শিশুদের ভাষা সমস্যা

অতিচঞ্চল, অমনোযোগী শিশুদের ভাষা সমস্যা

প্রকৃতির এক অপার সৃষ্টি মানুষ। বিপুল বিস্ময় রয়েছে মানুষের দেহে। প্রকৃতির সহজাত নিয়মেই মানুষ বেড়ে ওঠে মাতৃগর্ভে। অতি ক্ষুদ্র ভ্রুণ হতে ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পরিপূর্ণ ও পরিপক্ক হয়ে তৈরী হয় মানব দেহ। আপাতদৃষ্টিতে নয় মাসের গর্ভধারনের সময়টি খুব ছোট হলেও এই সময়টিতে ঘটতে থাকে বিস্ময়কর পরিবর্তন। একটি সুস্থ মানব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য গর্ভকালীন মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষা অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুস্থ পরিবেশে মায়ের অবদানেই হতে পারে একটি মানব শিশুর শারীরিক ও মানসিক অর্থাৎ মনের বিকাশ। মন মস্তিষ্কের অংশ, যা চিন্তা চেতনা আবেগ, অনুভূতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, যার মাধ্যমে কোন কিছু সনাক্ত করতে, জানতে এবং বুঝতে পারি। জন্মের পর প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী মন সক্রিয় হয়ে উঠে। শারীরিক বৃদ্ধির সাথে সাথে বিকশিত হতে শুরু করে মন-ও। কারণ একটি শিশু তখন তার চারপাশের মানুষ সমন্ধে ধারণা লাভ করে। বস্তু সম্পর্কে শেখে, নতুন কৌশল আয়ত্তে এনে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে ভাষার মাধ্যমে বাচনিক এবং অবাচনিক উপায়ে যোগাযোগ স্থাপিত করে অনেক তথ্য, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ করে। তাই কেবল জন্মগতভাবে প্রাপ্ত “জিন” ই নয়, শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম আর তা নিশ্চিত করতে পারে সুস্থ ঐশ্বর্য্যময় ভাষা সমৃদ্ধ পরিবেশ।

শিশু তার চারপাশের পরিবেশ হতে বিভিন্ন বস্তু বিষয়ক শব্দ যেমন আয়ত্ত করে। ঠিক তেমনি সে বিচিত্র বিমূর্ত বা ভাব বিষয়ক শব্দ, সামাজিক আত্মীয়তাবাচক শব্দ এবং আবেগ সংবেদন সম্পর্কিত ধারণা শিখে থাকে যা তার মস্তিষ্কের শব্দ ভান্ডারের ধারণার প্রায়োগিক কাঠামোতে জমা হতে থাকে। যদি কোন শিশুর শারীরিক, স্নায়ুগত ও মানসিক/মনোরোগের সমস্যা না হয়ে থাকে তবে এই ধারাবাহিকতাকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নেয়া হয় এবং একটি শিশু ৫ বছরের মধ্যেই মাতৃভাষার প্রয়োজনীয় সব নিয়ম কানুন আয়ত্ত করে ফেলে।

পৃথিবীর সবকিছু সবসময় আপন নিয়মে চলে না। কখনও কখনও স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে। গর্ভকালীন সময়ে রোগ শোকের কারণে একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি যেমন হঠাৎ করে থেমে যায়। তেমনি বিভিন্ন স্নায়ুগত ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দ্বারা বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে শিশুর সম্ভাবনাময় ভাষার বিকাশ পর্বটি পরিপূর্ণ না-ও হতে পারে, অথবা তার বিকশিত ভাষা দক্ষতাটি হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা তৈরি হতে পারে।

ভাষা আয়ত্ত করনের পূর্ব শর্ত হচ্ছে শিশু তার চারপাশের পরিবেশ থেকে মাতৃভাষার অপরিহার্য বিষয়গুলো সচেতন ভাবে শেখে না। বিভিন্ন বস্তু বা ভাব সম্পর্কে “ইনপুট” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন সংজ্ঞাপন পরিস্থিতির মাধ্যমে কথা বলে, সংলাপ বিনিময়ে করে এবং কথোপকথনের পালা বদলের মাধ্যমে। “ইনপুট” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাষার উপাদান গুলোকে কানে শোনে মস্তিষ্কে প্রজ্ঞা কাঠামোতে ধারন করে। যদি কোন শিশুর আচরণের মধ্যে অতিচঞ্চলতা এবং অমনোযোগীতা বিদ্যমান থাকে তাহলে সে শিশুর “ইনপুট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাষার উপাদানগুলোকে কাশে শোনার মাধ্যমে মস্তিষ্কের প্রজ্ঞা কাঠামোতে ধারণ করতে পারবে না। তখন শিশুর মধ্যে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য গুলো পরিলক্ষিত হবে-

১। অমনোযোগীতার কারণে এ ধরনের শিশুরা ক্লাশের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষন মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে না। ফলে ক্লাশের কাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুল ধরা পরে।
২। অতিচঞ্চল ও অমনোযোগীতার কারণে অন্যের সাথে কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে না কিন্তু অতিরিক্ত কথা বলে এবং উদ্দেশ্যহীন ভাবে কথোপকথনের মধ্যে অনাহূতভাবে প্রবেশ করে।
৩। দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে প্রায়ই ভুলে যায় এবং প্রয়োজনীয় অনেক বস্তু হারিয়ে ফেলে।
৪। অতিচঞ্চলতা ও হঠাৎ আবেগের বশে বিচলিত হয়ে বড়দের সাথে তর্কে এবং সমবয়সীদের সাথ মারামারিতে জড়িয়ে পরে।

উপরিউক্ত ভাষার ও আচরণের বিকাশজনিত ঘাটতির কারনে একটি শিশুর সামাজিক কার্যক্ষেত্রে প্রবলভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং উপসর্গগুলো ১২ বছরের পূর্বেই একটি শিশুর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, তাহলে অতিদ্রুত মনোরোগবিদ্যা বিভাগে দেখা করবেন।

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন:

ভাষাবিদ এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক (মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ), জেড.এইচ. সিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।