প্রকৃত বন্ধুত্বের বিবর্তন

প্রকৃত বন্ধুত্বের বিবর্তন

সেইন্ট টমাস একুইনাস একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন, “এই পৃথিবীতে প্রকৃত বন্ধুর চেয়ে বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না”। এটি সহজে একমত পোষণ করার মত একটি উক্তি। প্রকৃত বন্ধু তারাই যাদের দুঃসময়ে পাশে পাওয়া যায়। গ্রিক দার্শনিক ইউরইপাইডস উক্তি করেছিলেন, “প্রকৃত বন্ধুরা তাদের ভালবাসা কষ্টের সময় দেখায় সুখের সময় নয়”। একজন রেডিও হোস্ট ওয়াটার হুইন্সেন বলেছিলেন, “একজন প্রকৃত বন্ধু তখনই আপনার পাশে দাঁড়াবে যখন গোটা দুনিয়া আপনার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে”। বিখ্যাত শিল্পী জাস্টিন বিবার বলেছেন, “যখন আপনার খারাপ সময় যাবে তখন যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা হচ্ছে একজন প্রকৃত বন্ধু”।

এসব উক্তি পড়ে আমরা বুঝতে পারি আমদের কঠিন সময়ে বন্ধুদের পাশে চাই। আমাদের বন্ধুরা কি এজন্যই আমাদের জীবনে আছে? কিন্তু কেন? কেন আমরা বন্ধুদের উপর এভাবে কঠিন সময়ে পাশে থাকার ব্যাপারটি চাপিয়ে দেব? এটি খুব কঠিন একটি ধাঁধার সহজ একটি প্রশ্ন। এই ধাঁধাটি থেকে বুঝতে পারা যায় আমরা কোন না কোন উপকারের আশায় বন্ধুত্ব করে থাকি। কথাটি কঠিন হলেও সত্য। বন্ধুর থেকে আমরা যখন কোন উপকার পাই না তখন নতুন বন্ধু খুঁজি।

বন্ধুত্ব অচেতন এটি সমস্যা না, সমস্যা হল আমরা এমন একটি ব্যাপারে বিশ্বাস করি যে আমরা আমাদের বন্ধুদের সাহায্য তখন চাই যখন হয়ত আমরা নিজেরাও তাদের তেমন একটা সাহায্য করতে চাই না। যখন আমরা কষ্টে থাকি, অসুস্থ থাকি তখন আমরা আমাদের বন্ধুদের কাছে চাই। কিন্তু আমরা এই মনোভাব পোষণ করি না যে আমরা তাদের এই উপকারটা তাদের প্রয়োজনে ফেরত দেব। আর এ কারণেই আমাদের বন্ধুরা মাঝে মাঝে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময় আমাদের ছেড়ে চলে যায়।আর কিছু বন্ধু যখন আমাদের তাদের দরকার চাকরি চলে গেলে অথবা অসুস্থ হলে অথবা কোন কারণে বিষণ্ণ হলে আমদের ছেড়ে চলে যায় আবার যখন আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিয়ে আসি তখনি তারা ফিরে আসে আর তখনই আমরা তাদের বলি সুসময়ের বন্ধু।

এই ধাঁধার সমাধান হচ্ছে অবশ্যই প্রকৃত বন্ধুরা আমাদের প্রয়োজনের সমস্যা ছেড়ে যাবে না কেননা তারা জানেন আমরা যখন আবার সুস্থ হবো, চাকরী পাবো অথবা বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠবো তাদের প্রয়োজনে আমরা এগিয়ে যাব। আমরা প্রকৃতির বিভিন্ন ব্যাপারে যেমন সংবেদনশীল তেমনি বন্ধুত্বের বিভিন্ন ব্যাপারেও আমরা সংবেদনশীল, তাদের আচার আচরণে আমরা আঁচ করতে পারি যে তারা আমার প্রয়োজনের সময় আমার পাশে থাকবে কি না। এর মানে এই নয় যে আমরা শুধু আমাদের বন্ধু আমাদের ছেড়ে চলে যাবে এই ব্যাপারটি দেখি। আমরা আরও কিছু ব্যাপার দেখে বন্ধুত্ব করি যেমন কোন বন্ধুটি আমার সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছে, কে বেশি দয়ালু, কে বেশি সুন্দর, কে বেশি মজাদার। কিন্তু প্রধান ব্যাপারটি হল বন্ধুদের উপর একটা চাপ থাকে যে তারা যেন আমাদের কঠিন সময়ে ছেড়ে না চলে যায় আর এভাবেই মানব বন্ধুত্বের ব্যাপারটি কাজ করে।

