এখন খেলোয়াড়দের ফিডব্যাক অনেক বেশি: নাসির আহমেদ নাসু

নিজ দল কিংবা প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের দূর্বলতা বা শক্তিমত্তার দিকগুলো খোঁজাই তাঁর বর্তমান কাজ। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক উইকেট রক্ষক। বর্তমানে কাজ করছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের পারফর্ম্যান্স অ্যানালিস্ট হিসেবে। তিনি নাসির আহমেদ নাসু। মনেরকখবর পাঠকদের মুখোমুখি এবার তিনি জানাচ্ছেন তাঁর মনের কথা, তাঁর শক্তি অথবা দূর্বলতার কথা, কাজের কথা, ভাবনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ মামুন।   মখ : কেমন আছেন? নাসির আহমেদ নাসু : ভালো আছি। মখ : ভালো থাকতে কী করেন? নাসির আহমেদ নাসু : ভালো থাকতে কাজ করি অথবা কাজ করলেই ভালো থাকি।
এখন খেলোয়াড়দের ফিডব্যাক বেশি। মূল কোচের পাশাপাশি বোলিং কোচ, ফিল্ডিং কোচ যেমন আছে তেমনি যদি কোন খেলোয়াড় মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয় তার জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছে। এছাড়া খেলোয়াড়দের মানসিক পরিস্থিতি কি এসব জানার জন্য সাইকিয়াট্রিস্ট কিছু প্রশ্ন দেয় তারপর সেখানকার উত্তরের উপর ভিত্তি করে কোচকে তিনি পরামর্শ দেন কোন খেলোয়াড়কে কীভাবে দেখাশোনা কতে হবে।
মখ : আপনার কাজের ধরণটা বলবেন কি? নাসির আহমেদ নাসু : আমার কাজটা পুরোপুরি নিয়ম নির্ভর নয়। একেক সময় একেক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। মখ : যেমন? নাসির আহমেদ নাসু : সাধারণত যখন আমরা একটা টিমের সাথে খেলি তখন এক ধরণের এনালাইজিং করতে হয়। আবার যখন নিজেদের খেলোয়াড়দের উপর এনালাইজ করা হয় তখন আরেক ধরণের কাজ করতে হয়। আবার সার্বিকভাবে যখন দেখি তখন সেটা আলাদাভাবে এনালাইজিং করতে হয়। কখনও দেখা যায় একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় কোনদিকে ভালো খেলছে বা কোনদিকে খারাপ খেলছে। কখনও দলীয় পারফরম্যান্স দেখা হয়। ইত্যাদি অনেক অনেক। আসলে এর পরিধি এত ব্যাপক যে স্বল্প পরিসরে পুরোপুরি এর বর্ণনা দেয়া কঠিন। মখ : অর্থাৎ আমরা বলতে পারি এতে বিশেষ কোন ব্যাকরণ নেই? নাসির আহমেদ নাসু : ব্যাকরণ পুরোপুরি যে তাও নয়, আবার আছে যে সেটাও নয়। এটা মূলত কোচের চাহিদার উপর নির্ভর করে। কোচ হয়তো কোন খেলোয়াড়ের পাঁচ বছর আগের খেলার পরিস্থিতি জানতে চাইতে পারে। অথবা জানতে চাইতে পারে ইউরোপিয়ান কনডিশনে কোন এক খেলোয়াড় কেমন খেলেছে। অথবা হতে পারে কোন দলের বিরুদ্ধে বা কোন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে কার পারফরম্যান্স কেমন। অথবা হতে পারে প্রতিপক্ষ দলের কোন খেলোয়াড় কোন ধরণের বলের বিরুদ্ধে ভালো খেলে বা খারাপ খেলে ইত্যাদি ইত্যাদি। মখ : এগুলোর উপর ভিত্তি করে খেলা বা খেলোয়াড়ের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত হয়? নাসির