লেখযোগ্য ভাবে অসন্তুষ্টি দেখা যায়। যেমন: ঘুম আসতে সমস্যা হয়। অবিরতভাবে বা স্বতঃস্ফুর্তভাবে ঘুমাতে সমস্যা হয় অর্থাৎ বার বার ঘুম থেকে জেগে উঠে অথবা ঘুম থেকে জাগার পর আবার ঘুম আসতে সমস্যা হয়। অতি সকালে ঘুম থেকে জেগে যায় এবং পুনরায় ঘুম আসার ক্ষমতা থাকে না। ঘুমের ব্যাঘাতের কারণে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সামাজিক, পেশাগত আচরণে এবং অন্যান্য আরও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিঘ্নœ সৃষ্টি হয়। ঘুমের এই ধরণের সমস্যা সপ্তাহে অন্তত তিনবার ঘটে থাকে। ঘুমের সমস্যা মাসে অন্তত তিনবার দেখা দেয়। এই ডিসঅর্ডার এর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই সমস্যার সৃষ্টি হয়।

এছাড়া ইনসোমনিয়াকে অন্যান্য স্লিপ ওয়াক ডিসঅর্ডার যেমন: নারকোল্যাপসি, বিদ্রিং-রিলেটেড স্লিপ ডিসঅর্ডার, সার্কাডিয়ান রিদিম স্লিপ ওয়াক ডিসঅর্ডার এবং প্যারাসোমনিয়া দ্বারা ব্যাখ্যা না করাই ভাল। ইনসোমনিয়া সাবসটেন্স  (মনোক্রিয় দ্রব্য/মাদক) নেয়ার ফলে শারীরিক প্রভাব নয়। অন্যান্য মানসিক ডিসঅর্ডার এবং শারীরিক অবস্থা দ্বারা এই ইনসোমনিয়ার লক্ষণ গুলোকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায়না।

বিশেষায়িত লক্ষণ

এপিসোড: এপিসোড তখনই বলা হবে যখন লক্ষণগুলো অন্ততপক্ষে একমাস থাকবে কিন্তু তিন মাসের কম সময় থাকবে।
পারসিস্টেন্স: লক্ষণ গুলো তিনমাস বা তার বেশী হলে বলা হয় পারসিসটেন্স টাইপ।
রিকারেন্ট: এক বৎসরের মধ্যে অন্তত পক্ষে দুই বা ততোধিক বার এপিসোড দেখা দেয়।

যাইহোক, লক্ষণগুলোর সাথে আরও কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। যেমন: এই ডিসঅর্ডার এর ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি ঘুমাতে যাবার পর ২০-৩০ মিনিটের বেশী সময় লাগে ঘুম আসতে। এই ঘুম আসার পর ২০-৩০ মিনিটের বেশী হলেই আবার জেগে উঠে। অতি  সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে একজন ব্যক্তি সাধারণত সকালে যে সময় জেগে উঠে তার চেয়ে ৩০ মিনিট আগেই জেগে যায় এবং মোট ঘুমের পরিমাণ ৬ ঘণ্টা হওয়ার আগেই জেগে যায়। এছাড়া দিনের বেলায় কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ক্লান্ত লাগে, ঘুম ঘুম লাগে। মনোযোগ, স্মৃতি বোধগম্যতা এবং সাধারণত দক্ষতার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। সেই সাথে বিষণ্ণতা এবং দু:শ্চিন্তার লক্ষণ দেখা দেয়। অসুস্থতা, আলাদা থাকা অথবা দৈনন্দিন জীবনে নানা ধরনের চাপের কারণে ডিসঅর্ডারে ভুগতে পারে। দুঃশ্চিন্তা, একটুতেই দুঃখিত হওয়ায় প্রবণতা, অতি আবেগ, আবার অনুভূতি চেপে রাখার প্রবণতার কারণে এই ইনসেমানিয়াতে ভোগার ঝুঁকি থাকে। পরিবেশ গতকিছু উপাদান যেমন: আলো, অসহনীয় উচ্চ তাপমাত্রাও এই ডিসঅর্ডার হওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।

ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বেশী হয়। যে কোন বয়েসে এই সমস্যা হতে পারে। তবে প্রথম এপিসোড প্রাপ্ত বয়স্ক তরুণদের মধ্যে বেশী দেখা দেয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে মনোপোজের পরে হতে পারে। ঘুমের সমস্যা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা, মনোযোগ দেয়া বা চেষ্টা করা হলে স্বাভাবিক ঘুমের প্রক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটে। কার কার ক্ষেত্রে ঘুমের অস্বাভাবিক অভ্যাস হয়। যেমন: বিছানায় অতিরিক্ত সময় অতিবাহিত করা। ঘুমের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচী না থাকা। ঘুম হবেনা এই ভয়ে থাকা। আবার দিনের বেলায় কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটবে এটা নিয়ে আশংকায় থাকা। এছাড়া নির্ঘুম রাত গুলোতে তার মধ্যে কিছু কাজ করার অভ্যাস হয় যার কারণেও সেই সময় সে ঘুম থেকে জেগে উঠে। অপর পক্ষে একজন মানুষ সহজেই ঘুমিয়ে যেতে পারবে যদি সে এভাবে চেষ্টা না করে। যারা তাদের প্রাত্যহিক সময় অনুযায়ী ঘুমাতে যায় তাদের ঘুম ভাল হয়।

পরিশেষে যারা ইনসোমনিয়া ডিসঅর্ডারে ভুগছেন তারা ঔষধ এবং কগনিটিভ বিহ্যাভিয়র থেরাপির (CBT) মাধ্যমে সুস্থতা লাভ করে প্রশান্তিময় তৃপ্তির ঘুমে ঘুমিয়ে যেতে পারবেন। তখন মনে অনুভূতি আসতে পারে আহ্ পৃথিবীটা এত শান্তির জায়গা।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

পারভীন বেগম

সাইকোলজিস্ট