মূল পাতা / মন ও ক্রীড়া / সময় এসেছে স্পোর্টস সাইকোলজি নিয়ে কাজ করার

সময় এসেছে স্পোর্টস সাইকোলজি নিয়ে কাজ করার

অনুপম হোসাইন একজন ক্রীড়া ভাষ্যকার এবং ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে মনেরখবরের সাথে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তুলে ধরেছেন ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার দিক। মনেরখবরের পক্ষ থেকে বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মুহাম্মদ মামুন।  মখ : মেডিকেলে পড়াশুনা করে খেলাধুলায় আসলেন কীভাবে? অনুপম হোসাইন : হ্যাঁ, আমি বেসিক্যালি এমবিবিএস, এমপিএইচ করেছি বিহেভিয়ারাল সায়েন্সে তারপর এমফিল করেছি নিউট্রিশনের উপর। তারপর স্পোর্টস নিউট্রিশনের উপর পিএইচডি শুরু করেছিলাম তবে সেটা শেষপর্যন্ত কন্টিনিউ করা হয়নি। পরবর্তীতে ইচ্ছে আছে সেটা করার অথবা স্পোর্টস ইনজুরির উপর পিএইচডি করার একটা ইচ্ছে আছে। মখ : পেশা হিসেবে খেলাধুলাকে নেয়ার ইচ্ছে আসলো কীভাবে? অনুপম হোসাইন : ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা করতাম এবং একই সাথে আবৃত্তি করতাম। তারপর একটা সময় মনে হলো যে এই দুটোকে একত্র করে কীভাবে কিছু করা যায়। এভাবেই খেলার ধারাভাষ্য ও উপস্থাপনায় আসা। মখ : শুরুটা কীভাবে বলবেন কি? অনুপম হোসাইন : লেখালেখি শুরু করি ১৯৮৮ সালে, তারপর ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যোগদানের জন্য অডিশন দেই। এর আগে ধারাভাষ্যকার প্রয়াত হামিদ ভাই-এর অধীনে একটি কোর্স করি এবং সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করি, একই সাথে বিটিভির অডিশনেও আমি ফার্স্ট হই। ১৯৮৯ সালের পর আমাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর ২০০৭ পর্যন্ত টানা কাজ করে গেছি। এক সময় বিটিভির স্পোর্টস মানেই আমাকে বোঝাতো। প্রথম দিকে মেডিকেলে পড়ার সময় যতটুকু সময় আমি পেয়েছি বিটিভিতে কাজ করেছি। রংপুর মেডিকেলে পড়ার কারণে প্রতি সপ্তাহের শেষে ঢাকায় এসে আমাকে কাজ করতে হতো। এরপর ২০০৭ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত এটিএন বাংলার স্পোর্টস কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছি। এই সাত বছরে এটিএন বাংলার জন্য প্রায় তিন হাজার প্রোগ্রাম তৈরি করেছি। এর বাইরেও স্পোর্টস ট্যুরিজম, স্পোর্টস মেডিসিন নিয়ে কাজ করেছি। আমি ন্যাশনাল ফুটবল টিমের ডাক্তার ছিলাম। ন্যাশনাল ক্রিকেট টিমের সাথে কাজ করেছি। ন্যাশনাল হকি, ন্যাশনাল হ্যান্ডবল, ন্যাশনাল ভলিবল টিমের ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছি। মখ : এদেশের স্পোর্টসের অতীত এবং বর্তমানের একটা তুলনামূলক চিত্র জানতে চাই? অনুপম হোসাইন : অতীতে আমরা দেখতাম খুব ভালো মানুষগুলো, খুব ভালো ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষগুলো খেলাধুলায় এসেছেন বা খেলাধুলাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এখন যেটি হচ্ছে সেটি হলো, গত ১০/১৫ বছরে একেক সরকার আসছে আর তাদের কিছু লোকজন স্পোর্টসে পুনর্বাসন করছে। অর্থাৎ স্পোর্টসে জড়িত হচ্ছে রাজনৈতিক মানুষজন এবং বিভিন্নভাবে লবিং গ্রুপিং করে এখানেই থেকে যাচ্ছে। যার কারণে তাদের দ্বারা স্পোর্টস বরং ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছে এবং তারাই ফেডারেশনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। যা খুবই দুঃখজনক একটা ব্যাপার। পাশাপাশি যেটি হয় দীর্ঘদিন ধরে একই ফেডারেশনে একই মানুষ সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছেন। যার ফলে উনার আইডিয়াগুলো হয়তো পাঁচ বছরেই ব্যবহার করে ফেলেছেন, কিন্তু তারপরও দীর্ঘ সময় থেকে যাচ্ছেন। হয়তো তাঁর আর কোন পেশা নেই যার কারণে এই গদিটাকেই তিনি দীর্ঘ সময় আঁকড়ে ধরে রাখতে চান। মখ : সংগঠনগুলোর দৈন্যতা আমাদের খেলাধুলাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? অনুপম হোসাইন : আমরা সবাই জানি যে সুস্থ দেহে সুন্দর মন বসবাস করে। আমরা আরও জানি যে খেলাধুলার মাধ্যমে ভেতরের স্পিরিটটার উন্নয়ন ঘটানো যায়। এছাড়াও মানুষের মধ্যে যেসব পজেটিভ দিকগুলো খেলাধুলার মাধ্যমে বাড়ানো সম্ভব। এখন আমার নিজের মধ্যে যদি দুর্বলতা থাকে তাহলে যাদের আমি তৈরি করবো তারা খুব একটা ভালো হবে না। যার ফলে আমাদের কোন কোন স্পোর্টস হয়তো এগিয়েছে তবে সার্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের খেলাধুলার মান দিনদিন নিম্নগামী। মখ : কিন্তু ক্রিকেটসহ কিছু খেলাধুলায় বাংলাদেশ তো ভালো উন্নয়ন ঘটিয়েছে? অনুপম হোসাইন : ক্রিকেটের কথা আমরা যদি বলি তাহলে আমার কেন জানি মনে হয় হয়তোবা একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর হতে পারে ক্রিকেটের উন্নয়নের পথটাও আমরা হারিয়ে ফেলতে পারি। ঠিক যেভাবে পথটা আমরা ফুটবলের ক্ষেত্রে হারিয়েছি, দাবায় হারিয়েছি, হ্যান্ডবলে হারিয়েছি, কাবাডিতে হারিয়েছি। ক্রিকেটে এখন ভালো করার একটা জোয়ার চলছে। আমি ডাক্তার হিসেবে, সাংবাদিক হিসেবে, উপস্থাপক হিসেবে, স্পোর্টসের সাথে অনেকদিন জড়িতে সে হিসেবে আমার কেন জানি ধারণা একটা সময় ক্রিকেটও ভুগবে। কারণ এখন যেসব নজির আমরা ক্রিকেটে দেখতে পাচ্ছি তার একটা প্রভাব ক্রিকেটে পড়বে। হয়ত সেটি তিন বছর পরে অথবা পাঁচ বছর পরে। তখন দেখা যাবে ক্রিকেটে একটা স্থবিরতা চলে আসবে। মখ : উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পথ কি হতে পারে বলে মনে করেন? অনুপম হোসাইন : আমরা যদি ভালো সংগঠক তৈরি করতে না পারি, সত্যিকারের সংগঠকদের না আনতে পারি, সংগঠক তৈরির যে পথ সে পথকে যদি মসৃণ করতে না পারি তাহলে এটা হতে বাধ্য। এখান থেকে পরিত্রাণের পথ সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা এবং সত্যিকার সংগঠকদের সংগঠনে আসার পথকে মসৃণ করা। মখ : সাংগঠনিক দুর্বলতা খেলোয়াড়দের মনে কেমন প্রভাব ফেলে? অনুপম হোসাইন : আমি কয়েকটি ফেডারেশনের কথা জানি। তারমধ্যে ব্যাডমিন্টন একটি। বাংলাদেশের সাফল্যের ক্ষেত্রে যে খেলাটি বড় একটি পথ হতে পারতো। