মূল পাতা / শিশু কিশোর / নৈতিক শিক্ষা হোক সন্তানের প্রথম পাঠ

নৈতিক শিক্ষা হোক সন্তানের প্রথম পাঠ

শুরুতে একটি ঘটনা বলি। এক শিশু পড়ছে তার বাল্যশিক্ষা বইয়ে: সদা সত্য কথা বলিবে। মিথ্যে কথা বলিবে না। মিথ্যে বলা মহাপাপ। মিথ্যেবাদী কষ্ট পায়।

মেয়েটি পড়ছে। আর মা-কে জিজ্ঞেস করছে, মা সত্য কী? মিথ্যে কী? পাপ কী? মা এক এক করে বলছেন। মেয়েটিও বুঝতে পারছে। একপর্যায়ে সে আঁতকে উঠে বলল-মা তাহলে আব্বুর কী হবে? আব্বু তো কষ্ট পাবে? মা বললেন, কেন? মা সেদিন বাসায় আমি আর বাবা ছিলাম। একজন এসেছিলেন। আমি দরজা খুলতে গেছি। বাবা বললেন, খুলিশ না! খুলিশ না! কয়েকবার বেল দিয়ে এমনিই চলে যাবে। ভাববে বাসায় কেউ নেই। অথচ বাসায় তো আমরা ছিলাম! আসলে সেদিন যিনি এসেছিলেন, তিনি দুধওয়ালা। সেদিন তার পাওনা টাকা নেয়ার কথা ছিল। টাকা যেন দিতে না হয়, সেজন্যে মেয়েকে তিনি দরজা খুলতে না করেছেন। মেয়েটির মা পরে তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলেন।

এই সময়কার শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হলে আগে যে আমাদের বড়দের নৈতিকতা ঠিক আছে কিনা তা দেখতে হবে। সেজন্যে সন্তানকে নৈতিকতা শেখানোর আগে আমরা নিজেদের দিকে তাকাতে চাই যে, আমাদের মধ্যেও সেই শিক্ষাটি, সেই গুণটি আছে কিনা, না থাকলে শিখে নেয়ার চেষ্টা করব। তাহলে আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও-বাক্যটি খুশি হবে যে, কথাটার একটা মর্যাদা আমরা দিয়েছি।

এখন শেখানোর বিষয় হচ্ছে নৈতিকতা। এর সিলেবাস কতটুকু? বিশাল সিলেবাস, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই সিলেবাসের প্রথম পর্ব হচ্ছে সত্য বলার চর্চা। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বলা যেতে পারে যে, সকল অন্যায়ের শুরু এই মিথ্যা দিয়ে। সত্য থেকে বিচ্যুতির কারণে। যে কারণে দেখুন, সেই লোক যখন নবীজী (স)-এর কাছে এসে বললেন, আমি অনেক কিছু মানতে পারব না। আমাকে একটি নির্দেশনা দিন। তবে যেটি দেবেন সেটিই আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। নবীজী (স) তাকে বলেছিলেন মিথ্যা বলো না। ফলে দেখা গেল রাতের অন্ধকারে সে যখন বের হচ্ছিল চুরি করতে, এটাই ছিল তার পেশা। এক পরিচিত যখন জানতে চাইলেন কোথায় যাচ্ছ, সে আর বলতে পারল না। কারণ, বলেকয়ে তো আর চুরি করতে যাওয়া যায় না। সে ফিরে এলো ঘরে। পরদিন বেরোতে গিয়েও আরেক পরিচিতের সাথে দেখা। তাকেও সে সত্যটি বলতে পারল না। আবার সত্য ছাড়া কোনো মিথ্যা সে বলবে না বলেই নবীজী (স)-কে কথা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অনভ্যাসে বিদ্যানাশ বলে যে কথাটি প্রচলিত আছে, তা-ই হলো। সে আর চুরি করতে পারে না। ধীরে ধীরে সে সৎপেশায় যতটুকু পারত উপার্জন করতে শুরু করল। তার জীবন থেকে অনেক বড় একটি অন্ধকার সময় দূর হলো। কীভাবে? ঐযে, মিথ্যা বলা থেকে বিরত থেকে। এই সময়ের প্রেক্ষাপটে আমরা অভিভাবকেরা কী করতে পারি? কোলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে এ নিয়ে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। সেখানে শিশুর মিথ্যা বলা রোধে যত্ন নিন শিরোনামে বেশ সুন্দর কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হয়।

শিশুদের বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকরা তাদের নিয়ে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হন, তার মধ্যে সন্তানের মিথ্যা বলাও পড়ে। মনোবিদদের মতে, বকুনির ভয়ে মিথ্যা বলা দিয়েই এই অভ্যাস বাসা বাঁধে শিশুদের স্বভাবে। কোনো কোনো সময় মা-বাবা এই স্বভাবকে অবহেলা করে গেলেও তা পরে বড়সড় আকার ধারণ করে। শুধু তাই-ই নয়, কথায় কথায় মিথ্যা বলার এই স্বভাব শিশুর জীবনেও নানা ক্ষতি করে, ছোট থেকেই তা রুখে না দিলে এই অভ্যাস খুব বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে।….

শাসন বা মারধরে না গিয়েও এই স্বভাব রুখে দেয়া সম্ভব। মনোবিদদের মতে, শিশুকে প্রথম থেকেই গল্পের ছলে মনীষীদের জীবনী, ঈশপের নানা গল্প, নীতিকথা শেখান। বড় মানুষরা কেউ মিথ্যা পছন্দ করছে না অথবা মিথ্যা বিষয়টা খুব একটা গ্রহণীয় নয়-সে ধারণা মনের মধ্যে প্রবেশ করান। শিশুদের সামনে যতটা সম্ভব মিথ্যা এড়িয়ে চলুন। তারা কিন্তু অভিভাবকদের থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই পারিবারিক নানা কারণে অতিকথন, মিথ্যা এড়িয়ে চলুন। মিথ্যা বলা কতটা খারাপ কিংবা আপনাদের বাড়ির সব সদস্য এই মিথ্যা বলাকে কতটা ঘৃণা করেন-সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিন।

স্কুল থেকে ফিরলে বা কোনো বন্ধুর সঙ্গে মিশলে, লক্ষ রাখুন তার চারপাশের বন্ধুরা কেমন। তাদের মধ্যে কারো মিথ্যা বলার প্রবণতা থাকলে তা যেন আপনার শিশুকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে যত্নবান হোন। দরকার হলে মিথ্যা বলা শিশুটির অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলুন। কোনো কারণে আপনার শিশু কি নিজের ওপর আস্থা হারাচ্ছে বা অবহেলিত হচ্ছে কোথাও, সেদিকে নজর রাখুন। এসব কারণ ঘটলেও শিশুরা মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

কোনটা মিথ্যা আর কোনটা কল্পনা, তা আগে নিজেরা বুঝুন। কোনো কোনো কল্পনা শিশুবয়সের জন্যেই নির্ধারিত। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তা কেটেও যায়। কাজেই ছোটখাটো কল্পনাকে মিথ্যা ভেবে অযথা দুশ্চিন্তা করবেন না। শাসনের বাড়াবাড়ি নয়, দরকারে কথা বলুন শিশুর সঙ্গে। কোনোভাবেই মিথ্যা রুখতে না পারলে শিশুমনোবিদ বা চাইল্ড সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলুন।

আনন্দবাজার পত্রিকায় এভাবেই কিছু সুন্দর পরামর্শ তুলে ধরা হয়। আসলে পরামর্শ সবসময় ভালোই হয়। তবে বুঝতে হবে আমার সন্তানের জন্যে কোন সময়ে কী পরামর্শ সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে তা বুঝতে পারা। এ নিয়ে একটি গল্প বলি :

