মনের খেয়াল রাখতে ইচ্ছে করে খুব-অদিতি বসু রায় 1

মনের খেয়াল রাখতে ইচ্ছে করে খুব-অদিতি বসু রায়

ব্যাকরণ মানি না (২০০৯) দিয়ে শুরু। একে একে  তাঁর কলম বেয়ে এসেছে একশো সাতান্ন রকম মিথ্যে(২০১২), সব চিঠি প্রকাশিত (২০১৬), পালটাচ্ছে ইউজারনেম (২০১৮), পরশুদিনের কাগজ(২০১৮), সারে তিনটের উরোজাহাজ(২০১৯)। গতানুগতিক ব্যাকরণ-এর বাইরে চলেছে অদিতি-এর নিজের জীবনের পথও; তিনি অদিতি বসু রায়, বাংলার সাহিত্য আকাশে আজ উজ্জল এক নাম। চলার পথে বাধা এসেছে অনেক এসেছে বিচ্ছেদ, ভেঙেছে বিশ্বাস, তবে অদিতি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন,প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন আজকের অদিতি বসু রায় হিসাবে। স্বীকতি -ও এসেছে ধীরে ধীরে, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশ থেকে পেয়েছেন বিভিন্ন সাহিত্য পুরষ্কারI মনের খবর “তারকার মন” ‍বিভাগে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল এই নক্ষত্রের সাথে কথা বলেছেন ভারতের ভুবেনেশ্বর অলইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স এর মনোচিকিৎসক ডা. তনয় মাইতি।

মখ : নমস্কার অদিতি, কেমন আছেন? অদিতি বসু রায় : ভালো আছি।

মখ : সরাসরিই  জিজ্ঞ্যেস করছি, এই কেমন আছেন প্রশ্নের উত্তরে  কতবার মেকি হাসতে হয়েছে? বা পুরো সত্যিটা বলতে পারেন নি? অদিতি বসু রায় : প্রায় কখনোই পুরো সত্যিটা বলতে পারিনি। অভ্যাস করে ফেলতে হয়েছে ভাল আছি বলা। এর দুটো কারণ আছে – খারাপ আছি বললে আবার পুরো ব্যাপারটাকে আলাদা করে এক্সপ্লেন করে দিতে হয়। তাছাড়া খারাপ যে আছি – সে কথা জানাতেও ইচ্ছে করে না সব সময়।

মখ : মন বা জীবন এর সংজ্ঞা আপনি কিভাবে দিতে চাইবেন? অদিতি বসু রায় : জীবন মানে এমন কিছু করা যাতে মনে হয়, আমার নিজের একটা সিগনেচার রাখা হল।যাতে বেঁচে থাকাটা অর্থপূর্ণ হতে পারে এমন কিছু। কাজ না করতে পারলে বেঁচে থাকাটা খুব একঘেয়ে হয়ে যায় আমার কাছে। সে যে কাজই হোক না কেন! আমি শুধু দেখি, কাজটা করে আমার আনন্দ হয় যেন। বেড়াতে যেতে, সিনেমা দেখতে, লিখতে – সব কিছু করতেই আমার দারুণ ভাল লাগে। এইগুলোও তো কাজই। জীবনকে উদযাপন করা সবসময়ে সম্ভব নয় –কিন্তু নিজেকে ভাল রাখার উপায় খুঁজে নিতেই । তা না হলে, বাঁচাই মুশকিল।

মখ : আপনার লেখায় আপনার জীবনের প্রভাব কতটা পড়েছে? এবং কিভাবে? অদিতি বসু রায় : আমার লেখাই আসলে আমি। আমার জীবনযাপন, আমার অভিজ্ঞতা, আমার চাওয়া, না-পাওয়া সব নিয়েই আমার লেখা। যা যা আমার বলার থাকে, সবটাই লেখার মধ্যে দিয়ে বলে ফেলার চেষ্টা করি। তাছাড়া এক ধরনের ‘ক্যাথারসিস’ বা মোক্ষণ হয় লেখার মাধ্যমে। খুব রাগ বা আনন্দ বা দুঃখ লিখতে বসলে একটা আউটলেট পেয়ে যায় বেরিয়ে যাওয়ার। লেখার সামনে নিজেকে লুকিয়ে রাখা যায় না।