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ একজন খেলোয়াড়ের উপর ভর করে ব্যাডমিন্টনটাকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে গেলো আর আমরা শুধু সাংগঠনিক দুর্বলতা, ফেডারেশনের ভেতরের রাজনীতির কারণে এটা করতে পারিনি। মখ : যেমন? অনুপম হোসাইন : দেখা গেছে দুইজন বা তিনজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী এবং তাঁদের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে একটি ফেডারেশন দিনের পর দিন পিছিয়েই যাচ্ছে। খেলোয়াড়রা তাঁদের প্রাইজমানি পায় না, ক্যাম্পে যতদিন থাকার কথা সে সুযোগ সুবিধা তাঁরা ঠিকমতো পায় না। খেলোয়াড়দের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে রাখা হয়। ভালো খেলার জন্য যে পরিবেশটা প্রয়োজন সে পরিবেশটা তাঁরা পায় না। এখানে আমি তো মাত্র একটি ফেডারেশনের কথা বললাম। বাংলাদেশের অনেক অনেক ফেডারেশনের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। যেমন- দাবা, শুটিং, আর্চারি ইনফ্যাক্ট সব খেলাতেই মন যদি মনোযোগী না হতে পারে, একাত্ম না হতে পারে তবে সে খেলায় কোনদিনও সাফল্য আসবে না। আর মনকে বিচলিত করার জন্য যতকিছু প্রয়োজন তার প্রায় সবই আমাদের ফেডারেশনগুলোতে উপস্থিত। মখ : এদেশের খেলাধুলায় খেলোয়াড়দের মেন্টার স্কিল ডেভলপমেন্টের জন্য কিছু হচ্ছে কি? অনুপম হোসাইন : আমার চোখে খুব একটা পড়েনি। কিছু প্রচেষ্টা হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে, যেটাকে ঠিক অর্গানাইজড ওয়েতে বলা চলে না। যেমন, অলিম্পিক এসোসিয়েশনের মেডিকেল কমিটিতে কিছু কাজ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন মেডিকেল কমিটি থেকে কিছু কাজ করা হয়েছে। আমার মনে হয় যে এখানে কাজ করার মতো অনেক জায়গা রয়েছে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিজ্ঞানীগণ যারা আছেন তারা যদি এগিয়ে আসেন তাহলে ভালো হয়ে। কারণ ক্রিকেট থেকে শুরু করে এই সেক্টরের খেলোয়াড়রা এটি চায়। ক্রিকেটের জাতীয় দলে বা বয়সভিত্তিক দলগুলোতে যারা আছেন তারা হয়তো এই সুবিধাটি পাচ্ছেন, কিন্তু এরপরেও বিশাল এক ক্রিকেটার গ্রুপ রয়েছে যাদের এই সেবাটা প্রয়োজন। আবার ফুটবলে তো প্রয়োজন আছেই। ক্রিকেটে, ফুটবলে বা অন্যান্য খেলাধুলায় খেলোয়াড়দের সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট বা মেন্টাল সাপোর্ট দেয়ার কোন কর্মসূচি নেয়া হলে একটা বড় সাড়া পাওয়া যাবে। মখ : অর্থাৎ ‘স্পোর্টস সাইকোলজি’ আলাদা একটি প্রফেশন হতে পারে? অনুপম হোসাইন : আমার তাই মনে হয়। এবং এর কাজের ক্ষেত্রটাও অনেক বড়। যেহেতু এখানে কাজের প্রচুর জায়গা রয়েছে তাই হতে পারে প্লেইন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে কিছু ছেলেপিলে নিয়ে তাদের ট্রেনিং করিয়ে ফেডারেশন বা ক্লাবগুলোর সাথে কাজ করার উপযোগী করে গড়ে তোলা, আবার হতে পারে যারা সাইকোলজি নিয়ে পড়াশুনা করছেন তারা