মূল পাতা / প্রতিদিনের চিঠি / ভাই আমার শরীরে স্পর্শ করে

ভাই আমার শরীরে স্পর্শ করে

আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ঘটে নানা ঘটনা, দূর্ঘটনা। যা প্রভাব ফেলে আমাদের মনে। সেসবের সমাধান নিয়ে ’‘প্রতিদিনের চিঠি’ বিভাগ।  এই বিভাগে প্রতিদিনই আসছে নানা প্রশ্ন। যেগুলোর উত্তর দিচ্ছেন অধ্যাপক ডা. সালাহ্‌উদ্দিন কাউসার বিপ্লব। আমাদের আজকের প্রশ্ন পাঠিয়েছেন অমিত পাল-

প্রতিদিনের চিঠি

চিঠি

আমি ৫ম শ্রেণীর পি.এস.সি তে বৃত্তি পাই, তারপর জেলার সেরা স্কুলে চান্স পাই তাই বাড়ি ছেড়ে শহরে খালার বাসায় এসে উঠি। কয়েকমাস ভালই যায় হঠাৎ একদিন রাত্রে আমার খালাতো ভাই আমার শরীরে স্পর্শ করে যেরকম স্বামী স্ত্রীকে স্পর্শ করে, আমি হতভম্ব হয়ে যাই। মাঝেমধ্যে ও এমনটা করতো কিন্তু বিষয়টা আমি ঠিক বুঝিনি বিধায় কিছু বলিনি। আমার মধ্যে মাঝেমধ্যে মেয়েলি কিছু ব্যাপার চলে আসত যার কারণ হয়ত ও আমায় টাচ করত এরজন্যই এমনটা। ছোট বিধায় বুঝতাম না আর এভাবেই দিন যেতে থাকে, এরপর একটা জিনিস দুবার করতাম, একটা লিখা হয়ে যাওয়ার পরও আবার কেঁটে দিতাম আর এভাবেই দিন যেতে থাকে।

হস্তমৈথনু কবে থেকে শুরু করি জানিনা তবে এটা মনে আছে একসময় বীর্য বের হওয়ার সময় আমার মা,বাবা কিংবা বোনদের ছবি ভাসত এবং যার ছবি স্থির হত সে মারা যাবে এমন একটা মনোভাব তৈরি হতো আর এমন মনোভাব যাতে সত্যি না হয় তার জন্য আমি বারবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হস্তমৈথনু করতাম যাতে মন থেকে এটা চলে যায়। কিন্তু না কোনো সমাধান নেই। এরপর চিন্তা পাল্টে যায় এখন মনে হয় বাবা আমার সাথে খারাপ কিছু করবে যেমন একটা স্বামী স্ত্রীর সাথে যা করে আর এটা থেকেও বের হতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি বারবার হস্তমৈথনু করতাম। ক্লাস টেনের শেষের দিকে দূর্ভাগ্যবশত একদিন রাত্রে আমাকে ওই ভাইটি স্পর্শ করে এবং আমি ওকে বলছি অন্যদিন তকে স্পর্শ করতে দিতে হবে কিন্তু সে দেয় নাই বিধায় আমার মাথা গোলমাল শুরু হয়। এরপর এটা নিয়ে পুরোপুরি মানসিক সমস্যা তৈরি হয় আর এটা থেকে বের হওয়ার উপায় ছিল একমাত্র ওকে রিপিট দিতে হবে মানে ওকে স্পর্শ করতে হবে, কিন্তু পারি না।

অনেক দিন পর হঠাৎ মন থেকে এসব চলে যায় কিন্তু ওই সমস্যাটা আমায় ধরে বসে যে বাবা আমার সাথে খারাপ কিছু করবে। সাথে আমার পরিচিত অন্য ছেলেদের দিয়েও মনে হতো, যেটা আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না সহ্য করার। মধ্যে কিছু দিন একটা জিনিস বারবার ধোঁয়া মোছা করতাম এবং মনে হতো হচ্ছে না। এখন নতুন সমস্যা গণনা শুরু হয়েছে যেমন ১,২,৩,৪ ইত্যাদি… সব সংখ্যাই খারাপ মনে হচ্ছে আর আমি এই সংখ্যার জন্য উপরওয়ালার কাছে ক্ষমা চাইতে পারছি না তওবা করতে পারছি না, এখন ক্ষমা চাইলে এমনটা হবে তেমনটা হবে এখন হবে না তখন হবে না শুধু এসব আর মনে হচ্ছে আমি খারাপ অবস্থায় পড়ে আছি আর এটা থেকে বের হতে হলে গডের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।  কিন্তু আমি সেটা পারছি না, হাজার চেষ্টা করেও পারছি না। জীবনটা আমার শেষ,পড়াশুনা করছি না একবছর ধরে, সামনে এক্সাম আর আমার পক্ষে পড়া সম্ভব না। আমার বিন্দু মাত্র শান্তি নাই, হ্যা বিন্দু মাত্র শান্তি নাই,।সবকিছু বাদ দিয়ে আমি ভাল হতে চাই আমি সুস্থ হতে চাই আমার পক্ষে কি সম্ভব সুস্থ,স্বাভাবিক হওয়া?

