অটিজম কী

অটিজম কী, কিভাবে বুঝবেন?

অটিজম কী, কিভাবে বুঝবেন?

ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছে তার সন্তান অমূল্য। তাই সন্তানের কোনো রোগ- হোক না সেটা শারীরিক অথবা মানসিক, সহজে কেউ মেনে নিতে পারেন না। আর মানসিক হলে তো কথাই নেই। চিন্তার মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেরকম একটি সমস্যার নাম অটিজম।

মিডিয়ার কল্যাণে অটিজম এখন আর অপরিচিত কোনো শব্দ নয়। তবে প্রায়ই যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয় তা হচ্ছে অটিজম কী? অটিজম কি কোনো অসুখ নাকি অন্য কিছু? মূলত অটিজম একটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা। মাতৃগর্ভ থেকেই এই সমস্যার শুরু। মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যাগুলোর মধ্যে অটিজম অন্যতম। বিকাশজনিত অন্য সমস্যাগুলো হলো বুদ্ধির স্বল্পতা, অতি-চঞ্চলতা ইত্যাদি।

জন্মের পর প্রথম কয়েকটি বছর শিশুরা বাবা-মা’র সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। তাই বাবা-মা’র পক্ষেই শুরু থেকে সমস্যাটিকে নির্ণয় করা সম্ভব। তাহলে আসুন জেনে নিই কীভাবে বুঝবেন যে আপনার বাচ্চাটি অটিজমে আক্রান্ত। অটিজমের লক্ষণগুলো অল্পবয়স থেকেই প্রকাশ পায়। সাধারণত তিনবছর বা অনেক ক্ষেত্রে তার আগেও এটি শুরু হতে পারে। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে এই সমস্যাটি ৩-৪ গুণ বেশি দেখা যায়। অটিজমে প্রধানত তিনটি বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়-

  • ভাষা এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে পরিপার্শ্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সমস্যা
  • সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে সমস্যা
  • আচরণগত সমস্যা

প্রথমত, ভাষার প্রকাশ নিয়ে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো হতে পারে সেগুলো হচ্ছে- এক বছরের মধ্যে দা-দা, বাবু-বু উচ্চারণ করতে না পারা, দু-বছরের মধ্যে অর্থপূর্ণ দুটি শব্দ দিয়ে কথা বলতে না পারা। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে প্রতিটি শিশুই আলাদা, কারো কারো একটু বেশি সময় লাগতে পারে। তবে সেটা যদি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে তাহলে সমস্যা হিসেবে ধরে নিতে হবে। এসব বাচ্চারা অস্বাভাবিক আওয়াজে বা ছন্দের তালে কথা বলতে পারে, একই কথা বারবার বলতে পারে, ভুল উচ্চারণে কথা বলতে পারে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও এরা নিজের ভাব প্রকাশ করতে পারে না; যেমন- এরা হাত বা ইশারার মাধ্যমে কিছু দেখায় না, স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না, পরিবেশ অনুযায়ী নিজের মুখভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে সেটি হচ্ছে- সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা; যেমন- এরা নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, হাসির জবাবে হাসে না, স্বাভাবিক উপায়ে নিজের আবেগ-অনুভূিত প্রকাশ করতে পারে না, নিজের আনন্দ-অনুভূিত কারো সাথে ভাগাভাগি করতে পারে না, সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে খেলতে বা মিশতে পারে না, নিজে নিজে কল্পনা করে খেলতে পারে না, নিজের জিনিসপত্র খেলার সাথিদের সাথে ভাগাভাগি করে না, সঠিকভাবে খেলনা ব্যবহার করতে পারে না, কেউ আদর বা স্পর্শ করলে পছন্দ করে না ইত্যাদি।

শেষোক্ত যে লক্ষণগুলো অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে দেখা দিতে পারে সেগুলো হচ্ছে- আচরণের ভিন্নতা; যেমন- এরা একই কাজ বারবার করতে পছন্দ করে (একই খাবার খেতে চায়, একই পোশাক বারবার পরতে চায়, একই ধরনের খেলনা নিয়ে খেলতে চায়), একই অঙ্গভঙ্গি বারবার করতে পারে (হাততালি দেয়া, একই জায়গায় বারবার ঘোরা)। এসব শিশুরা একটি নির্দিষ্ট রুটিনে চলতে ভালোবাসে, কোনো পরিবর্তন সহজে মেনে নিতে পারে না।

উপরোক্ত লক্ষণগুলো ছাড়াও আরো কিছু সমস্যা এদের থাকতে পারে; যেমন- এসব শিশুরা ব্যথা পেলে বা কেটে গেলে অথবা অতিরিক্ত শব্দ-আলোতে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা থাকতে পারে (আঙুল বা নখ কামড়ানো, কোনো কিছুতে মাথা দিয়ে আঘাত করা ইত্যাদি), অতিরিক্ত চঞ্চলতা, অমনোযোগিতা, খিঁচুনি হতে পারে, স্বল্প-বুদ্ধি সম্পন্ন হতে পারে।

অটিজমে অনেকগুলো বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় বলে এক্ষেত্রে বাবা-মায়ের পর্যবেক্ষণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনার সন্তানের প্রতিটি আচরণ যদি আপনি গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ করে থাকেন তাহলে আপনি নিজেই আপনার বাচ্চাটি অটিজমে ভুগছে কিনা বুঝতে পারবেন। তবে মনে রাখতে হবে, ওপরের যে কোনো লক্ষণ অল্প সময়ের জন্য কোনো শিশুর মধ্যে থাকলেই ধরে নেয়া যাবে না যে বাচ্চার অটিজম আছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে অটিজম নির্ণয় করার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

সূত্র: মনের খবর প্রিন্ট, বর্ষ-১, সংখ্যা-৪


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।