যদি সাইকোলজি নিয়ে কাজ করতে চায় তাহলে তাদের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। আমার মনেহয় এখন সময় এসেছে যেখানে প্রিমিয়ার ডিভিশনে যারা খেলছেন অন্তত তাঁদের জন্য হলেও স্পোর্টস সাইকোলজিটা অবশ্যই প্রয়োজন। মখ : স্পোর্টস সাইকোলজি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা এদেশে একেবারে নেই বললেই চলে। কেন এমনটা হচ্ছে? অনুপম হোসাইন : এখানে আমার অভিজ্ঞতার উদাহরণ দেই। আমি যখন ভেবেছিলাম যে স্পোর্টস মেডিসিনের উপর ক্যারিয়ার গড়বো (যদিও পরবর্তীতে তা আর করা হয়নি) তখন অর্গানাইজারদের কাছে স্পোর্টস মেডিসিন ছিলো একটি একটি ব্যাপার যে, তাঁদের ধারণা ছিলো স্পোর্টস মেডিসিন এমন কিছু ওষুধ যা খেলে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বেড়ে যায়। অর্থাৎ সে সময় অর্গানাইজারদের স্পোর্টস মেডিসিনের উপর কোন ধারণা ছিলো না। কিন্তু এখন তারা স্পোর্টস মেডিসিনের কথা শুনছেন এবং প্রয়োগ করছেন। তার মানে এখন যারা স্পোর্টস সাইকোলজির নাম শোনেননি তারা হয়তোবা পাঁচ বছর পর শুনবেন। তাই এখন থেকে কাজ শুরু না করলে পিছিয়ে যাওয়া হবে। বলা চলে স্পোর্টস সাইকোলজির ক্ষেত্র পুরোপুরি তৈরি হয়ে আছে কিন্তু আমরা সেটাকে ব্যবহার করতে পারছি না। মখ : খেলাধুলার ক্ষেত্রে এদেশে আরেকটা সমস্যা হলো অভিভাবকরা কেউ চান না যে তাঁদের সন্তান খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিক? অনুপম হোসাইন : আমার মনেহয় সাকিব কিংবা তামিমের সাফল্য অনেক অভিভাবককে অনুপ্রাণিত করেছে। এমনকি সরাসরি না হলেও তাঁদের মনের ভেতরে খেলাধুলার প্রতি একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। আগে যেখানে দেখা যেতো বিকেএসপিতে ভর্তি হতে আসছে বাবা মায়ের ডানপিটে বা বখে যাওয়া ছেলেটা। কিন্তু এখন সে পরিস্থিতি নেই, এখন কিন্তু সেখানে অনেক প্রতিযোগিতা। এক ক্রিকেটেই মাত্র বিশটি আসনের বিপরীতে অন্ততপক্ষে দুই লাখ বাচ্চা আবেদন করে এবং সেখান থেকে বাছাই হতে হতে বিশ জনকে ভর্তি করানো হয়। তবে একদিক থেকে আপনার সাথে আমি একমত যে, তুলনামূলভাবে নিম্নবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের খেলাধুলায় দিতে বেশি চায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিভাবকগণ যখন এটি চাওয়া শুরু করবে তখন পরিবর্তনটি আরও বেশি হবে। যেটা দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় আমরা দেখি। যেমন, জার্মানিতে একটা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিও চায় যে তাঁদের সন্তান একজন স্পোর্টসম্যান হোক। এর একটা কারণ রয়েছে। ওদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খেলাধুলা আবশ্যিক একটা বিষয়, পড়াশুনার পাশাপাশি একটা খেলাধুলার মাঝে তাকে থাকতেই হবে। কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সে ব্যবস্থা নেই। মখ : মনেরখবরে সময় দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। অনুপম হোসাইন : ধন্যবাদ মনেরখবরকেও।