মূল পাতা / প্রতিদিনের চিঠি / মাস্টারবেশনের স্বাভাবিক মাত্রা জানতাম না

মাস্টারবেশনের স্বাভাবিক মাত্রা জানতাম না

আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ঘটে নানা ঘটনা, দুর্ঘটনা। যা প্রভাব ফেলে আমাদের মনে। সেসবের সমাধান নিয়ে ‘প্রতিদিনের চিঠি’ বিভাগ। এই বিভাগে প্রতিদিনই আসছে নানা প্রশ্ন। যেগুলোর উত্তর দিচ্ছেন অধ্যাপক ডা. সালাহ্‌উদ্দিন কাউসার বিপ্লব। আমাদের আজকের প্রশ্ন পাঠিয়েছেন আরমান (ছদ্মনাম) –

প্রতিদিনের চিঠি

চিঠি

আমার বয়স ১৯। যখন আমার বয়স ১৪ তখন আমার প্রায় প্রতিদিনই স্বপ্নদোষ হতো। আমি ভীষণ টেনশনে পড়ে যাই। কেননা, আমি শুনেছিলাম যে স্পার্ম এর সাথে দেহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানসমূহ বের হয়ে যায়, শরীর দূর্বল হয় এবং মানুষ দ্রুত বুড়ো হয়ে যায়। আর একসময় তো আমি মাস্টারবেশন কী আবিষ্কার করে ফেলি। তবে, মাস্টারবেশন আমি চাহিদার থেকে করিনি। বরং টেনশন থেকে একটু মুক্ত থাকার জন্য করেছি, কেননা সবসময় আমার মনে হতো আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। আর যখনই মাস্টারবেশন করতাম তারপরেই বেশি করে টেনশনে ভুগতাম এটা আমি কি করলাম আমি তো দ্রুত বুড়ো হয়ে যাবো। আমি মাস্টারবেশনের স্বাভাবিক মাত্রা জানতাম না। নেটে দেখলাম মাস্টারবেশন সপ্তাহে ২-৩ বার করলে সমস্যা নেই। আমি বোধকরি সপ্তাহে ৪-৫ বারের মতো করেছি। তাই, হতাশাটা আরও বেড়ে গেলো। গত বছর ২০১৮ এর সেপ্টেম্বরে জানতে পরালাম যুক্তরাজ্য,নেদারল্যান্ডসহ কিছু ইউরোপীয় দেশে বয়:সন্ধিকালীন ছেলে-মেয়েদের দৈনিক একবার মাস্টারবেশন করতে উৎসাহিত করা হয় । আমি তখন একটু স্বস্তি পেলাম। কিন্তু, কয়েকদিনের মাঝেই আমার মনে সংশয় দেখা দিতে লাগলো যে আমি আবার সপ্তাহে ৭ বারের বেশি মাস্টারবেট করিনি তো!!! মনে মনে হিসেব করলে মনে হতো না আমি সপ্তাহে ৪-৫ বারের বেশি করি নি। কিন্তু, নিজের ওপর আস্থা রাখা সম্ভব হচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিলো, তাহলে বেশি মনে হলো কেনো। যখন মনে হতো যে না আমি অতো বেশি করিনি তখন ভালো থাকতাম। আর যখন সংশয়ে থাকি তখনকার অবস্থা অসহ্য। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে এসে থেকেই আমি আর কিছুই মনে করতে পারতেছি না বিগত ৪-৫ বছরে কি পরিমাণ মাস্টারবশন করেছি। আমার এখন মূল সমস্যা এই যে,আমার নিজেকে বুড়ো মনে হয়। কারণ দুইটি- ১.মাস্টারবেট এবং ২.টেনশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। দীর্ঘদীন ধরে প্রচন্ড টেনশনে আছি। টেনশন করলে অক্সিকেনের ওভাবে নাকি দেহের কোষগুলো মারা যায়। এছাড়াও উচ্চরক্তচাপ মাথা ব্যথা তো আছেই। আবার পত্রিকায় দেখেছিলাম যে এক ডাক্তার বলেছেন, বীর্যপাতের সাথে শরীর দূর্বল হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে,অতিরিক্ত করলে অন্ডকোষে ব্যথা হতে পারে। আবার মাথা ব্যথাও হতে পারে। কেননা এর ফলে মস্তিষ্কে সেক্স হরমোনের ঘাটতি দেখা দিবে। এরকম মাথা ব্যথাও কি বুড়ো হওয়ার কারণ হতে পারে!!!!  ফুটবল খেলতে চাইলে মনে হয় হাত-পা ভেঙ্গে যাবে,লোকের সাথে মিশতে পারি না ভয় হয়, বুড়ো লোকের মতো আবোল তাবোল যদি কিছু বলি, পড়তে বসলে মনে হয় আমি বুড়ো হয়ে গেছি আমার দিয়ে পড়াশোনা হবে না, বুড়ো বয়সে পড়াশোনা করেই বা কি করবো! সবসময় টেনশনে,ভয়ে আর ডিপ্রেশনে থাকি। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়। আবার এ কাজও করতে পারি না জাহান্নামে চিরস্থায়ী হওয়ার ভয়ে। আমাকে একটু পরামর্শ দিবেন প্লীজ।

