অটিজমের চিকিৎসা: কার কী দায়িত্ব

অটিজমের চিকিৎসা: কার কী দায়িত্ব

অটিজম আক্রান্ত একজন শিশুর বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়। আমরা জানি যে অটিজম নিরাময়যোগ্য কোনো সমস্যা নয়। তাই অটিজমের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শব্দটির পরিবর্তে ব্যবস্থাপনা শব্দটি ব্যবহার করা শ্রেয়। এদের সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক হয়। তাই এখানে সমন্বিত ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আক্রান্ত শিশুটির জীবনের মান উন্নততর করা যায়।

নিরাময়যোগ্য না হলেও দ্রুত নির্ণয়, বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ আক্রান্ত শিশুর দৈনন্দিন জীবনকে সহজতর করতে পারে। কোনো প্রকার শারীরিক সমস্যা যেমন : শ্রবণ, দৃষ্টিশক্তি ইত্যাদি ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করে নিতে হবে। এছাড়াও সাথে অন্যকোনো বিকাশজনিত রোগ যেমন : জন্মগত ত্রুটি, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, অতিচঞ্চলতা, অমনযোগিতা, মৃগী রোগ অথবা হরমোনজনিত সমস্যা আছে কি নেই তা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবস্থাপনা মূলত একটি টিমের কাজ। এ টিমে প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্য থাকবেন। প্রতিটি শিশুর মধ্যে কিছু লক্ষণ ও আচরণে মিল থাকলেও ব্যবস্থপনার ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিশুকে আলাদাভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। সমন্বিত ব্যবস্থায় প্রথমে আমরা আক্রান্ত শিশু কেন্দ্রিক আলোচনা করব এবং পরে বৃহৎ পরিসরে কার কী ভূমিকা থাকতে পারে তা দেখব।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা

প্রতিটি শিশুর আলাদাভাবে নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একজন শিশুর জন্য একজন প্রশিক্ষক এ অনুপাতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সবচেয়ে ভালো হয়। এ কর্মসূচিতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দক্ষতা, আচরণগত, শিক্ষাগত এবং মানসিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যত ছোটবেলায় প্রশিক্ষণ শুরু করা যাবে তত ভালো ফলাফল আশা করা যায়। পরিবার ও বিশেষায়িত স্কুল অথবা মূলধারার স্কুলে বিশেষ ব্যবস্থায় এদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এটি প্রি-স্কুলে অথবা কোনো বিশেষ কেন্দ্রে শুরু করা যেতে পারে।

অটিজম চিকিৎসা কিংবা ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পেশার মানুষ ফলপ্রসূ অবদান রাখতে পারেন। আমরা যদি অটিজমের সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিই তবে দেখতে পাব কে, কী ভূমিকা পালন করতে পারেন। একটি টিমে কারা থাকতে পারেন তার সম্ভাব্য তালিকা (তবে শিশুর প্রয়োজনে অনুযায়ী সদস্য অন্তর্ভুক্ত হলে ভালো)

  • মা-বাবা/ অভিভাবক/ পরিচর্যাকারী।
  • স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট
  • বিশেষ শিক্ষার প্রশিক্ষক
  • অকুপেশনাল থেরাপিস্ট
  • ফিজিওথেরাপিস্ট
  • সাইকিয়াট্রিস্ট
  • ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট
  • অটিজম বিষয়ক সমাজকর্মী
  • নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ
  • শিশু বিশেষজ্ঞ
  • নিউরোলজিস্ট/স্নায়ু বিশেষজ্ঞ