তেমনি প্রতিটি শিশুর মন বুঝে নিয়ে তারপর তাকে তার বোঝার মতো করে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। আসলে নৈতিক শিক্ষা মানে এমন শিক্ষা যার ফলে শিশুটির মনে প্রেম, মমতা, ভালবাসা, উদারতা জাগ্রত হয়। সন্তানের মাথা ভরা বুদ্ধি আমরা চাই, শরীরের পেশি ভরা শক্তিও আমরা চাই, কিন্তু সবচেয়ে বেশি চাই তার হৃদয়ভরা মমতা। যে মমতার সাহায্যে সে নিজেই ঠিক করতে পারবে কোনটা করা উচিত, কোনটা করা উচিত না, কখন কী বলা যায় আর কখন কী বলা যায় না। নৈতিক শিক্ষা সবসময় ছায়ার মতো তার পাশে থেকে ভালো কিছু করতেই তাকে উৎসাহিত করবে আর মন্দ কিছু করা থেকে বিরত রাখতে সবসময় তাড়িয়ে বেড়াবে।

এক ছেলের কথা বলি। সে তার মায়ের কাছে একটি বিল জমা দিল। মায়ের কাছে তার পাওনা। সেখানে সে লিখেছে : সকালে গাছে পানি দিয়েছি : ১০ টাকা। মুদি দোকান থেকে বাজার করে এনেছি : ২০ টাকা। ছোট ভাইকে কোলে রেখেছি : ২৫ টাকা। ময়লা ফেলে এসেছি : ৫ টাকা। পরীক্ষায় ভালো করেছি : ৫০ টাকা। রাতে মশারি টানিয়েছি : ৫ টাকা। অতএব মা, মোট ১১৫ টাকা আমি তোমার কাছে পাই!

মা পড়ে মুচকি হাসলেন। তার কিশোর ছেলেটির দিকে তাকালেন। পাওনা টাকার (!) অপেক্ষায় যেন তার তর সইছে না। তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি লিখলেন : তোমাকে ১০ মাস পেটে ধারণ : বিনে পয়সায়। বুকের দুধ দু বছর দেয়া : বিনে পয়সায়। তোমার জন্যে রাতের পর রাত জেগে থাকা : বিনে পয়সায়। তোমার অসুখ-বিসুখে তোমার জন্যে দোয়া করা, সেবা করা, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, চোখের পানি ফেলা : বিনে পয়সায়। তোমাকে গোসল করানো : বিনে পয়সায়। তোমাকে ছড়া, গল্প, গান শোনানো : বিনে পয়সায়। তোমার জন্যে খেলনা, কাপড়চোপড় কেনা : বিনে পয়সায়। তোমার ভেজা কাঁথা বদলে দেয়া, কাঁথা ধোয়া, শুকানো, ভাঁজ করা : বিনে পয়সায়। তোমাকে আমি ও তোমার আব্বু নিজেদের থেকেও বেশি ভালবাসা : বিনে পয়সায়।

মা ছেলেটির হাতে চিরকুটটি দিলেন। ছেলেটি পড়ল। কিন্তু কোনো ভাবন্তর হলো বলে মনে হলো না। শুধু চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে এলো। বাকি বন্ধুরা তার জন্যে অপেক্ষা করছে। সবাইকে সে বলেছিল, আজ বিকেলের নাশতা সে খাওয়াবে। তা আর হলো কই? মা কী সব লিখে দিয়েছে! মায়ের ওসব কাজের জন্যে কি আর বিল হয়? সব মায়েরাই তো এগুলো করে। কিন্তু ছেলেটি জানে না যে, মা যদি না থাকতেন একটি শিশুর জন্যে এই কাজগুলো করে দেয়ার জন্যে যাকে রাখা হতো তাকে কত বেতন দিতে হতো।

