শিশু যৌন নির্যাতনঃ প্রয়োজন অভিবাবকদের সচেতনতা 1

শিশু যৌন নির্যাতনঃ প্রয়োজন অভিবাবকদের সচেতনতা

শিশু আমাদের সবার কাছেই অনেক প্রত্যাশিত। শিশুদের কে ভালবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রত্যেক বাবা-মায়ের কাছে সন্তান স্রষ্টা থেকে প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ উপহার। শিশু পৃথিবীতে ভুমিষ্ট হওয়ার পর আমরা তাদেরকে নিয়ে নানান স্বপ্ন দেখতে শুরু করি, কিন্তু আমরা কি কখনও তার সার্বিক নিরপত্তার কথা চিন্তা করি?

সমাজে আমাদের আশেপাশেই বাস করছে হাজারও মুখোশধারী ব্যক্তিত্ব (আমাদের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী বা অন্যান্যরা) যাদের কাছে আমাদের সন্তান নিরাপদ নয়। আমরা তাদেরকে অনেক বিশ্বাস করি অনেক সময় তা সন্তানের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। সন্তান কি বলছে বা কিছু বলতে চাইছে কিনা তা আমরা বোঝার চেষ্টাও করিনা, উল্টা সন্তানকে বকাঝকা করি যেন পরবর্তিতে তার সম্পর্কে কিছু বলার চেষ্টা না করে।

নিরাপত্তা কি শুধু মেয়ে সন্তানের জন্য নাকি ছেলে সন্তানও এর সমান অংশীদার?

না। মেয়ে এবং ছেলে উভয়ই নিরাপত্তার সমান অংশীদার। আমরা অনেক সময়ই মনে করি শুধু মেয়ে সন্তানের নিরাপত্তা অনেক বেশি জরুরি, কিন্তু পাশাপাশি যে আমাদের ছেলে সন্তানদের নিরাপত্তাও অত্যন্ত জরুরি আমরা তা ভুলেই যাই। আমাদের সমাজে ছেলেরাও বিভিন্নভাবে যৌন নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। অনেক সময় সে বুঝে উঠতে পারেনা তার সাথে কি ঘটেছে। সন্তান হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে যায়, পরিবার থেকে নিজেকে আলাদা মনে করে, নিজেকে সবার থেকে আড়ালে রাখাকেই সবকিছুর সমাধান বলে মেনে নেয়।  কিন্তু কতদিন এভাবে থাকা সম্ভব?

আমরা অনেকেই শুধু মাত্র কন্যা সন্তানের নিরাপত্তার জন্য তার চলাফেরার গন্ডি তৈরি করে দেই, অপরদিকে আমরা ছেলে সন্তানকে চলাফেরার গন্ডি উন্মুক্ত করে দেই। একবারও ভাবিনা আমাদের সন্তান কি নিরাপদ?

আমাদের আশেপাশে শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে, আর তা থেকে সন্তানকে রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব।

ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তান উভয়ের নিরাপত্তার জন্য আমাদের কিছু জিনিষ জেনে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

=> সন্তানের সাথে খুব ভালো এবং বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা।
=> সন্তানের প্রতিটি কথা মনোযোগ সহকারে শুনা, তাঁকে বোঝার চেষ্টা করা।
=> তার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে তাঁকে সচেতন করা। ভালো স্পর্শ, মন্দ স্পর্শ সম্পর্কে তাকে বলা।
=> তার শরীরের গোপনাঙ্গ সম্পর্কে সচেতন করা এবং কেউ যেন তার গোপনাঙ্গ স্পর্শ করতে না পারে সেই সম্পর্কে তাকে বুঝানো।
=> সন্তানের সামনে অনৈতিক শব্দ উচ্চারণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
=> সন্তানের সামনে প্রাপ্ত বয়স্ক কথা, স্থিরচিত্র, অথবা সিনেমা দেখা থেকে বিরত থাকা।
=> সন্তান যদি কারো সাথে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করে তবে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সন্তানের কাছ থেকে তার সাথে স্বাচ্ছন্দ্য না হওয়ার কারণ জানার চেষ্টা করা। পাশাপাশি কোন বিশেষ ব্যক্তিত্বের প্রতি দূর্বলতা প্রকাশ করছে কিনা তা লক্ষ্য রাখা।
=> সন্তানের কক্ষকে সকলের জন্য উন্মুক্ত না করা।
=> সন্তানের খেলার জায়গা এবং সঙ্গী সম্পর্কে সচেতন থাকা।
=> বয়ঃসন্ধিকালে (ছেলে-মেয়ে) উভয়ের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে আগে থেকেই তাকে সচেতন করা।
=> আত্মীয়-স্বজন বা পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ আপনার সন্তানকে উত্যক্ত করছে কিনা লক্ষ্য রাখা।
=> সন্তানকে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া, সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করা।
=> বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট আমাদের সকলের ঘরে ঘরেই আছে। সন্তানকে বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি সাইটে প্রাইভেসি দিতে পারেন।
=> কিছু ব্যাপার মনে রাখা ভালো যে সন্তান ছেলে হোক আর মেয়ে হোক নারী বা পুরুষ উভয়ই তার জন্য অনিরাপদ হতে পারে। সেদিক থেকে নিজেকে সচেতন রাখা অত্যন্ত জরুরি।

সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে সন্তানকে সহায়তা করুন। তার জন্য সব কিছু উন্মুক্ত না করে তাকে একটি গন্ডি তৈরী করে দিন। তাকে সমাজের জন্য নিরাপদ করে গড়ে তুলুন। বর্তমানে ইন্টারনেট- এর ব্যবহার অত্যন্ত বেড়ে গেছে সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পর্ণ সাইট, যা আমাদের সন্তানদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সেক্ষেত্রে এই সাইটগুলো প্রাইভেসি দিয়ে রাখা। মনে রাখতে হবে, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য পথ দেখানোর দায়িত্ব আপনার, আমার এবং আমাদের সকলের।

খাদিজা শুভ
সাইকোলজিস্ট, ট্রেনিং ইন সাইকোথেরাপি
মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।