মূল পাতা / শিশু কিশোর / শিশু কিশোরদের গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমস্যা কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার- ১ম পর্ব

শিশু কিশোরদের গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমস্যা কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার- ১ম পর্ব

শিশু কিশোরদের মানসিক রোগের মধ্যে কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক রোগ বা সমস্যা না বলে আচরণগত সমস্যা বলাই বেশি উপযোগ্য। অসামঞ্জস্য এবং অগ্রহণযোগ্য আচরণই কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাড়ি, স্কুল, বন্ধুবান্ধব বা সমাজের সবখানেই আচরণের অসংগতি চলতেই থাকে। সময় মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারলে বা আগে থেকেই এসব বিষয় সম্বন্ধে সতর্ক না থাকলে এর ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে।

কি হয় কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে

কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশু কিশোরদের মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা এবং অন্য মানুষের প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়। প্রতিদিন চলতে গিয়ে যেখানে যেমন নিয়ম কানুন বা প্রথা মেনে চলতে হয় কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে তার প্রায় অধিকাংশই নষ্ট হয়ে আসে। ঘরে-বাইরে কোথাও তারা নিয়ম মানতে চায়না। অন্যের অধিকার সম্মন্ধে শ্রদ্ধাবোধ বা সম্মান প্রদর্শন কমে আসে। বেপরোয়া, উন্নাসিকতা, উশৃঙ্খলতা, উদাসীনতা, উগ্রতা এমনকি মিথ্যা কথা বলা চরিত্রের একটি বড় অংশকে দখল করে নেয়। সাধারণত বয়সের সাথে সংগতিপূর্ণ সামাজিক আচরণগুলিও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।

অন্য কোনো মানুষ বা জীবজন্তুর প্রতি তাদের কোনো ধরনের মমতাবোধ থাকেনা। বরং বেশিরভাগ সময়ই তারা ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ আচরণ করে থাকে। ঘরে-বাইরে জিনিষপত্র ভাংগাভাংগি বা মারামারি প্রায়ই লেগে থাকে। প্রায়ই দেখা যায়, বাড়িতে বা স্কুলে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক আচরণের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এদের এধরনের প্রতারণামূলক আচরণের জন্য অনেক সময় অভিভাবকরা বিভ্রান্ত হয়ে থাকে। জিনিসপত্র সরানো বা চুরি করা অভ্যাসে পরিণত হয়। সবখানে নিয়মের প্রতি উন্নাসীকতা চরমে পৌঁছে। অতিরিক্ত চাহিদা বা নিজের ইচ্ছা মতো চলা অভ্যাসে পরিণত হয়। পিতা মাতা বা শিক্ষকরা অনেক সময় এদের আচরণ বা চাহিদার কাছে অসহায় হয়ে যায়। আঠারো বছরের আগ পর্যন্ত এই সমস্যাগুলি কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারের অন্তর্ভূক্ত থাকে। পরবর্তীতে এই সমস্যাগুলিকেই এন্টিসোশাল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার হিসেবে ধরা হয়।

কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ছেলেমেয়েদের আচরণ ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন হলেও আচরণের মূল বৈশিষ্ট্য প্রায় একই থাকে। জায়গা ভেদে প্রতারণা এবং নিয়মভাংগার কৌশল ভিন্ন হয়। কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হবার পর, তাদের চরিত্রের অন্যান্য পরিবর্তনের ভিতর গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন তাদের মাঝে কোনো বিষয়েই অনুশুচনা কাজ করেনা।

এমনকি তারা পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা থেকেও কিছু শিখতে চায়না। সব বিষয়েই তার নিজের চিন্তাই যেন শেষ কথা।

স্কুলে বা পড়াশুনার স্থানে আচরণ

পড়াশুনা, নিয়মিত স্কুলে যাওয়া বা অন্যান্য বিষয়ের উপর থাকে চরম অনাগ্রহ। বিভিন্ন ছুতা বা বাহানায় তারা প্রায়ই স্কুল ফাঁকি দেয়। ক্লাসে গিয়েও পড়াশুনা না করা এবং অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। কোনো একটি কাজ সঠিকভাবে না করার যোগ্য যুক্তি যেন তাদের কাছে সবসময়ই তৈরি থাকে। সব কিছুতেই কেয়ারলেস ভাব স্পষ্ট। অন্য সহপাঠীদের সাথে সচারাচর সদভাব গড়ে উঠেনা। সাধাণরত অন্যরা এদেরকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে। সুন্দর সম্পর্ক তৈরির ব্যাপারেও তাদের উদাসীনতা স্পষ্ট থাকে। তাদের একাডেমিক পারফরমেন্স ক্রমান্বয়ে নীচের দিকে নামতে থাকে। এমনকি, অনেকেই পড়াশুনা বন্ধও করে দেয়।