পরিবার-পুরো ব্যবস্থাপনায় পরিবারের ভ‚মিকা সবচেয়ে মুখ্য। একদম প্রথম কাজটি হচ্ছে কষ্টকর হলেও বাস্তবতাটি সহজভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা । এটিকে রোগ হিসেবে মেনে নেবেন। এটি অভিশাপ বা আশীর্বাদ হিসেবে চিন্তা করা আবশ্যক নয়। বিশেষায়িত কেন্দ্র থেকে আচরণ নিয়ে বাড়িতে শিশুকে শেখানোর পরিবেশ সৃষ্টি করুন। পরিবারের সকল সদস্য ( মাবাবা, ভাই-বোন, গৃহকর্মী অন্যান্য সদস্য যদি থাকেন) সবার কাছে বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করুন এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে ধারণা দিন। তবে ভাইবোনদের তাদের বয়স অনুযায়ী তথ্য দিবে এবং তাদের বিশেষ ভাই-বোনটির আলাদা প্রয়োজন সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। তাদের সাথে নিয়ে কাজ শুরু করবেন। প্রয়োজনে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানকে বিশষায়িত শিক্ষা কেন্দ্রে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারেন। ডে-কেয়ার বা প্রি-স্কুলে অন্যান্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের সাথে মেলামেশা ও অন্যদের সাথে খেলা করার সুযোগ করে দেবেন। আপনাদের বুঝতে হবে কীভাবে বাচ্চাকে কাজে ব্যস্ত রাখা যায়। সবার সঙ্গে বসিয়ে নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস তৈরি করবেন। শৌচাগার ব্যবহার, নিজের কাজ নিজে করার ওপর প্রথম থেকেই জোর দিলে ভালো হবে। নতুন কোনো সমস্যা শুরু হলে তা শিশুর পরামর্শকের সাথে আলোচনা করবেন। শুধু আচরণ নয় পাশাপাশি তাদের ভালো-মন্দ লাগার ওপর ভিত্তি করে বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। কৈশোর ও বয়সন্ধির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, প্রস্তুত করতে হবে। নিজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা ও অন্যান্য সন্তান সদস্যরা যাতে তাদের স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। নিয়মিত এরকম অন্য অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা এবং এ বিষয়ে নতুন নতুন জ্ঞান আরোহণ করা ও প্রশিক্ষণ নেয়া প্রয়োজন।

জেনেটিক কাউন্সেলিং-পরিবারে একজন বিশেষ শিশু থাকলে পরবর্তীতে সে পরিবার আরেকজন শিশু নিতে চাইলে গর্ভধারণের পূর্বেই ভালোভাবে বংশগত ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নেবেন।

স্পিচ এবং ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট-কথা বলা, ভাষা শেখা এবং অন্যদের সঙ্গে অর্থবহ ভাষাগত ও সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করার আচরণ দেয়া। তারা শিশুর সাথে সরাসরি কাজ করতে পারেন অথবা তার টিমকে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারেন।

অকুপেশনাল থেরাপিস্ট-খাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ, খেলাধুলা, ছবি আঁকা, স্কুলের প্রস্তুতি, কম্পিউটার ইত্যাদি নানা বিষয়ে তার চাহিদা অনুযায়ী আচরণ পরিকল্পনা করবেন।

ফিজিও থেরাপিস্ট- তারা শিশুর হাঁটা-চলা, শরীরের প্রতিটি অঙ্গের সঠিক ব্যবহার, নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী সরসরি শিশুকে চিকিৎসা অথবা টিমকে পরামর্শ দান করবেন।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ-শিশুর অতি চঞ্চলতা, মৃগী রোগ, আত্মঘাতী আচরণ কিংবা অন্যদের প্রতি সহিংস আচরণ, তার বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক সমস্যার সমাধানে সাহায্য করবেন।

অন্যান্য-নতুন আচরণ বিশেষজ্ঞ, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ফিজিওথেরাপিস্টদের এখানে নিবিড়ভাবে প্রয়োজন হয়। আরো কিছু পেশার মানুষ যেমন; সাইকোলজিস্ট, জেনারেল প্র্যাক্টিশনার, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞদের টিমে সরাসরি সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেই, তবে অটিজম আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের যেকোনো শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