আমাদের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনটি আকর্ষণীয় বিবর্তনমূলক যুক্তি নিচে দেয়া হলো:

১। যারা আমাদের প্রয়োজনে সাহায্য করেছে তাদের কাছে নিজেকে ঋণী মনে করা

সবচেয়ে স্পষ্ট ফলাফল টি হল যেসব বন্ধুরা আমাদের কঠিন সময়ে আমাদের পাশে থাকে তাদের কাছে আমরা নিজেদের ঋণী মনে করি। আমরা মাঝে মাঝে জানি যে তার সাথে বন্ধুত্ব রাখা উচিৎ নয় এরপরও আমরা তার সাথে থাকি কেননা আমাদের মাথায় এটা থাকে আমাদের প্রয়োজনে তারা পাশে ছিল। আমরা আমাদের বন্ধুরা যখন খুশি থাকে তখন তাদের জন্য অনেক কিছু করি কিন্তু যখন কেউ দুঃখে থাকে তখন তার জন্য আমরা তেমন কিছু করতে চাই না। মোটকথা ভাল হোক আর খারাপ আমরা আমাদের বন্ধুদের সেভাবেই নির্বাচন করি এবং চাপ তৈরি করি যেন আমাদের কঠিন সময়ে তারা আমাদের পাশে থাকে।

২। এমন বন্ধুদের খোঁজা যারা আমাদের আলাদা ভাবে

আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন আমাদের বন্ধুরা আপনার প্রতিভা এবং দক্ষতা নিয়ে কিভাবে কথা বলে! আমরা বন্ধু নির্বাচনের সময় এই ব্যাপারটি খেয়াল রাখি যে কে আমাদের প্রতিভা অথবা দক্ষতার কদর করে। অথবা আমরা বন্ধু নির্বাচনে ক্ষেত্রে এই দিকটি দেখি যে কে আমাদের সাধারণ ব্যাপারগুলোকেও কদর করে। আমাদের বন্ধু খোজা উচিৎ যারা আমাদের প্রতিভা গুলোর দাম দেবে, আমাদের মূল্য বুঝবে তাহলে আর প্রয়োজনের সময় তারা আমাদের ছেড়ে যাবে না। মোট কথা আমদের যখন কোন বন্ধুর কাছে সাহায্য চাইতে হয় তখন এটি মাথায় রেখে চাইতে হবে যেন এটি ফেরত না দিতে হয় এবং আমাদের গুণ এবং দক্ষতাকে যেন তারা কদর করে।

৩। বর্তমান সময়ে বন্ধুত্বের সমস্যা

আমরা অনেকেই বলি প্রকৃত বন্ধু পাওয়া কঠিন কিন্তু কেন? আমরা অনেক ভালভাবে জীবন যাপন করছি, সুস্থ আছি নিরাপদে আছি যে কারণে আমরা আমাদের বন্ধুদের পরীক্ষা করতে পারি না। আসলে কোন বন্ধুটি আমার পাশে থাকবে আমরা বুঝি না। কে সুময়ের বন্ধু আর কে প্রকৃত বন্ধু এই ব্যাপারগুলো বুঝার জন্য কিছু উপায় থাকা উচিৎ। বন্ধুত্বের সংজ্ঞা অবশ্য ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে আলাদা, সংস্কৃতির ভিত্তিতে আলাদা। কিন্তু বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটি সবার জন্য সত্য তা হল আমরা চাই আমাদের বন্ধুরা যেন প্রয়োজনের সময় আমাদের পাশে থাকে। আমার কাছে বন্ধুত্বের মডেলটি ভিন্ন। আমি আমার বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য নিজের পকেটের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে দেব, তার কষ্টে এগিয়ে যেতে নিজের কষ্ট ভুলে যাব, তার জীবনের জন্য নিজের জীবন বাজি রাখব।

উপরের সব গুলো কারণই বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের গোপন বিবর্তনমূলক যুক্তি।

তথ্যসূত্র-
(www.psychologytoday.com/blog/real-talk/201709/the-evolution-true-friendship)

কাজী কামরুন নাহার, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মনেরখবর.কম