আহমেদ নাসু : অনেকটা। একই সাথে যদি দেখা যায় নিজেদের কোন খেলোয়াড়ের সমস্যা হচ্ছে তখন সে সমস্যার কারণ বের করা হয়। প্রশিক্ষণগত ত্রুটি থাকলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, শারীরিক সমস্যা থাকলে ফিজিক্যাল ডাক্তার অথবা মানসিক কোন সমস্যা থাকলে দলের সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠানো হয়। মখ : বাংলাদেশ ক্রিকেটে মেন্টাল স্কিল ডেভলপমেন্টকে কতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়? নাসির আহমেদ নাসু : এখন খেলোয়াড়দের ফিডব্যাক বেশি। মূল কোচের পাশাপাশি বোলিং কোচ, ফিল্ডিং কোচ যেমন আছে তেমনি যদি কোন খেলোয়াড় মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয় তার জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছে। এছাড়া খেলোয়াড়দের মানসিক পরিস্থিতি কি এসব জানার জন্য সাইকিয়াট্রিস্ট কিছু প্রশ্ন দেয় তারপর সেখানকার উত্তরের উপর ভিত্তি করে কোচকে তিনি পরামর্শ দেন কোন খেলোয়াড়কে কীভাবে দেখাশোনা কতে হবে। মখ : ভারত কিংবা অষ্ট্রেলিয়া দলের মতো এখানেও কি এটা নিয়মিত করা হয়? নাসির আহমেদ নাসু : না, তাদের টিমে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট যেমন সব সময় থাকে বা একজন কোচ বা ফিজিওর মতো সাইকিয়াট্রিস্টও দলের একটা অংশ, সেভাবে আমরা সেটা সব সময় করি না। তবে আমাদের দলেও এর ব্যবহার মোটামুটি ভালোই রয়েছে। মখ : ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। ক্রিকেটে আসলেন কীভাবে? নাসির আহমেদ নাসু : আমরা পাঁচ ভাই, আমাদের এই পাঁচ ভাইয়ের সবাই ক্রিকেট খেলতো। আমার বড়ভাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দলে খেলতেন। ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট দেখতে দেখতে বা খেলতে খেলতেই আমার বড় হওয়া। মখ : উইকেট রক্ষক হওয়ার অনুপ্রেরণা পেলেন কোথায়? নাসির আহমেদ নাসু : এমন একটা কথা প্রচলিত আছে যে, উইকেট কিপার তৈরি হয় না, উইকেট কিপার জন্মলাভ করে। আমার এক বড়ভাই উইকেট কীপার ছিলেন, তাঁর দেখাদেখি আমিও একটু আধটু উইকেট কিপিং করতাম। তবে দলে যখন খেলতাম তখন আমি উইকেট কিপিং করতাম না। সেকেন্ড ডিভিশনে খেলার সময় একদিন আমাদের দলের উইকেট কিপার আহত হলেন। টিমের এক বড়ভাই বললেন তোমার ভাই তো উইকেট কিপিং করে দেখোতো তুমি পারো কিনা। তখন অনেকটা বাধ্য হয়ে আমাকে কিপিং করতে হলো। সেই যে কিপিং শুরু করলাম পরে দেখা গেলো আমিই মূল উকেট কিপার হয়ে গেলাম। মখ : দলে একজন উইকেট রক্ষকের গুরুত্ব কতটুকু? নাসির আহমেদ নাসু : উইকেট রক্ষককে একটা দলের নিউক্লিয়াস বলা হয়। একজন উইকেট কিপার পুরো দলের সকল খেলোয়াড়ের খুব কাছের লোক হয়। কারণ একজন উইকেট কিপার উইকেটের পেছনে থেকে পুরো খেলাটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। যেহেতু পুরো খেলায় অন্যরা এক আধটু রিলাক্স থাকলেও প্রতিটা মুহুর্ত একজন উইকেট রক্ষককে প্রচন্ড মনোযোগী থাকতে হয়, তাই তার দায়িত্বের বাইরেও খেলার অনেককিছু তার চোখে ধরা পড়ে।