স্কুল/বিশেষ স্কুলের ভূমিকা-সাধারণ স্কুল হলে অটিজম আক্রান্ত শিশুর জন্য বিশেষ সহায়তার/সহকারীর ব্যবস্থা করতে পারেন। শিশুর আচরণ পরিকল্পনায় পরিবারকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সহপাঠীদেরকে তার প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ ও সাহায্য করার জন্য উৎসাহ দেবেন। স্কুলে তার আচরণে কোনো পরিবর্তন হলে তা তার পরিবার ও কাউন্সিলরের নজরে আনবেন। বিশেষায়িত স্কুল হলে প্রত্যেক শিশুর আলাদা আলাদা আচরণ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও চর্চা করবেন এবং তাদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন।

বৃহৎ পরিসরের করণীয়

স্থানীয় সমাজের ভূমিকা- পাড়া-প্রতিবেশী ও সমাজকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাদের সমস্যাটি দেখতে হবে। সামাজিক পরিবেশে এ ধরনের শিশুদের প্রতি কোনো ধরনের অস্বাভাবিক কৌত‚হল বা নেতিবাচক মন্তব্য থেকে বিরত থাকলে ভালো। প্রয়োজনে বাবা-মা এ শিশুকে নিয়ে কোথায় যেতে পারেন এ বিষয়ক তথ্য দিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে।

ধর্মীয়-ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ শিশু/সুবিধা বঞ্চিতদের সম্পর্কে ধর্মের ভালো ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের মনে ইতিবাচক পরিবর্তনে সহায়তা করতে পারে। পারেন প্রচলিত কুসংস্কার দূর করতে। অভিভাবককে মানসিক শক্তি যোগাতে পারেন এই বলে যে এটি কোনো প্রকার অভিশাপ বা কারো ভুলের অথবা পাপের কারণে হয় না।

মিডিয়ার কার্যক্রম-অটিজম কী, কাদের হয়, কোথায় পরামর্শ পাওয়া যায়, তাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কী কী সুবিধা আছে সেসব বিষয়ে তারা বারবার প্রচার করতে থাকলে সাধারণ মানুষ এবং অভিভাবক সবারই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কমে আসবে। অটিস্টিক শিশুদের সাফল্যগুলো মিডিয়া তুলে ধরলে অন্য অভিভাবকরা দ্রুত ইন্টারভেনশনের বিষয়ে অনুপ্রাণিত হবেন।

রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও নীতিমালা- দেশে কী পরিমাণ জনসংখ্যা এ সমস্যায় আক্রান্ত তা সঠিকভাবে নিরূপন, তাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা ও বিশেষ চাহিদা ইত্যাদি চিহ্নিত করা। স্থানীয় লোকবল ও সম্পদ ব্যবহার করে করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা। বিষয় ভিত্তিক গবেষণা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন। মা-বাবা/অভিভাভবকদের সময় সময় আচরণ দেয়া। যার যার সক্ষমতা অনুযায়ী এদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। অভিভাবকহীনদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ব্যবস্থা। সরকারিভাবে এ বিষয়ে প্রচার প্রচারণা চালানো। অন্যান্য সংস্থার কাজ মনিটর করা। ইতিমধ্যে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় শিশু বিকাশ কেন্দ্র ও অটিজম কর্নারের মাধ্যমে অটিজম নির্ণয় ও তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থার-সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহও এক্ষেত্রে এগিয়ে এলে ওয়ার্কশপ, বিভিন্ন ধরনের সম্মেলন ও গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান বিনিময় করতে পারে। এতে নতুন কিছু শেখার সুযোগ থাকে। দরিদ্র পরিবারের জন্য আচরণ উপকরণ দান করলে তারা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থেকে কম ঝরে পড়বে। পরিবারের সাথে টিমের অন্যান্যদের কাজের সমন্বয় সাধনেও তারা সাহায্য করতে পারে।

এভাবে সবাই যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে এলে সমন্বিত ব্যবস্থপনা বেশি ফলদায়ক হবে। আমরা আশা করি, এভাবেই আজকের পিছিয়ে পড়া অটিস্টিক শিশুরা আগামীর সমাজে বোঝা না হয়ে সক্রিয় অংশীদারও হতে পারে।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ২য় বর্ষ, ৮ম সংখ্যায় প্রকাশিত।

কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা