মূল পাতা / শিশু কিশোর / শিশুর মেধাবিকাশ

শিশুর মেধাবিকাশ

লেখালেখির সঙ্গে মেধা বা প্রতিভার রয়েছে সরাসরি সংযোগ। কিন্তু সব প্রতিভাবান লেখক হবে-এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। তবে জোরালোভাবে বলা যায়, সৃজনশীল লেখক মাত্রই প্রতিভাবান।

শিশুকাল থেকে ঘটতে থাকে প্রতিভার নানামখুী বিকাশ। ঘটতে পারে মেধার বিস্ময়কর বিস্ফোরণ। এই মনোজাগতিক বিকাশের পথে শিশুতে শিশুতে রয়েছে নানা পার্থক্য।

মেধার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সবার প্রতিভা, বুদ্ধির দীপ্তি ও মাত্রা সমান নয়। কেউ কেউ প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন, কেউবা অনুজ্জ্বল। কেউ ধীরে ধীরে শেখে, কারো শেখার গড় সফলতা স্বাভাবিক বা মাঝারি পর্যায়ের।

বুদ্ধির পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে প্রায় একশ বছর ধরে।  বুদ্ধির বিকাশের সঙ্গে কি বংশগত কারণ সরাসরি জড়িত, নাকি পরিবেশও সমানভাবে কাজ করে।

বর্তমান সময়ে মনে করা হয়, বংশ কিংবা পরিবেশ উভয় কারণে বুদ্ধি বিকাশের তারতম্য ঘটে থাকে। বংশ এবং পরিবেশের কারণে বুদ্ধির পার্থক্য হওয়া অস্বাভাবিক নয়, বিকাশের স্বাভাবিক পথেও শিশুতে শিশুতে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবেশের কারণে  বিকাশের ধাপগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবিতও হতে পারে। যুক্তরাজ্যের মনোগবেষক রাটারের মতে, পরিবেশের কারণে শিশুতে শিশুতে আইকিউয়ের তারতম্যের সংখ্যামান কুড়ি (২০) পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে। পরিবেশের দুটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুটি হলো : পুষ্টি ও উদ্দীপনা।

উভয় বিষয়ই বেবিহুড বা প্রাক্-শৈশবে (জন্মের প্রথম  দুই বছর) প্রভাবিত করে বুদ্ধির বিকাশের ধারাকে। এ সময় মস্তিষ্কের দ্রুত বুদ্ধি ও বিকাশ ঘটে। স্বাভাবিক বুদ্ধি ও বিকাশের জন্য পুষ্টি বজায় থাকা জরুরি। জন্মের কয়েক মাস আগে থেকে দুই বছর পর্যন্ত পুষ্টিহীনতা মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে, কমিয়ে দেয় শিশুর শেখার ক্ষমতা।

এ সময় যদি পুষ্টিহীনতা মোকাবিলা করা না হয়, পুরো জীবনের জন্যই মস্তিষ্কের বেড়ে ওঠা ও বিকাশ বাধা পায় বা কমে যায়। ফলে প্রকৃিতগতভাবে যেভাবে উদ্ভাসিত হওয়ার কথা, সেভাবে বিকশিত হতে পারে না শিশু। এ সময় উদ্দীপনাহীন অনুজ্জ্বল কিংবা নিষ্প্রভ একঘেয়ে নিরানন্দময় পরিবেশও শিশুর বুদ্ধির ধার ভোঁতা করে দিতে পারে।

স্কুলে যাওয়ার সময় থেকে কিছুটা উন্নতি হয় পরিবেশের সমস্যা, কিন্তু যে ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে যায়, তা পূরণ হয় না ভবিষ্যতে। বৈজ্ঞানিক এই তথ্যটির মাধ্যমে শিশুর বুদ্ধির ধার শাণিত করার জন্য বেশি সচেতন হতে হবে বাবা-মাকে। মেধাবী শিশু পেতে হলে পরিপর্ণূ যত্ন নিতে হবে গর্ভবতী মায়েদের।