ছবিঃ
মখ : খেলায় মনোযোগ ধরে রাখতে কোন জিনিষটি বেশি প্রয়োজন? নাসির আহমেদ নাসু : মনোযোগটা সম্পুর্ণ খেলার মাঝে রাখা এবং আমাকে আরো ভালো করতে হবে এমন একটা মানসিকতা রাখা। মখ : একজন সফল খেলোয়াড় হওয়ার পেছনে আপনার মোটিভেশন কি ছিলো? নাসির আহমেদ নাসু : ঐযে বললাম মনোযোগটা খেলার মাঝে ধরে রাখা। তাছাড়া আমি যখন জাতীয় দলের উইকেট রক্ষক ছিলাম তখন একটা ভাবনা রাখতাম যে আমি দেশের সেরা উইকেট রক্ষক সুতরাং আমাকে বিশেষ কিছু করে দেখাতে হবে। মখ : আপনার সময়ের ক্রিকেটের সাথে এখনকার ক্রিকেটের পার্থক্য কতটুকু? নাসির আহমেদ নাসু : এখনকার সময়ের সাথে যদি তুলনা করি তাহলে বলতে হয় আমাদের সময় কিছুই ছিলো না! এখন একজন খেলোয়াড় প্রতি মূহুর্তে ফিডব্যাক পাচ্ছে, তার নিজের খেলা নিজে দেখতে পাচ্ছে, আলাদা আলাদা ট্রেনিং বা ট্রেইনার আছে। আমাদের সময় যেটা ছিলো সেটা হলো কোচই ছিলো সব। কিন্তু এই সময়ে এসে বুঝতে পারি একজন কোচের পক্ষে আসলে সবকিছু দেখাটা সম্ভব হয়ে উঠে না। মখ : ক্রিকেটার না হলে কি হতেন? নাসির আহমেদ নাসু : আমার পক্ষে এটা বলা মুশকিল। প্রথমত ক্রিকেট পরিবারে বড় হয়েছি আর দ্বিতীয়ত কলেজে পড়ার সময় থেকেই পেশাদার ক্রিকেটের সাথে জড়িত। সেজন্য অন্য কিছু হওয়ার সুযোগ বা অবসর হয়ে উঠেনি। মখ : একন ক্রিকেটার ও পারফর্ম্যান্স অ্যানালিস্ট হিসেবে আপনার দেখা সেরা খেলোয়াড় কে? নাসির আহমেদ নাসু : শচীন টেন্ডুলকার। মখ : উইকেট রক্ষক হিসেবে? নাসির আহমেদ নাসু : অ্যাডাম গিলক্রিষ্ট। মখ : অবসরে কি করেন? নাসির আহমেদ নাসু : আমার কাজের প্রক্রিয়াটি একটু জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বিশেষ করে যখন আপনাকে নিয়ে আমার গবেষণ করতে হবে তখন প্রতিনিয়ত আপনাকে দেখা ও আপনার পারফর্ম্যান্সের চিন্তা আমার মাথায় রাখতে হবে এবং যখন যেটা প্রয়োজন সেটা বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমার অবসর প্রায় নেই বললেই চলে। এরপর যতটুকু সময় ফ্রি থাকি ততটুকু সময় চেষ্টা করি পরিবারের সাথে থাকতে।  মখ : খেলোয়াড়ী জীবনের একটি মজার স্মৃতি বলুন। নাসির আহমেদ নাসু : অনেক মজার স্মৃতি রয়েছে। একটু আগে এক স্মৃতি মনে করে নিজেই হাসলাম। একবার গাছের সাথে বল বেঁধে প্র্যাক্টিস করছি এমন সময় এক বড়ভাই যিনি ছিলেন ফাস্ট বোলার তিনি এসে বললেন, এই কি করস! দাঁড়া তোরে আমি কিছু ভালো শট শিখাই। এই বলে তিনি জোরে ব্যাট চালালেন। বল গাছের আরেক ঢালে বেঁধে গেলো। তিনি দুঃখ করে বললেন, তোরে কিছু ভালো শট শেখাতে চাইলাম কিন্তু এই ফালতু গাছটার জন্যে শিখাইতে পারলাম না। মখ : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে মনেরখবর পাঠকদের সময় দেয়ার জন্য? নাসির আহমেদ নাসু : ধন্যবাদ মনেরখবর পাঠকদেরও।