মূল পাতা / সংবাদ / ২৪ মে বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস

২৪ মে বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস

১৯৮৬ সাল থেকে প্রতিবছর মে মাসে সিজোফ্রেনিয়া সচেতনা সপ্তাহ পালিত হয়। মে মাসের ২০ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত চলে এই আয়োজন। ১৯৯২ সাল থেকে ২৪ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস’। এ বছরও সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়েছে সিজোফ্রেনিয়া বিষয়ে সচেতনতামূলক নানা আয়োজনে।

সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত মানুষটির বিভিন্ন মানসিক উপসর্গ দেখা দেয়, যার ভিতর হ্যালুসিনেশন এবং ডিলুশন অন্যতম। হ্যালুসিনেশন, অর্থাৎ বাস্তবে নেই বা ঘটছে না, এমন কিছু বিষয়কে আক্রান্ত মানুষটি সত্যি অনুভব করে। ডিলিউশন মানে হলো, ভ্রান্ত বা ভুল কিছু বিশ্বাস। এমন বিশ্বাস হয় যে, কেউ বুঝি তাকে অদৃশ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে বা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছে, যা বাস্তবে সত্যি না।

এছাড়াও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত মানুষজন হুট করেই একটি বিষয় থেকে অন্য আরেকটি বিষয়ে কথা বলা শুরু করতে পারেন, যার সঙ্গে আগেরটির কোনো সম্পর্ক নাই। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবন-যাপন থেকেও নিজেদের গুটিয়ে নেন। অন্যের ওপর সহিংসতা না করে বরং নিজেই সহিংসতার শিকার হন।
অনেক সময় সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা লজ্জার কারণে চিকিৎসার সাহায্য চাইতে আসে না।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবদানে বর্তমানে এই রোগীরা শুধু আরোগ্য লাভই করছেন না, নিজেদের জন্য তাঁরা অর্থপূর্ণ ও সম্মানিত জীবনও নির্মাণ করছেন।
বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় তিন কোটি লোক সিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগছেন। বাংলাদেশে এই রোগীর সংখ্যা ১৬ লাখেরও বেশী।

সঠিক চিকিৎসা না পেলে তাঁদেরকে জীবনে বিভিন্ন দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। অন্যদের তুলনায় তাঁরা ছয়–সাত গুণ বেশি বেকার থাকেন, গৃহহীন থাকেন (রাস্তায় ভবঘুরে জীবন যাপন করেন), এমনকি অনেকে আত্মহত্যাও করতে পারেন।

সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের মধ্যে ধূমপানের হার দুই থেকে ছয় গুণ বেশি। তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি স্থূলতায় ভোগেন, তাঁদের মধ্যে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের হারও অধিক থাকে। অথচ অন্যদের তুলনায় তাঁদের শারীরিক রোগের চিকিৎসায়ও অবহেলা করা হয়।

সঠিক চিকিৎসায় শুধু আরোগ্য লাভ করেনই না, তাঁরা গড়ে উঠতে, বেড়ে উঠতেও পারেন যথাযথ ভাবে। এর জন্য ওষুধ ও চিকিৎসার পাশাপাশি কমিউনিটি বেসড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করতে হবে। যত আগে থেকে চিকিৎসা শুরু হবে, ফল তত ভালো হবে।

চাকরির সংস্থান, বাসস্থানের ব্যবস্থা, যথাযথ শিক্ষার সুযোগ, উপযুক্ত বিনোদন এবং উষ্ণ ও ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক জীবন এঁদের আরোগ্য লাভকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আমরা একটি ভালো জীবনের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকি, তাঁদের প্রত্যেকের জন্য সেসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের পরিবারে ভারসাম্য পরিবেশ বজায় রাখা, সংযত আচরণ করা এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

যদি তাঁদের প্রকাশ্য সমালোচনা করা হয়, শত্রু-মনোভাব পোষণ করা হয় এবং অতিরিক্ত আগলে রাখার চেষ্টা করা হয়, তাহলে এই রোগের তীব্রতা বাড়ে এবং রোগটির পুনরায় আক্রমণের হার বাড়ে। তাই পরিবারের সদস্যদের সাইকো-এডুকেশন দিলে ও ফ্যামিলি থেরাপি দিলে পুনরায় আক্রমণ কমিয়ে রাখা যায়। এছাড়াও শারীরিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী বিশ্বে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের শতকরা ৯০ ভাগের বেশির বসবাস উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যাদের অর্ধেকের বেশি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। বিপুল এ জনগোষ্ঠী প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার ও চিকিৎসার অভাবে তাদের কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথে অন্তরায়।

বংশগতি ও জিনেটিক কারণ, গর্ভ ও প্রসবকালীন জটিলতা, পরিবেশগত কারণ, নগরায়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, মানসিক চাপ, অন্যান্য শরীরিক ও জৈবিক কারণ (মস্তিষ্কের রসায়ন), বিকাশজনিত সমস্যা, মনোসামাজিক কারণ সিজোফ্রেনিয়া রোগের জন্য দায়ী।

সাধারণত তরুণ বয়সে (১৫-৪৫ বছর) এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং পুরুষদের মধ্যে এ রোগের হার কিছুটা বেশি। জীবনের সবচেয়ে কর্মময় সময়ে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে একজন ব্যক্তির কর্মক্ষমতা লোপ পায় এবং জীবনের গতিপথ বদলে যায়।

এ রোগের বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিকিৎসার জন্য ওষুধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ওষুধ ব্যতীত এ রোগের উপশম সম্ভব নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ রোগের কারণে ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজকর্ম, ব্যক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য মনোসামাজিক প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর ব্যক্তিগত চাহিদা ও তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সম্মান প্রদান ও ব্যক্তিমর্যাদাকে সবার উপরে স্থান দিতে হবে।

সিজোফ্রেনিয়া ও অন্যান্য মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির রোগনির্ণয় করে দ্রুত চিকিৎসাসেবার আওতায় নিয়ে আসতে পারলে তাদেরকে উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।