মখ : আপনার বেশির ভাগ লেখায় যে জন্ত্রণা বিচ্ছেদ বিষণ্ণতা বার বার উঠে এসেছে সেই নিয়ে যদি কিছু বলেন… অদিতি বসু রায় : আমি আসলে খুব নেগেটিভ মনের মানুষ। চট করে কোনকিছুরই পজেটিভ দিকটা চোখে পড়ে না। আবার এক্সপেকটেশন বেশি বলে কষ্ট হয় বেশি। এসব আমার মুদ্রাদোষ। অনেক কিছুই শেখা হয় নি। তাছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুখ বন্ধ রাখলেও চলে। আমি সেটা একেবারেই পারি না। মনে করি, আলোচনার মধ্যে দিয়ে সবকিছুরই সমাধান সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না সবসময়ে। বরং কথা বলার ক্ষেত্রে অপর পক্ষ মেজাজ হারাতে পারে এবং আমিও পারি। তার জন্য মূল ব্যাপারটা পিছিয়ে যায়। আমার চট করে মাথা গরম করে ফেলারও একটা প্রবণতা আছে। অনেক সমস্যা এর থেকেও জন্ম নেয়। রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হবে যে করেই হোক। আমি একেবারেই পেরে উঠছি না এই ব্যাপারটা।

মখ : জীবনে সব থেকে বেশি কষ্ট আর সব থেকে বেশি আনন্দ কিসে পেয়েছেন আজ অব্দি? অদিতি বসু রায় :  সব থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছি প্রথম বিয়েটা ভেঙ্গে যাওয়ায়! দীর্ঘদিনের একটা সম্পর্ক থেকে হঠায় বেরিয়ে আসাটা খুব কঠিন। তাছাড়া আমরা পরস্পরের খুব বন্ধু ছিলাম বলেই আমি মনে করতাম। যদিও পরে দেখা গেছে, এটা কেবল আমার নিজেরই ধারণা ছিল। তবু খুব কঠিন ছিল এই সময়টা। আর সেরা আনন্দ আমার মেয়ের জন্ম। সে যে কীরকম আনন্দ বোঝানো যাবে না।

মখ : ভালোবেসেছেন কাকে সব থেকে বেশি? অদিতি বসু রায় : আমার মেয়ে পদ্যর থেকে কাউকে বেশি ভালবাসতে পারি নি। মাকে ছাড়া আমি জীবনকে কল্পনাও করতে পারি না। তবে মেয়ের ব্যাপারটা একেবারে আলাদা! ও আমার নিজেরই অংশ!

মখ : মনের খেয়াল আলাদা করে রাখেন আপনি অদিতি? কিভাবে? অদিতি বসু রায় : মনের খেয়াল রাখতে ইচ্ছে করে খুব। মাঝে মাঝে বেড়িয়ে পড়ি। ঘুরে বেড়াই কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়। গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসি। বন্ধুদের ডাকি। কফি খেতে যাই। পড়ি। অনেকপড়ি। রান্না করি। বিষণ্ণতা কাটানো খুব খুব কঠিন একটা প্রসেস। সিনেমা দেখার মধ্য দিয়ে দ্রুত ভিস্যুয়াল আট্যাচমেন্ট তৈরি হয় ফলে মনখারাপ কমে যায়। এক্সারসাইজও খুব কাজে লাগে। ফিজিক্যাল আক্টিভিটি মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত এক্সারসাইজ করা খুব দরকার।

মখ : কখনো নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়েছে আপনার? কেন,  সেটা বলবেন কিনা আপনার উপর, তবে কিভাবে সামলেছেন তা? অদিতি বসু রায় : বহুবার শেষ হয়ে যেতে ইচ্ছে করেছে। বিশ্বাসঘাতকতা, লজ্জা, রাগে চলে যেতে ইচ্ছে করেছে দুনিয়া ছেড়ে। সামলালাম কি করে জানি না। সেই মুহুর্তে হয়তো কেউ ফোন করে লেখার প্রশংসা করেছে বা আমি নিজে কোনো বন্ধুকে ফোন করে কথা বলেছি – চিৎকার করে কেঁদেছি – শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়তে পেরে বেঁচে গেছি। ঘুম খুব জরুরি। এখনো রাগ হলে মনে হয়, পালিয়ে যাই সিচুয়েশন থেকে।

