মূল পাতা / তারকার মন / শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাক-ডা. নায়লা জামান খান
Dr Laila

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাক-ডা. নায়লা জামান খান

দেশের ১৫ টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালে “শিশু বিকাশ কেন্দ্র” থেকে প্রতিদিন নিউরো ডেভেলপমেন্ট সমস্যাজনিত বিষয়ে সেবা নিচ্ছে অসংখ্য শিশু।  বাংলাদেশে শিশুদের নিউরো ডেভেলপমেন্ট রেনেসাঁর প্রচারবিমুখ অগ্রপথিক ও “শিশু বিকাশ কেন্দ্র” ধারণার প্রবক্তা প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান কথা বলেছেন মনের খবর ম্যাগাজিনের সাথে। পাঠকদের জন্য তারকার মন-বিভাগে সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে ধরা হল।

মখ : কেমন আছেন? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : ভালো আছি। আমি সমবসময় ভালো থাকি। মখ : শিশু বিকাশ কেন্দ্র শুরুর ভাবনা সম্পর্কে কিছু বলুন প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : আমি ১৯৯১ সালে লন্ডন থেকে পড়ালেখা শেষ করে দেশে আসি। সেখানে আমি দেখে এসেছি- সেদেশে তিনি চারজন প্রফেশনাল নিয়ে কাজ করে। এখানে এসে আমার পুরোনো কর্মস্থল শিশু হাসপাতালে যোগদান করে দেখি আমি ছাড়া আর কোন স্পেশালিষ্ট নেই, তখন আমি একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্ট নিয়োগ করাই। তখন অটিজম শব্দটা এদেশে অচেনা, সিজোফ্রোনিয়া সম্পর্কে নেই কোনো ধারনা। সাধারন মানুষ তো দূরের কথা, মেডিকেল কমিউনিটিতেও তখন মানসিক রোগের ব্যাপারে ততটা সচেতনতা ছিল না। তাই চাইল্ড সাইকোলজিস্ট  নিয়োগ করাতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল। আমি সবাইকে বুঝিয়েছিলাম, একটি বাচ্চার যখন বিকাশ হয় তখন তার ফিজিক্যাল বিকাশ হয়, ইমোশনাল বিকাশ হয় সাথে বুদ্ধিগত বিকাশ হয়। আপনি যদি শিশুর বুদ্ধিগত বিকাশে সঠিকভাবে সাহায্য করতে চান তাহলে একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্ট লাগবে। এরপর দেখলাম-অনেক বাচ্চারা থেরাপীর জন্য আসছে। কারো শারীরিক সমস্যা, কেউ চোখে দেখতে কেউ হয়তো কথা বলতে পারে না, কেউ হয়তো কানে শোনে না, কারো হয়তো ভাষাগত সমস্যা, কারো হয়তো খিঁচুনি আছে। এরকম বহু ধরনের নিউরোলোজিক্যাল ডিজঅর্ডার নিয়ে অনেকে আসতো। কিন্তু এসবের জন্য আলাদা আলাদা থেরাপিস্ট যেমন: অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, ফিজিও থেরাপিস্ট, স্পীচ থেরাপিস্ট দরকার হয়। আমি তখন খুজেঁ খুঁজে হোম ইকোনোমিক্সে পোস্ট গ্রাজুয়েটদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ডেভলপমেন্ট থেরাপিস্ট নামে একটি টিম করলাম। পরবর্তী সময়ে সেবাগ্রহীতাদের চাহিদা দেখে আমি ঢাকার আরো কয়েকটি হাসপাতালে এই সেবা চালু করলাম। পরে ২০০৩ সালে একটি জরীপ পরিচালনা করে দেখলাম হতদরিদ্ররা এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তখন এটাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিতে সরকারকে প্রস্তাব দিলাম। ২০০৮ সালে সরকার সেটার অনুমতি দিল।   মখ : শিশু বিকাশ কেন্দ্র বর্তমানে কি অবস্থায় আছে? সরকারের সহযোগিতায় এটি এখন ১৫ টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলছে। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালেও শিশু বিকাশ কেন্দ্র চলছে। সরকারি হাসপাতলগুলোর কেন্দ্রগুলো এবছরই রাজস্বভুক্ত হচ্ছে। মখ : শিশু বিকাশ কেন্দ্র নিয়ে এখন কি ভাবছেন? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : শিশু বিকাশ কেন্দ্র এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে এটা শুধু হাসপাতাল কেন্দ্রিক। হাসপাতালে মানুষের আসতে হয়। আমি চাই এই সেবা কমিউনিটিতে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক। যেভাবে প্রাইমারী হেলথ কেয়ার বা ইপিআই কার্যক্রম চলছে। এবিষয়ে আমাদের কিছু সিম্পল টুলস আছে। আমাদের কাছ থেকে সেটা নিয়ে ভুটান কাজ করছে। আমাদের সরকার চাইলে এটা নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। মখ : আপনার কখনও মন খারাপ হয়? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : নিশ্চয়ই হয়। আমি তো মানুষ, প্রত্যেক মানুষেরই মন খারাপ হয়। মখ : মন খারাপ হলে কি করেন? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : মন খারাপ হলে নিজে নিজে চিন্তা করি। মন খারাপের কারণটা বোঝার চেষ্টা করি। যেহেতু আমি নিজেও চিকিৎসক, তাই বিষয়টি আমার জন্য সহজ হয়। তারপর আমি বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গীর সাথে, আমার বন্ধুদের সাথে কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে শেয়ার করি। এমনকি আমার সহকর্মীদের সাথে আমি শেয়ার করি। মখ : মন ভালো রাখার জন্য আমাদের কি করা উচিত? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : যেকোন মানুষের জন্য মনটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকেরই নিজের মন ভালো রাখার জন্য ভাবা উচিত। প্রতিদিনই নিজের জন্য একটু করে সময় বের করে নেওয়া উচিত। সেটা হতে পারে বন্ধুদের সাথে আড্ডা কিংবা পার্কে হাঁটা। মখ : রাগ হয়? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : হুম, হয়। নিজের মধ্যে রাগ করি, অন্যের সাথে করি। তখন অনেক ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু রাগ আসলে কোন সমাধান নয়। মখ : তখন কি করেন? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : তখন আসলে ইতিবাচক চিন্তা করার চেষ্টা করি। আজকাল যেহেতু বয়স হয়েছে তাই রাগের অনেক বিষয় আমি ছেড়ে দিই, ওটাকে মাথায় রাখতে চাই না। তখন আমার চাহিদাগুলো নিয়ে ভাবি, কোনটাকে আমার প্রাধান্য দেওয়া উচিত, সেটা নিয়ে ভাবি। কোন জিনিসটা আমার করা দরকার সেটা চিন্তা করি। রাগের বিষয়টি এড়িয়ে যাবার জন্য কখনো গান শুনি, আমার নাতনীদের সাথে সময় কাটায়। ওদের সাথে খেলা করি, গল্প করি, ছড়া বলি। বন্ধুদের সাথে প্রাণখুলে হাসি। এটাইতো জীবন। মখ : কখনও মনে হয়েছে যে বিষণ্ণতায় ভুগছেন বা মানসিকভাবে অসুস্থ আছেন? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : মানসিক ভাবে অসুস্থ খুব বড় একটা টার্ম। মানসিক ভাবে অসুস্থ হওয়া বলতে আমি মনে করি কেউ যদি ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আমার ওরকমটা কখনও হয়নি। আমি প্রচন্ড পরিমানে ইতিবাচক মানুষ। তবে জীবনে অনেক ঘাত প্রতিঘাত এসেছে। সেগুলোকে জয় করে এসেছি। আমি মনে করি প্রত্যেকটি মানুষেরই জন্ম কোন না কোন একটা বিশেষ কারনে। আমি আমার নিজের মত করে কিছু তো করতে পেরেছি। বাকীটা না হয় নাই পারলাম। মখ : স্মৃতিকাতরতা আছে আপনার? প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : স্মৃতিকাতরতা নেই। তবে ১৯৭১ আমোর কাছে বিশাল একটা আঘাতের ব্যাপার। আমি অনেক কিছু দেখেছি, তখন আমার আঠারো বছর বয়স ছিল। যেগুলো আমি এখানে বলতে চাই না। ওগুলো বলতে গেলে আমি অনেক বেশি ইমোশনাল হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে আমি আমার অনেক আপনজনদের হারিয়েছি। এটা আমার কাছে বড় একটি ব্যাথা। দেশের জন্য অনেককে প্রাণ দিতে দেখেছি। সেটাকেও আমি এখন এভাবে ইতিবাচকভাবে দেখি যে আমি এখনও মুক্তিযুদ্ধ করছি। আমি যাদেরকে প্রাণ হারাতে দেখেছি, আমি নিজেকে তাদেরই একজন মনে করি। কাজেই আমার মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। আমি আমার দেশের জন্য, দশের জন্য করেই যাবো। আর যুদ্ধে তো ঘাত প্রতিঘাত থাকবেই। মখ : ব্যস্ততার মধ্যেও সময় দেওয়ার জন্য মনের খবর এর পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রফেসর ডা. নায়লা জামান খান : মনের খবরকেও ধন্যবাদ।