 

 

উত্তর

আপনার এতো বড় লেখাটা পড়েই বোঝা যাচ্ছে আপনি বেশ  পেরেশানিতেই আছেন। আর এটা আপনি নিজেও বুঝতে পারছেন এটা আপনার মানসিক সমস্যা। আপনি কি এর জন্য কোনো ডাক্তার দেখিয়েছেন? কোনো চিকিৎসা কি নিচ্ছেন? না নিয়ে থাকলে সেটা ঠিক করেননি। আপনার অনেক আগেই চিকিৎসা নেয়া উচিত ছিলো।

আপনার রোগের নাম ‘ওসিডি’ বা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার। বাংলায় বলা হয় সুচিবাই। সুচিবাই একটা বিদঘুটে রোগ, তবে প্রয়োজনীয় এবং সঠিক চিকিৎসায় এরোগ নিয়েও সম্পূর্ণ ভালো থাকা যায় এবং সব কাজই করা যায়। এটাও ঠিক বর্তমানে আপনি ওসিডির পাশাপাশি বিষণ্ণতায়ও ভুগছেন। দুটোর চিকিৎসাই একসাথে করতে হবে।

ওসিডি রোগ বিষয়ে কয়েকটি কথা মনে রাখা দরকার। এটি শুধু আপনার জন্য না, সবারই জানা উচিত।

  • একটা চিন্তা, সেটা যেকোনো ধরনের হতে পারে- সেটা বারবার মনে আসতে থাকে।
  • আক্রান্ত মানুষটি জানে চিন্তাটি সঠিক না বা এ চিন্তার কোনো প্রয়োজন নাই- তারপরও চিন্তাটি মনে আসতে থাকে।
  • চিন্তাটি কেউ করতে চায়না। বরং বারবার সরানোর চেষ্টা করে।
  • চিন্তাটি সরাতে গিয়ে অনেকে অনেক রকম কাজ করে। কিন্তু চিন্তাটি যায়না। আবার আসে।
  • এসবের কারনে একটা কাজ বারবার করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত সবকিছুই স্লো হয়ে যায়। অথবা কাজ করা বন্ধ হয়ে যায়।

আপনার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। যৌন বিষয়ক কিছু অবাস্তব চিন্তা এবং অন্য আরো কিছু অপ্রয়োজনীয় চিন্তা বারবার এসে সব কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে আপনি ওসিডির পাশাপাশি এমন বিষণ্ণতায়ও ভুগছেন। এ রোগের চিকিৎসা যত দেরীতে শুরু হয়, ভালো হতে তত বেশী সময় লাগে। আপনি যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করেন। আপনার পরিবারের মানুষগুলোকে এই চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত করুন। আপনার বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষাও করাতে হতে পারে। আপাতত আপনি টেবলেট- রিলাফিন ৫০ মিগ্রা, সকালে একটা করে শুরু করুন। ওষুধ আরো বাড়বে। সেই সাথে আপনাকে কিছু সাইকোথেরাপীর সাহায্য নিতে হবে। চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করবেন ততই আপনার জন্য ভালো। কারন আপনার বিষণ্ণতারও চিকিৎসাও দরকার। ভালো থাকবেন।

ইতি,
প্রফেসর ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
  • চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক - মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সেকশন মেম্বার - মাস মিডিয়া এন্ড মেন্টাল হেলথ সেকশন অব 'ওয়ার্ল্ড সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন'।
  • কোঅর্ডিনেটর - সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক (পিএসসি), মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সাবেক মেন্টাল স্কিল কনসাল্টেন্ট - বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট টিম।
  • সম্পাদক - মনের খবর। চেম্বার তথ্য - ক্লিক করুন