শিশুর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি

প্রতিটি শিশুরই রয়েছে স্কুলে যাওয়ার অধিকার। স্কুলে যাওয়া শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি রাষ্ট্রই শিশুর স্কুলে যাওয়ার একটি বয়স নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের জন্য এই বয়সসীমা হলো ৬ বৎসর। স্কুলে যাওয়া শিশুদের জন্য একটি আনন্দের বিষয় হলেও অনেক শিশু স্কুলে যেতে ভয় পায়, আতংকিত বোধ করে ও মানসিক চাপ বোধ করে। অবশ্য যে শিশুর প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকে তার মধ্যে ভীতির ভাব কম থাকে। এই ভীতি ও আতংকের বোধ এত প্রবল হয় যে অনেক শিশুই স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ে। কেউ কেউ প্রথম শ্রেণিতে ঝড়ে পড়ে আবার কেউ কেউ দ্বিতীয় শ্রেণিতে ঝড়ে পরে।

শিশুরা যদি স্কুলে আনন্দ পায় এবং তার সফলতার অভিজ্ঞতা হয় তখনই তারা স্কুলে যেতে চায়। স্কুলে আনন্দ পাওয়া ও সফলতার অভিজ্ঞতা হবার জন্য দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো- স্কুলে কর্মসূচি আনন্দদায়ক ও অংশগ্রহনমূলক হওয়া এবং আরেকটি হলো- শিশুর স্কুলে যাওয়ার যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকা।

স্কুল সম্পর্কে ধারণা

স্কুল সম্পর্কে শিশুর মনে একটি পূর্ব ধারণা জন্মানো অত্যন্ত প্রয়োজন। শিশু যেন বুঝতে শেখে যে একটি বয়সে তাকে স্কুলে যেতে হবে, সব শিশুকেই স্কুলে যেতে হয়, স্কুল একটি আনন্দের জায়গা যেখানে অনেক কিছু শেখা যায়। শিশুকে স্কুলের ধারণা দেয়ার জন্য বাবা-মা/শিশুযত্নকারীকে অনেক কিছুই করতে হবে। যেমন-

– স্কুল সম্পর্কে আলোচনা করা।
– স্কুল সম্পর্কে গল্প বলা।
– কোনো স্কুলের ছবি রঙ করতে দেয়া।
– স্কুল নিয়ে গান করা।
– স্কুলে যেসব ছড়া বলা হয় তা শিশুকে শেখানো।
– কোনো স্কুলের ছবি দেখানো।
– স্কুলের ছবি নিয়ে আলোচনা করা।
– শিশুকে নিয়ে কোনো স্কুলে ঘুরতে যাওয়া।

স্কুলে করণীয় আচরণ

স্কুলে অনেক শিশু একসাথে লেখাপড়া করে ফলে শিশুদের সামাজিক নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। তাই শিশুকে আগে থেকেই এমন আচার আচরণ শেখাতে হবে যা তাকে স্কুলে করতে হবে। স্কুলে যাওয়ার আগেই শিশুকে যা যা শেখাতে হবে তা হলো-

– অন্য শিশুদের সাথে খেলা করা।
– বড়দের সাথে মেলামেশা করা।
– বড়দের সাথে খেলা।
– চারপাশ অনুসন্ধান করা।
– প্রশ্ন করা।
– প্রশ্নের উত্তর দেয়া।
– বন্ধু বানানো।
– সামাজিক নিয়ম-কানুন মেনে চলা।
– নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা (turn taking) শেখানো।
– অন্যকে সহযোগিতা করা।
– নিজের জিনিষপত্র অন্যের সাথে ভাগাভাগি করা।
– নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
– নিজের যত্ন করা।
– নিজে নিজে কাপড় পরার অভ্যাস করা।
– নিজে নিজে খেতে পারার অভ্যাস করা।
– খেলনার যত্ন করতে পারা।
– দৌড়াদৌড়ি করতে পারা।
– ধরা, ছুঁড়ে মারা, বলে লাথি দিতে পারা।
– মোমের পেন্সিল ঠিকমতো ধরা।
– তুলি ঠিকমতো ধরা।
– কাঁচি ঠিকমতো ধরা।
– পরিষ্কার করে কথা বলা।

সংখ্যা সংক্রান্ত পূর্ব ধারণা (Pre- math)

