সেক্স্যুয়াল মিথ ও যৌন স্বাস্থ্য

সেক্স্যুয়াল মিথ ও যৌন স্বাস্থ্য

ভীমরতি শব্দের আভিধানিক অর্থ ভীষনরাত্রি । ‘ভীম’ মানে ভীষন আর ‘রতি’ মানে রাত্রি। ভারতীয় পুরাণ মতে বয়স সাতাত্তর হলে সাত মাসের সপ্তম রাত্রির নাম ‘ভীমরতি’ । এ রাতের পর মানুষের জীবনে ভীষন রকম পরিবর্তন আসে। শিশুর মত সে অবোধ আবার কান্ডজ্ঞানহীন যুবকের মত নির্বোধ আচরণ করতে শুরু করে। তাই বোধহয় আমরা ‘ভীমরতি’ বলতে সাধারনত অতি বার্ধক্যজনিত বুদ্ধিভ্রংশতা বুঝি । তবে এখানেই শেষ নয় ‘বুড়ো বয়সের ভীমরতি ’ শুনলে একটা কদার্থ আমাদের মনে জেগে ওঠে আর তা হল ‘ভীষন রকম রতি’ । রতি এখানে রাত নয় বরং রতিক্রিয়া বা যৌনক্রিয়া । সমাজ এটাকে পুরুষের স্বাভাবিক যৌন আচরণ বলে মেনে নিতে চায় না। তাই কটাক্ষ করে বলে ভীমরতি। যা কান্ডজ্ঞানহীন বার্ধক্যজনিত বুদ্ধিভ্রংশতার লক্ষণ।

সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলে যায় এমন আরো কয়েকটি প্রচলিত বিশ্বাস বা মিথ হল ”পুরুষত্বহীনতা বুড়িয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ।” যদিও বয়স্কদের মধ্যে লিঙ্গের উত্থানজনিত সমস্যা তুলনামুলকভাবে অল্পবয়স্কদের চেয়ে বেশী তবে সত্য হল এই যে এটা স্বাভাবিক এজিং প্রোসেসের অংশ নয়। এটা একটি মেডিকেল সমস্যা। বিশ থেকে নব্বই বছর বয়সের যেকোন পুরুষের এধরনের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে সমাজের এমন প্রচলিত বিশ্বাস কেমন প্রভাব ফেলবে তা অনুমেয় । ষাঠোর্দ্ধো এক লোক হয়ত বিবাহিত ছেলে মেয়ের বাবা স্ত্রীকে তেমন সমস্যার কথা বলে ডাক্তার দেখাতে চাইলে বুড়ো বয়সের ভীমরতি বলে বৃদ্ধা স্ত্রীর বকুনি খাবে না তেমন সম্ভাবনা কিন্তু ক্ষীণ।

আবার বুড়িয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ না ভেবে যারা ধারনা করেন হয়ত লিঙ্গের উত্থান জনিত সমস্যা শুধুমাত্র ব্দ্ধৃদের হয় তারা মুলত সমাজের ঐ প্রচলিত বিশ্বাসটাকেই লালন করেন যে ইরেকটাইল ডিসফাংশনে শুধুমাত্র বৃদ্ধরাই ভোগেন। কিন্তু বাস্তবতা হল ইরেকটাইল ডিসফাংশন বৃদ্ধদের মধ্যে বেশী দেখা গেলেও অল্প বয়সেও এই রোগ দেখা দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি মিথের কথা না বলে পারছি না । ভায়াগ্রা আবিস্কৃত হওয়ার পর থেকে এ বিশ্বাসটাও মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ‘ভায়াগ্রা’ যৌন রোগের মহা ঔষধ । মহা ঔষধ মানেই অব্যর্থ । কিন্তু দেখা গেছে ভায়াগ্রারও ব্যর্থতা আছে। সত্যি কথা বলতে কি এটা কোন যৌন উত্তেজক বা শক্তি বর্ধক ঔষধ নয়। এটা পুরুষাঙ্গের রক্ত নালির প্রশস্ততা বৃদ্ধি করে পুরুষাঙ্গে রক্ত সরবরাহ বাড়ায়। ফলে তা অনেক বেশী স্ফীত হয় এবং দৃঢ় হয়। ভায়াগ্রা ছাড়াও এরকম আরো অনেক ঔষধ আছে।

একটা সময় ছিল উন্নত বিশ্বে ভায়াগ্রা আসার পূর্বে মানুষ বিশ্বাস করত যৌন সমস্যা শুধু মানসিক কারনে হয়। সেকারনে সে সময় এক যুক্তরাজ্যেই চার হাজার সেক্স ক্লিনিক তৈরী হয়ে ছিল। কিন্ত সত্যি হল যৌন সমস্যার বা যৌন রোগের একমাত্র কারন মানসিক নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন মহলের প্রচার প্রচারনায় এমন একটি ধারনা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবং বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের বড় একটা অংশ এরকমই বিশ্বাস করে। ফলে এধরনের সমস্যা দেখা দিলে তারা সঠিক চিকিৎসা করানোর পরিবর্তে কাউনসিলিংয়ের জন্য হন্যে হয়ে ঘোরেন।

সম্প্রতি ইন্ডিয়ান কিছু চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের গবেষনায় দেখা গেছে যৌন বিষয়ে যাদের ধারণা কম তারা সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস সহজেই গ্রহন করে। তারা যৌন রোগেও বেশী ভুগছে। সে গবেষনায় আরো একটি বিষয় বেরিয়ে এসেছে। তা হল বর্তমানে শিক্ষর্থীরা যৌনবিষয়ে জ্ঞান অর্জন করছে পর্নোগ্রাফী থেকে। গবেষনাটিতে অংশগ্রহন করেছিল মুলত কলেজ শিক্ষার্থীরা । বাংলাদেশেও এধরনের একটি চিত্রই পাওয়া যাবে। গত পাঁচ বছরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগ কতৃক পরিচালিত সাইকিয়িিট্র সেক্স ক্লিনিকে রোগী দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি আমাদের দেশেও যৌন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের সহজ মাধ্যম বিভিন্ন পর্নোগ্রফী ওয়েব সাইট। মোবাইলে বা ট্যাবে খুব সহজেই এসব সাইটে ঢোকা যায় এবং ভিডিও ক্লিপ সংগ্রহ করা যায়।

কথা হচ্ছে ঐসব সাইটে যেসব ভিডিও আপলোড করা হয় তা দিয়ে কি স্বাস্থ্যসম্মত যৌন জ্ঞান লাভ করা যায়? নিঃসন্দেহে নয়। রোগীদের বোঝাতে আমি সহজ একটি যুক্তি দেই তাহল মুভি আর বাস্তবতা যেমন এক নয় তেমনি পর্নোগ্রাফীর যৌনতা আর বাস্তব জীবনের যৌনতা এক নয়।

চলবে…


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ডা. এস এম আতিকুর রহমান

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়