মায়ের পুষ্টি ও মনের শান্তি বজায় রাখা জরুরি। এ কথা স্বীকার করে বিজ্ঞান। মস্তিষ্ক যত বড়ো হতে থাকে, তত ফুটতে থাকে শিশুর প্রতিভার নৈপুণ্য। আকারে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ভেতরে বিকশিত হতে থাকবে মস্তিষ্ক, এর বিভিন্ন অংশ বিকশিত হয় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। ফলে প্রতিভার নৈপুণ্যও উদ্ভাসিত হয় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে।

সব ধরনের দক্ষতা বা সামর্থ্য একই সঙ্গে অর্জিত হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কল্পনাশক্তির (Imagination power) আগে বিকশিত হয় স্মৃতিশক্তি। চিন্তাশক্তির আগেই শাণিত হয়ে যায় কল্পনা করার ক্ষমতা। প্রতিভার বড়ো অনুষদগুলো হচ্ছে : স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি, সৃজনক্ষমতা, অর্থপূর্ণ উপলব্ধি ও ধারণার বিকাশ, যুক্তি প্রয়োগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। এসব অনুষদ মিলেমিশে প্রতিভার স্ফুরন ঘটায়। আর প্রতিভা হচ্ছে মনোজগতের বৌদ্ধিক স্তরের মূল উপাদান, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিস্ফোরণ ঘটে প্রতিভা কারণেই।

এখানে দুটি শব্দ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি (growth), অন্যটি বিকাশ  (development)।  এ মুর্হূতে আমরা প্রতিভা  বিকাশের কথা আলোচনা করছি। সেই সঙ্গে ধাপে ধাপে আলোচনা করব কীভাবে এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো সম্পৃক্ত রয়েছে মস্তিষ্কের  জৈব রাসায়নিক পদার্থ-নিউরোট্রান্সমিটার বা কেমিক্যাল মেসেঞ্জারের সঙ্গে, কীভাবে সৃজনশীলতার স্ফুরণ ঘটে, কীভাবে শব্দচয়নের মাধ্যমে নির্মিত হয়ে যায় সাহিত্যর্কীতি জীবনযাপনে, সংস্কৃতিতে কীভাবে গড়ে ওঠে অভিনব নিদশর্ন।

মেমোরি বা স্মৃতিশক্তি

লেখালেখিতে স্মরণশক্তির ভূমিকা : মস্তিষ্কের তথ্য গ্রহণ ও তা সংরক্ষণ করার সামর্থ্যই হচ্ছে মেমোরি। পরবর্তী সময়ে উপযোগী করে মুহূর্তের মধ্যে তথ্যগুলো পুনরায় সাপ্লাই বা সরবরাহ করে মস্তিষ্ক। তথ্যগুলো গ্রহণ বা সংরক্ষণ করাই মূল বিষয় নয়, ব্যবহারের উপযোগী করে স্মরণ করাও স্মৃতিশক্তির বড়ো সাফল্য। ত্বরিত তথ্য আদান-প্রদানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে অ্যাসিটাইল কোলিন নামক জৈব রাসায়নিক পদার্থ। এটি মস্তিষ্কের একটি উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটার বা কেমিক্যাল মেসেঞ্জার। এটি অন্য আরো অসংখ্য জৈব রাসায়নিক পদার্থের মতো মস্তিষ্কের সংকেত আদানপ্রদান করে থাকে।