উত্তর

তোমার সমস্যাটি জটিল নয়। এমন সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং ভালোভাবেই সম্ভব। তোমার এই লেখাতে তুমি বেশ কয়েকটি বিষয় বা সমস্যা উল্লেখ করেছো। মাস্টারবেশন, বুড়ো হয়ে যাওয়া, ফুটবল খেলতে গেলে মনে হয় হাত-পা ভেঙ্গে যাবে, লোকের সাথে মিশতে গেলে মনে হয় বুড়ো লোকের মতো আবোল তাবোল যদি কিছু বলি, পড়তে বসলে মনে হয় আমি বুড়ো হয়ে গেছি আমার দিয়ে পড়াশোনা হবে না, বুড়ো বয়সে পড়াশোনা করেই বা কি করবো। হয়তো এমন আরো কোনো বিষয় থাকতে পারে। সেইসাথে তোমার মরে যাওয়ার কথাও মনে আসে।

উপরের সবকিছু ভেবে মনে হচ্ছে, তোমার ওসিডি বা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার আছে সেইসাথে বর্তমানে বিষণ্ণতায় ভুগছো। সঠিক চিকিৎসায় এসব সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ ভালো থাকা সম্ভব। মাস্টারবেশন বিষয়েও তোমার বেশ কিছু মিসকনসেপশন আছে। সেসবও দূর করতে হবে। মাস্টারবেশন সম্বন্ধে বলতে গেলে বলতে হয়, না বেশীবার করলেও বৈজ্ঞানিক ভাবে কোনো সমস্যা হয় না। তবে মনের ভিতর যদি এই নিয়ে কষ্ট বা চিন্তা তৈরী হয় তখন সেটা একটা বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাড়ায়। কখনো বিষণ্ণতাও পেয়ে বসে, তোমার মনে হয় সেটাই হয়েছে। আর অন্য যেসব বিষয় তোমার মনে বারবার আসছে সেসব তুমি কতটুকু বিশ্বাস করো সেটা জানা দরকার ছিলো। যদি মনে হয় এসব হচ্ছে, কিন্তু তোমার মনের ভিতর থেকে এসব চিন্তাকে সঠিক মনে না হয় বা সঠিক মনে হয়, তার জন্য দুইভাবে চিকিৎসা সাজাতে হবে। তাই তুমি সরাসরি দেখা করতে পারলেই ভালো হয়। আপাতত ক্যপসুল – প্রোলার্ট ২০ মিগ্রা, একটা করে সকালে নাস্তার পর। এবং টেবলেট পেইজ ০.৫মিগ্রা, সকালেও রাতে অর্ধেক করে খেতে পারো। আমি অনুরোধ করবো যতদ্রুত সম্ভব সরাসরি কোনো একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করার জন্য। পুনরায় তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, তোমার সমস্যা সমাধানযোগ্য এবং  যত দ্রুত তুমি চিকিৎসার আওতায় আসবে ততই ভালো।

**দ্রষ্টব্য: প্রতিদিনের চিঠির সকল উত্তর কেবল প্রাথমিক পরামর্শ হিসেবে দেওয়া হয়।  চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাতে চূড়ান্ত পরার্মশ  নিন।

ইতি,
প্রফেসর ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
  • চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক - মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সেকশন মেম্বার - মাস মিডিয়া এন্ড মেন্টাল হেলথ সেকশন অব 'ওয়ার্ল্ড সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন'।
  • কোঅর্ডিনেটর - সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক (পিএসসি), মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সাবেক মেন্টাল স্কিল কনসাল্টেন্ট - বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট টিম।
  • সম্পাদক - মনের খবর। চেম্বার তথ্য - ক্লিক করুন