পরিবারে আচরণ ও অবস্থান

সাধারণত পরিবারের অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে আসে। মিথ্য বলা, টাকা পয়সা বা মূল্যবান জিনিস চুরি করা, রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া, জিনিসপত্র ভাংগা, যখন তখন ক্ষেপে যাওয়া, দেরি করে ঘুম থেকে উঠা, সারারাত না ঘুমিয়ে পরের দিনের কাজের বা স্কুলে নিয়ম না মানা অহরহই দেখা যায়। অন্যের উপর দোষ চাপানোর একটা প্রবণতা সব সময়ই লক্ষ্য করা যায়। যখন তখন অপ্রয়োজনীয় বা অসম্ভব আবদার প্রায়ই করে থাকে। পরিবারের অর্থনৈতিক, সামাজিক বা অন্যান্য সংগতির বিষয়ে তারা থাকে চরম উদাসীন। নিজের ইচ্ছা বা চাহিদাই তাদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে।
পরিবারের অন্যরা ধীরে ধীরে তাদের উপর যেকোনো ধরনের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। পরিবারের সদস্যদের এসব বিষয়ে প্রায়ই হতাশ হতে দেখা যায়। অনেকেই আবার বয়স কম মনে করে বিষয়গুলিকে মেনে নেয় এবং কেউ কেউ প্রশ্রয়ও দিয়ে থাকে। কেউ আবার তাদের এধরনের আচরনগুলিকে অন্যদের কাছ থেকে ঢেকে রাখতে চায়। ফলে পরিণতি হয় আরো খারাপ।

monon-600

বন্ধু বান্ধবদের সাথে সম্পর্ক ও আচরণ

তাদের মতের সাথে মিলে যায় এমন মানুষদের সাথেই তাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। তবে অবধারিতভাবেই সেই বন্ধুত্ব বেশি দিন টিকেনা। নিজস্ব বিশ্বাস অবিশ্বাসের টানা পোড়নেই সেসব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অনেককে দ্রুত গ্রুপ পরিবর্তন করতেও দেখা যায়। সহজেই নতুন বদ্ধু তৈরি করতেও তারা পটু হয়। মিথ্যা বলে বা গল্প তৈরি করে অন্যদের মুগ্ধ কিংবা প্রলুব্ধ করার কৌশল তারা সহজেই শিখে যায়।

বলাবাহুল্য এদের অনেকেই বিভিন্ন অসামাজিক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে। নেশা, ছিনতাই, মারামারি, পরিবারের বা বন্ধু-বান্ধবের জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়া থেকে শুরু করে নতুন নতুন অপরাধ প্রবণতা তৈরি হয়।

বিশেষ বিশেষ লক্ষণ ও গুন

কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত অনেকের মাঝেই বিশেষ ধরনের কোনো একটি কাজের প্রতি দক্ষতা থাকতে দেখা যায়। নতুন নতুন প্রতারণার কৌশল হিসেবে সেই দক্ষতা বা গুনকেও তারা অনেক সময় কাজে লাগায়। কেউ হয়তো কোনো একটি খেলা ভালো পারে, কেউ হয়তো ভালো গান গাইতে বা বাজাতে পারে। অনেকে আবার অবিশ্বাস্য কিছু করেও দেখাতে পারে।

অনেক সময় দেখা যায় কোনো একটি বিশেষ কাজের দায়িত্ব ওদের হাতে ছেড়ে দিলে এবং তারা যদি নিজের নিয়ম ও ইচ্ছা অনুযায়ী করতে পারে তবে সেসবের ভালো ফলও বয়ে আনতে পারে। তারা অতিরিক্ত রিস্ক নিতেও পছন্দ করে। তবে অনেক কাজ বা দায়িত্ব হাতে নেয়ার এক ধরনের প্রবণতা কাজ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ অসমাপ্ত রেখে অন্য কাজে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে সত্যিই কোনো কাজের দায়িত্ব দিয়ে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায়। কোনো কোনো গবেষণায় দেখা গেছে, কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশু কিশোরদের অনেকেই স্বাভাবিক বুদ্ধির পরিমাণের চেয়ে কম বুদ্ধিমান হয়ে থাকে। অনেকের ভিতরই ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার সামাজিক দক্ষতাও কম হয়। বিশেষ করে যাদের মধ্যে এসব সমস্যা আগে আগেই শুরু হয় তাদের বুদ্ধি কম হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অথবা যাদের তুলনামূলক ভাবে বুদ্ধি কম তারাই এমন সমস্যায় বেশি জড়িয়ে পড়ে।

কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারের প্রকার

অনেকে অনেক রকম করে কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারকে ভাগ করে থাকলেও সাধারণত দুটি ভাগই বেশি গ্রহণযোগ্য। একভাগে, এগ্রেসান বা উগ্রতা বেশি থাকে। অন্যভাগে দেখা যায়, উগ্রতার কম বেশি হলেও তাদের নিয়ম ভাংগা বা অসামাজিক কাজের প্রবণতা বেশি থাকে। আবার দুটি বৈশিষ্ট্যও একসাথে থাকতে পারে।

চলবে…


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

• চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক - মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। • সেকশন মেম্বার - মাস মিডিয়া এন্ড মেন্টাল হেলথ সেকশন অব 'ওয়ার্ল্ড সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন'। • কোঅর্ডিনেটর - সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক (পিএসসি), মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। • সাবেক মেন্টাল স্কিল কনসাল্টেন্ট - বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট টিম। • সম্পাদক - মনের খবর। চেম্বার তথ্য - ক্লিক করুন