করোনার ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন করার আগে কাউন্সেলিং করতে হবে: অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী

কোয়ারেন্টাইন করার আগে কাউন্সেলিং করতে হবে: অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী

করোনাভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশে চলছে করোনো আতঙ্ক। রয়েছে নানাবিধ গুজব। প্রতিদিন দেশে ফিরছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা নিয়ে রয়েছে নানা বিভক্তি। যার ফলে মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্ট (বিএপি) এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী এর সাথে কথা বলেছেন মনের খবর প্রতিনিধি তাহসিন খুশবু-

মখ : করোনা নিয়ে আতংকে  মানসিক ও সামাজিক শংকা কতটা? অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী : মানসিক এবং সামাজিক শংকা দুটোই আছে। সত্যি কথা বলতে, করোনা নিয়ে আমাদের অনেকের ধারনা খুব সীমিত। করোনা  কিন্তু এমন নতুন কিছু নয়। করোনার মত ভাইরাস আগেও ছিল। সর্দি-জ্বর জাতীয় ভাইরাস। কিন্তু এর সংক্রমনটা মারাত্বক, ভ্যাকসিন নেই। সংক্রমন হলে শ্বাস-কষ্ট হয়, কিন্তু জিনিসটা যে একেবারেই নতুন তা নয়। এখন যেহেতু মিডিয়ার যুগ, মিডিয়ার কারণে জিনিসটা জানাজানি হচ্ছে দ্রুত, তাই মানুষের মনে আতঙ্ক হচ্ছে।তবে এটাও ঠিক যে, মিডিয়ার কারণে কিন্তু সচেতনতাও বাড়ছে। এই যে সচেতনতামূলক বিষয়গুলি আমরা জানছি, করোনা হলে কি করণীয় ইত্যাদি। এ বিষয়গুলি কিন্তু আমরা মিডিয়ার মাধ্যমেই জানতে পারছি। মিডিয়ার কারণে যেমনি অনেকে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ছে, তেমনি মিডিয়ার কারণেই কিন্তু আমরা ভালো ভালো খবর পেয়ে  সতর্ক হতে পারছি। তবে এর পেছনে ব্যক্তিগত যে ব্যাপারটা, অনেকে এই আতঙ্ক থেকে ডিপ্রেশনে ভুগছে, অনেকেই অফিস আদালত নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ভুগছে, যেতে পারছে না, ঘর থেকে বের হতে পারছে না, যতটুকু দুঃশ্চিন্তা করা উচিত তার থেকে বেশি করে ফেলছে। এছাড়া সামাজিক সমস্যা তো আছেই। যেমন: অনেকে বলছে অমুকের বাড়ি যাবো না, অমুকের সথে কথা বলবো না। যদিও আমাদেরকে বলা হচ্ছে এক ধরনের সোশ্যাল আইসোলেশন এর দরকার আছে, কিন্তু মানুষ বেশি করে ফেলছে।  অনেককেই দেখা যাবে, কোনো করোনা রোগীর সম্পর্কে জানলে বা তার সাথে দেখা হলে তাকে খারাপ কথা বলে ফেলতে পারে বা তাকে অপদস্ত করে ফেলতে পারে। অনেকের এই ধারণা নেই যে, এরকম করা উচিত নয়। সুতরাং এটা ব্যক্তিগত জীবনে যেমন সমস্যার কারণ হচ্ছে, সমাজিক জীবনেও হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে সেভাবে প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন।