প্রতিভার একটি বড়ো অনুষদ হচ্ছে স্মরণশক্তি

প্রতিভার ধাবমান বিকাশের পথে প্রথম বিকশিত হয় স্মরণশক্তি। এমনকি ছয় মাস বয়সের আগে একটি শিশু মানুষ চিনতে পারে। চারপাশে পরিচিত মুখ থাকলে উল্লসিত হয়, তৃপ্ত থাকে। অচেনা মুখ দেখলে কান্না জুড়ে দিতে পারে শিশু। অচেনা জায়গা, শব্দ, দৃশ্য কিংবা প্রাণী দেখলেও ভয় পেতে পারে, কান্না শুরু করতে পারে। এসব কিছু প্রমাণ করে, শিশুর স্মরণ রাখার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায় এ বয়সে। কল্পনাশক্তি, সৃষ্টিশীলতা, অর্থপূর্ণ শব্দের মাঝে সম্পর্ক তৈরি করা কিংবা যেকোনো বিষয়ে যুক্তি দেখানোর দক্ষতা ইত্যাদির মূল ভিতই হচ্ছে স্মরণশক্তি। শিশুর বুদ্ধিকে শাণিত করে তোলার জন্য অনেক কিছু করণীয় আছে মা-বাবার। স্কুলজীবন শুরুর আগে যদি স্মৃতির ব্যবহার শেখানো যায়, অবশ্যই স্কুলের যাত্রা থেকে ভালো ফল করবে শিশু। বিভিন্ন বিষয়-আশয় কীভাবে মনে রাখতে হবে, এ ব্যাপারে যদি শিশুর জন্য যথাযথ ভিত গড়ে তোলা যায়, পরবর্তী জীবনে বড়ো অর্জনের পথ খুলে যাবে, মনোজগৎ হবে সমৃদ্ধ, সৃজনশীল বিকাশের পথ হবে গতিশীল।

প্রাথমিক শৈশবে (২-৫ বছর) স্মৃতিশক্তি শাণিত করার কৌশল : শিশুর স্মরণশক্তির ভিত সুদৃঢ় করতে হলে প্রথমে নিচের টিপসগুলোর প্রতি মনোযোগী হতে হবে মা-বাবাকে :

শিশুর মনোযোগ

নতুন কিছু শোনা বা দেখার জন্য শিশুর মনোযোগ বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। জোরাজুরি, চাপাচাপি নয়; কৌশলে উৎসাহিত করতে হবে শিশুর মনোযোগ। যে যত বেশি মনোযোগী হতে পারবে, তার মেমোরি হবে তত বেশি ধারালো। জীবনের সকল ক্ষেত্রে তত বেশি সফলতা অর্জন করবে সে। যা দেখছে, শিশুটি যদি দেখার সময় মনোযোগী হতে পারে; কিংবা যা শুনছে, যদি মনোযোগ স্থাপন করতে পারে, অবশ্যই প্রখর স্মৃতিশক্তির ভিত গড়ে উঠবে।

শিশুর অর্থপূর্ণ উপলব্ধি

শিশু চারপাশের অনেক কিছু দেখে, অনেক কিছু শোনেও। দৃশ্যমান বস্তু কিংবা শ্রুত শব্দের অর্থ যদি বুঝতে পারে, বেড়ে যাবে মনে রাখার ক্ষমতা। খেলাচ্ছলে কিংবা কৌশলে দৃশ্যমান চারপাশের সবকিছুর অর্থ তুলে ধরতে হবে। এ ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে মা-বাবাকে। স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যাবে শিশু। এগোনোর পথটি সহজ ও অর্থপূর্ণ করে তোলা মা-বাবার প্রধান কাজ। মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে আরোপিত নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে না।

পুনরাবৃিত্তর মাধ্যমে ভুলে যাওয়া রোধ করা

একটি দৃশ্য দেখে হয়ত এর অর্থ বুঝতে পেরেছে শিশু, পুনরায় সেই দৃশ্য দেখার সুযোগ না পেলে স্মৃতি থেকে তা ধীরে ধীরে মুছে যাবে। তেমনিভাবে আগে শেখানো অর্থপূর্ণ শব্দ বা বাক্যাংশটিও বারবার শোনাতে হবে তাকে কিংবা শোনার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এখানেও শিশুকে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে না, জোর দেওয়া হচ্ছে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ওপর।