মখ : কতটা কষ্টকর ছিলো সেই অভিজ্ঞতা? অদিতি বসু রায় : খুব খারাপ অভিজ্ঞতা। খুব। সে যেন একটা বদ্ধ জানলা-দরজাবিহীন ঘরে আটকে থাকা। কেউ বুঝতে পারছে না – কি বলতে চাইছি – আমিও বোঝাতে পারছি না। সে এক দমবন্ধকরা অবস্থা। মনে হয় – এই বুঝি শেষ ! নিঃশ্বাস রোধ হয়ে আসার অভিজ্ঞতা হয় একেবারে। ভাবতে গেলেও আতঙ্ক হয়।

মখ : প্রেমে পড়েন এখনো? সেই প্রেম ‘সামলান’ কি করে? আপনার প্রেম, আর আপনার প্রতি প্রেম দুটোই… অদিতি বসু রায় :  নাহ! বহুকাল নতুন করে প্রেমে পড়ি না। আমার প্রতি প্রেম যাদের – তারা বেশিরভাগই আমার বন্ধু। তাদের ওই নিয়ে কিছু বলি না। তবে চেনা বা সামান্য চেনা কেউ প্রেমে পড়েছে আমার জানতে পারলে, নিজেকে পুরোপুরি উইথড্র করে নি সেখান থেকে।

মখ : ষাট বছর বয়সে গিয়ে নিজেকে কিভাবে আর কোথায় দেখতে চান? অদিতি বসু রায় :  ষাট বছর বয়েসে নিজেকে আক্টিভ আর ফিট দেখতে চাই। কিছুতেই মনে রাখতে চাই না যে আমার বয়স ষাট।

মখ : ভবিষ্যতের পৃথিবী আর ভবিষ্যত প্রজন্মের কি আপনাকে বেশি চিন্তিত করে? অদিতি বসু রায় :  ভবিষ্যতের দুনিয়ার জল সম্পদ নিয়ে চিন্তা হয়। চিন্তা হয় আগামি প্রজন্ম কিভাবে একটা দূষণমুক্ত দুনিয়া পাবে – তাই নিয়ে। খুবই ভাবনা হয় দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে।

মখ : আমাদের প্রিয় পাঠকদের জন্য এবং তাঁদের মনের জন্য আপনার কি বার্তা থাকবে? অদিতি বসু রায় : নিজেকে ভালবাসা খুব দরকার। খুব। আর চাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া। দরকার ফিট থাকা – প্রিয় খাবার খাওয়া- প্রতিটি মানুষ আলাদা তাই তাদের ভাল থাকার ক্রাইটেরিয়া ভিন্ন। আমি কাজ করতে পারলে ভাল থাকতে পারি। ব্যস্ততা খুব দরকার। কাজ একটা দুর্দান্ত স্যাটিসফেকশান দেয়।

মখ : এই মুর্হূতে জীবন কে rewind করে যদি তিনটে পরির্বতন করা যেতো, তবে কি কি change করতেন? অদিতি বসু রায় : জীবনকে রিউইণ্ড করতে পারলে –এক: খুব মন দিয়ে ক্যারিয়ার করার কথা ভাবতাম আগে। মানে চাকরির কথা বলছি আর কি! দুই: নম্বর বাপ্পাকে(স্বামী আবৃত্তি শিল্পী শোভনসুন্দর বসু) আরো দশ বছর আগে সঙ্গে চাইতাম, আর তিনে: টাকা-পয়সা নষ্ট না করে জমাতাম ব্যাংকে।

মখ : ভূতের রাজা যদি এই মুর্হুতে তিন বর দিতে আসেন, ভবিষ্যতের জন্য কি কি চেয়ে নেবেন? অদিতি বসু রায় : অনেক লেখা, লিখে টাকা রোজগার করা, একটা দ্বীপ কেনা।

মখ : আপনার স্বপ্নের পুরুষ কে? অদিতি বসু রায় : স্বপ্নে পুরুষ দেখি না। এমন পুরুষ ভালো লাগে যে আমার কাজে উৎসাহ দেবে। সাহায্য করবে। যার ওপর ভরসা করা যায় যে কোনও ক্রাইসিস-এ। আর হ্যাঁ, লম্বা পুরুষের পাশে হাঁটতে খুব ভাল লাগে।

মখ : মনের খবরকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ অদিতি বসু রায় : মনের খবরকেও ধন্যবাদ। তারা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টিতে বাংলাদেশে অনেক কাজ করছে। তাদের এই ধারা অব্যাহত থাকুক এবং দেশের বাইরেও তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ুক-এই কামনা করছি।

মনোচিকিৎসক, ভুবেনেশ্বর অলইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স, ভারত।