যা-হোক সেই কিশোর ছেলেটি তার বন্ধুদেরকে বলল, আজ পেট খারাপ। কাল তোদের খাওয়াবো। পেট কিন্তু ভালো আছে। তার হাতে যে টাকা নেই। মনে মনে সে ফন্দি করছে, রাতে বাবার পকেট তো আছেই। অসুবিধা হবে না। দেখি ৩০০ টাকা নিতে পারি কিনা। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বসে আছে পড়ার টেবিলে। কিন্তু মন ঘুরছে বাবার পকেটে। পাশের রুমে বাবার কণ্ঠ। অফিস থেকে ফিরেছেন। মা বলছিলেন, এই শার্ট আর কতদিন রিপু করে পরবে। একটা নতুন শার্ট কেনো। বাবা বললেন, না না খোকার স্কুলের একটা জুতো কিনতে হবে আগামী মাসে। তুমি বরং সময় করে শার্টটা রিপু করে দিয়ো। মা বললেন, এ কী, তোমার মুখ শুকনো কেন? আজকেও দুপুরে খাও নি? বাবা বললেন, ওসব ভাজাভুজি খেতে ভালো লাগে না। বাসায় ফিরে তো খাবই। তাই ভাবলাম, দুপুরে না খেয়ে ৫০ টাকা করে জমলেও মাস শেষে ১৫০০ টাকা। বাজার খরচ যে বাড়তি! ছেলেপুলেকে একটু ভালো কিছু না খেতে দিলে তাদের শরীর বাড়বে কী করে। এতক্ষণে ছেলেটির হুঁশ ফিরল। প্রতিদিন ডিম-দুধ তার জন্যে বরাদ্দ। ভাত, মাছ, মাংস, নানান সবজি, ডাল, নাশতা, স্কুলের টিফিন কোনোটিরই কমতি নেই। অথচ তার বাবা কিনা দিনের পর দিন দুপুরে না খেয়ে টাকা জমান! ছেলেটির চোখ জ্বালা করতে লাগল। মনটা কেঁপে উঠল। এ আমি কী করতে যাচ্ছিলাম! আমার বাবাকে ক্ষুধার্ত রেখে বন্ধুদেরকে নিয়ে ট্রিট দিতে যাচ্ছিলাম! যে বন্ধুদের খাওয়া-দাওয়ার কোনো অভাব নেই। বিবেক তাকে তাড়া করল।

এই যে বিবেকের তাড়া, এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে মা-বাবার অবদান এই ছেলেটির উপলব্ধিতে আসতে এই ঘটনাপ্রবাহের দরকার ছিল। সন্তানকে ছোট থেকেই পরিবারের বিষয়গুলোর সাথে সংযুক্ত করুন। তাতে কী লাভ? ভাত এঁটো করতে গিয়ে তার মনে পড়বে যে, এই চালটুকু যোগাড় করতে তার মা-বাবাকে কত পরিশ্রম করতে হয়। কিংবা সেই মেয়ের মতো হবে, যে কিনা কিশোরীসুলভ সারল্যে ঈদে একটি জুতো আবদার করেছিল বাবার কাছে। যখন দেখেছে বাবা আর কোথাও টাকা না পেয়ে দোকানদারের কাছে বাকিতে চাইতে যাচ্ছেন, তখন মেয়েটি বাবাকে নিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে বলেছে, বাবা চলো বাদাম খাই। আমার অনেক জুতো আছে।

এরকম সমমর্মী সন্তান, বুঝদার সন্তান গড়ে তোলার জন্যেই প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা। অ-তে অজগরটি আসছে তেড়ে, আ-তে আমটি আমি খাব পেড়ে এই শিক্ষা তো স্কুলে, পাঠ্যবইয়ে সবখানেই আছে। কিন্তু তারচেয়েও বেশি প্রয়োজন নৈতিকতার শিক্ষা, শুদ্ধাচারী হওয়ার শিক্ষা।