মখ : কাউকে কোয়ারেন্টাইন করা হলে, সে হয়তো একটা গ্রুপে আলাদা থাকবে, তাকে একটা নির্দিষ্ট স্থানে বন্দী করে রাখা হবে। সেই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মেনে নেয়ার মত মানসিক শক্তি সবার নাও থাকতে পারে। এক্ষেত্রে করণীয় কি? অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী : এটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। কোয়ারেন্টাইন বিষয়টি আগেও ছিল। আগে এরকম সংক্রামক রোগের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল, এখন তা তুলনামূলক কম।  তখনও কোয়ারেন্টাইন করা হত।পুরো ব্যবস্থাপনার একটি অংশ ছিল কোয়ারেন্টাইন করা। কোয়ারেন্টাইন এর কিন্তু একটি উদ্দেশ্য আছে। কোনো একজন মানুষ হয়তো উপদ্রব এলাকা থেকে এলো। সে হয়তো সেখান থেকে আক্রান্ত হয়ে এসেছে। কোয়ারেন্টাইন করার উদ্দেশ্য হলো- যখন কোনো জীবানু একজন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সেটার লক্ষণ কবে  প্রকাশ পাবে অসুখ হিসেবে তার জন্য একেক রকম সময় থাকে। যেমন: করোনা ভাইরাস এর ক্ষেত্রে কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন। কোয়ারেন্টাইন এর উদ্দেশ্য হল যে সময়টিতে এই রোগটি প্রকাশ পাবে সেই সময়টিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আটকে রাখা। তাহলে বুঝতে পারা যাবে যে তার মধ্যে রোগের সংক্রমণ আছে কিনা। এখন দেখা যাচ্ছে, কোয়ারেন্টাইন না করে ছেড়ে দেওয়া হল। দেখা গেলো, ব্যক্তিটি প্রথমদিকে বেশ ভালোই আছেন, কোনো সমস্যা নেই। কিছুদিন পর তার মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা দিল। তখন কিন্তু তার মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় করোনার ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে। এটাকে বলা হয় ইনক্লুশন পিরিয়িড। অর্থাৎ শরীরে জীবানু প্রবেশ করা থেকে শুরু করে অসুখের উপসর্গ দেখা দেওয়া পর্যন্ত সময়টুকু। এক্ষেত্রে যাকে কোয়ারেন্টাইন করা হবে তার মানসিক শক্তি না থাকাটাই স্বাভাবিক। তাকে কোয়ারেন্টাইন করার আগে কাউন্সেলিং করতে হবে। কোয়ারেন্টাইন পিরিয়ডেও তাকে আশ্বস্ত করতে হবে, তাকে বোঝাতে হবে। কারণ, কোয়ারেন্টাইন এর অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে কারো তেমন নেই। তাই কোয়ারেন্টাইন এর আগে ও কোয়ারেন্টাইন এর সময় অবশ্যই তাকে ব্যাপারটা বোঝাতে হবে যে- তার নিজের, তার পরিবারের ও সমাজের সবার ভালোর জন্যই কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে। এতে তার কোনো ক্ষতি হবে না বা তাকে কষ্ট দেওয়া হবে না। এই বিষয়টি খুবই জরুরী। কারণ কোয়ারেন্টাইন বিষয়টি আমাদের দেশের মানুষের কাছে একেবারেই নতুন, তাই এক্ষেত্রে কাউন্সেলিং এরে বিকল্প নেই।

মখ : বিদেশ থেকে কেউ আসলে অনেক জায়গায় তাকে এবং তার পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে পরিবার থেকেও বিদেশ ফেরতকে ভালো চোখে দেখা হচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি বা তার পরিবারের উপর কি ধরনের মানসিক প্রভাব পড়তে পারে? এক্ষেত্রে করণীয় কি? অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী : অনেকেই না বুঝে রোগীর সাথে বা রোগীর পরিবারের সাথে খারাপ আচরণ করে থাকে।কেউ যদি বিদেশ থেকে এসে থাকে তবে এটা তার দোষ নয় যে সে অসুস্থ হয়ে এসেছে। কেউ তো নিজের ইচ্ছায় অসুস্থ হয় না। ঘটনাক্রমে সে ঐ পরিবেশে বা স্থানে ছিল, তারপর হয়তো সে আক্রান্ত হয়েছে। আবার আক্রান্ত দেশ থেকে আসলেও কেউ আক্রান্ত নাও হতে পারে। তাই শুধুমাত্র অনুমান নির্ভর হয়ে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা বা তার সাথে খারাপ আচরণ করা বা তাকে আলাদা করে ফেলা,এগুলো একেবারেই ঠিক নয়। এক্ষেত্রে সবাইকে বুঝিয়ে বলা উচিত। এবং বিদেশ ফেরত সকলেরই মেডিক্যাল টেস্ট বাধ্যতা মূলক রাখতে হবে। টেস্টে যদি রেজাল্ট পজেটিভ আসে, তাহলে অন্য রোগীদের মত চিকিৎসা করাতে হবে। এক্ষেত্রে মানুষকে জানাতে হবে যে, করোনা মানেই মৃত্যু অবধারিত নয়। করোনায় মৃত্যর হার এখন পর্যন্ত (২-৫%) এবং বেশিরভাগ রোগীই সুস্থ হয়ে যায়। সুতরাং যদি কারো করোনা ভাইরাস পজেটিভ পাওয়া যায়, তাহলে তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা দিলে ভালো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। রোগীরও নয়- বা যারা অকারণে অহেতুক আতঙ্কিত হচ্ছে এবং রোগী বা রোগীর আত্মীয় স্বজনকে যারা হেনস্তা করছে বা যারা তাদের অবহেলা করছে এটা একেবারেই ঠিক নয়।