স্কুলে যাওয়ার পর শিশুকে স্কুলে ও বাড়িতে এমন কাজ দেওয়া হয় যা সংখ্যা ও অংক সংক্রান্ত। বেশিরভাগ শিশু অংককে ভয় পায় এবং এটাকে অপছন্দ করে। তাই সংখ্যা ও অংকের প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তোলার জন্য শিশুর পূর্ব প্রস্তুতি থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। বাবা-মা ও শিশু যত্নকারীরা নানারকম খেলা ও কাজের মাধ্যমে শিশুকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। সংখ্যা ও অংকের প্রতি পূর্ব ধারণা গড়ে তোলার জন্য শিশুকে যা যা শেখাতে হবে তা হলো-

– ছোট/বড় এর ধারণা।
– লম্বা/বেটে এর ধারণা।
– গোল চারকোণা ও তিন কোনার ধারণা।
– কম/বেশির ধারণা।
– সহজে গণনা করা।
– শরীরের অঙ্গের ধারণা।
– উঁচু/নিচু এর ধারণা।
– বড় গাছ/ছোট গাছের ধারণা।
– সংখ্যা সংক্রান্ত ছড়া বলতে পারা।
– সংখ্যার ছড়ার সাথে অঙ্গ সঞ্চালন/নাচ করতে পারা।
– সংখ্যা সংক্রান্ত গান করতে পারা।
– সংখ্যা সংক্রান্ত গল্প বোঝা ও বলা।

monon-600

পড়া সংক্রান্ত পূর্ব ধারণা (Pre- reading)

স্কুলে গিয়ে শিশুকে পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে হয়। কোনো কোনো শিশু পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারে কিন্তু সব শিশুর বেলায় তা প্রযোজ্য নয়। তাই শিশু যাতে সহজে পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারে তাঁর জন্য শিশুকে পূর্ব থেকেই প্রস্তুত করতে হবে। শিশুর পড়ার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আগে থেকে বাবা-মা/শিশু যত্নকারীরা যা যা করতে পারেন তা হলো-

– ছবির বই উল্টে পাল্টে দেখানো ও আলোচনা করা।
– গল্পের বই পড়ে শোনানো ও ছবি দেখানো।
– গল্পের কার্ডের মাধ্যমে গল্প বলা।
– অক্ষর নিয়ে গল্প পড়ে শোনানো। (এই লেখকের একটি বই রয়েছে যার নাম “সাথী খোঁজা”)।
– অক্ষর ম্যাচ করে খেলা করা। (যেমন শিশু একই রকম দুটো অক্ষর এর কার্ডকে একসাথে রাখবে।)
– অক্ষর নিয়ে গল্প বলা।
– অক্ষর নিয়ে গান করা।
– অক্ষর নিয়ে ছড়া বলা।

লেখা সংক্রান্ত পূর্ব ধারণা (Pre-writing )

স্কুলে যাওয়ার পর পড়ার সাথে সাথে শিশুকে লেখার দক্ষতা অর্জন করতে হয়। অন্য দক্ষতাগুলোর মতো লেখার দক্ষতা অর্জন করার জন্যও পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি। স্কুলে যাওয়ার পূর্বেই বাবা-মা/শিশু যত্নকারীরা যা যা করতে পারেন তা হলো-

– শিশুকে স্বাধীনভাবে (free –hand) আঁকতে দিতে হবে।
– শিশুকে পেন্সিল দিয়ে আঁকতে দিতে হবে।
– শিশুকে মোমের পেন্সিল দিয়ে আঁকতে দিতে হবে।
– শিশুকে রংতুলি দিয়ে আঁকতে দিতে হবে।
– কোনো আঁকা ছবি রং করতে দিতে হবে।
– কাগজ দিয়ে নানা কিছু বানাতে দিতে হবে। যেমন কাগজের নৌকা, কাগজের বল ইত্যাদি।
– শিশুকে বিভিন্ন জিনিষ দিয়ে মালা গাঁথতে দিতে হবে।
– শিশুর সাথে আঁকা আঁকা খেলতে হবে। যেমন মা পাতার উপরে একটা টান দিবেন এবং শিশুকে বলবেন আরেকটি টান দিতে। এভাবে দুজন বারে বারে টান দেয়ার মাধ্যমে কোনো চিত্র ফুটে উঠবে। এরপর শিশুকে রং করতে বলা যেতে পারে।
– শিশুকে রং করার খাতা কিনে দেয়া যেতে পারে। যেখানে সে বিভিন্ন ছবি রং করবে।
– কাঁচি দিয়ে ছবি কেটে কেটে কোলাজও তৈরি করতে পারে।
– বিভিন্ন ধরনের বিচি মিশিয়ে দিয়ে তা আলাদা করে বাছতে দিতে হবে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলর, প্রধান নির্বাহী- ইনার ফোর্স