শিশুর সঙ্গে মেমোরি গেমে অংশগ্রহণ

অনেকগুলো খেলনা বা বস্তু নিয়ে তার সঙ্গে মেতে ওঠা যেতে পারে। প্রতিটি খেলনা বা বস্তুর নাম অর্থসহ বারবার খেলাচ্ছলে তুলে ধরতে হবে। এ সময় শিশুর মনোযোগ আছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। অমনোযোগ দুর্বল করে দেবে মেমোরি গেমের উদ্দেশ্য। কিছুক্ষণ পর একটি বস্তু বা খেলনা সরিয়ে রাখুন, কাজটি করতে হবে কৌশলে। পরবর্তী খেলার ধাপে বোঝার চেষ্টা করুন হারিয়ে যাওয়া খেলনাটার ব্যাপারে সে উৎসুক কি না, বা সেটা সে খুঁজছে কি না। যদি খোঁজে, বুঝতে হবে, প্রাথমিক বয়সেই মেমোরির গাঁথুনিটি মজবুত করে দিতে পেরেছেন আপনি। পরবর্তী জীবনে উত্তরোত্তর শিশুর মেমোরি শাণিত হতে বাধ্য। প্রয়োজন আপনার ধৈর্য ও শিশুর প্রতি নজর দেওয়া। মনোযোগী হওয়া। সময় দেওয়া।

একই গল্প বারবার বলা

একই গল্প বারবার শোনাতে হবে শিশুকে। পরবর্তী সময়ে গল্পটি নিজের মতো করে বলার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। সে কি পুরো গল্পটি বলতে পারছে না? অসুবিধে নেই। চর্চা অব্যাহত রাখলে লাভ হবে, ক্ষতি নেই। বারবার গল্পটি শোনার পর হয়ত একসময় পুরো গল্পটি বলতে পারবে সে। এবার একটু কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। গল্পটির অংশবিশেষ ছাড় দিয়ে আবার শোনানো যেতে পারে তাকে। দেখবেন, ছাড় দেওয়া অংশটুকুু চট করে ধরিয়ে দিচ্ছে সে। এ কাজগুলো করতে হবে শিশুর ম্যাচিউরেশন ও শেখা বা শোনার দক্ষতা গড়ে ওঠার পর।

শিশুকে ছন্দোবদ্ধ করে শেখানো

এ সময় ছন্দোবদ্ধ করে শিশুকে ‘নার্সারি রাইমস’ শেখানো যেতে পারে। সপ্তাহের নাম, সংখ্যা বা বর্ণগুলো ছন্দোময় করে মনে গেঁথে দিতে পারলে সহজে ভুল করবে না শিশু। এ ক্ষেত্রে ছন্দের মিল তৈরি হওয়ার কারণে পরবর্তী ইস্যুটিও চট করে মনে এসে যাবে তার। শিশু যেন বুঝতে পারে তার সঙ্গে বড়োরা এখন আনন্দময় খেলায় শরিক হয়েছে। এমনি মজাদার অনুভূতির মাধ্যমে শিশুর মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। শিশুকে কোনোভাবেই বুঝুতে দেওয়া যাবে না যে তাকে কিছু শেখানো হচ্ছে।

পুরো বিষয়টির অর্থ তুলে ধরা

ক্রমান্বয়ে শিশুকে পুরো বাক্য কিংবা কবিতার পঙক্তি বা চরণগুলোর অর্থ বুঝিয়ে দিতে হবে। টুকরো টুকরো করে ক্ষুদ্র অংশের অর্থ না বলে পুরো পঙক্তিমালার অর্থ বোঝার ক্ষমতা বাড়ানো গেলে মেমোরি ধারালো হতে বাধ্য।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ২য় বর্ষ, ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত।

মোহিত কামাল পেশায় একজন মনোচিকিৎসক, মনোশিক্ষাবিদ, সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্ট। শব্দঘর নামের নিয়মিত প্রকাশিত একটি সাহিত্য-সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকার সম্পাদকও তিনি। বর্তমানে তিনি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ), ঢাকা এর পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বাংলাদেশ এসোসিয়েশান অব সাকিয়াট্রিস্টস এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক।