মূল পাতা / প্রতিদিনের চিঠি / আমি নিঃসঙ্গতা দূর করতে চাই

আমি নিঃসঙ্গতা দূর করতে চাই

আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ঘটে নানা ঘটনা, দুর্ঘটনা। যা প্রভাব ফেলে আমাদের মনে। সেসবের সমাধান নিয়ে ‘প্রতিদিনের চিঠি’ বিভাগ। এই বিভাগে প্রতিদিনই আসছে নানা প্রশ্ন। যেগুলোর উত্তর দিচ্ছেন অধ্যাপক ডা. সালাহ্‌উদ্দিন কাউসার বিপ্লব। আমাদের আজকের প্রশ্ন পাঠিয়েছেন আইয়ূব আলী (ছদ্মনাম) –

 

প্রতিদিনের চিঠি

চিঠি

আমার বয়স ২৭ বছর। ওজন ৫২কেজি। আমি জন্মথেকেই শ্রবণ প্রতিবন্ধী ও কথা বলতে পারি না। ৭ বছর বয়সে কথা বলতে শুরু করি। ২০০৩ সাল থেকে কানের মেশিন ব্যবহার করি। ছাত্রজীবনে আমি ভাল ছাত্র ছিলাম। ২০১০ সাল পর্যন্ত আমার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা ছিল না। ২০১১ সালে আমি অনেক দূরে চিটাগাং সরকারি বিএসসি ইনজিনিয়ারিং ভর্তি হই। কিন্তু আমি অনেক দূরে ভর্তি হতে চাই না,মা-বাবার পীড়াপীড়িতে ভর্তি হই। ওখানে ভাষাগত সমস্যা ও কানে শুনতে না পারার কারণে থাকতে পারি নি।পরের বছর ২০১২ সালে বাড়ির কাছে মানবিক বিভাগে ডিগ্রী ভর্তি হই। এখন মাসটার্স করছি। আমার পড়াশুনা প্রায় শেষের দিকে,কিন্তু পড়াশুনা শেষ হওয়ার পর ভবিষ্যতে কি করব, কিভাবে জব করব, কিভাবে বাঁচব এসব নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করি। আমার আত্মীয় স্বজন আমাকে চাকরি করতে বলে। কিন্তু আমি চাকরি করতে ভয় পাই। কারণ আমি ঠিকমত শুনতে পারি না, মোবাইলের যোগাযোগ করতে পারি না। আমি দুই কানে কিছুই শুনতে পারিনা, এজন্য দামি মেশিন ব্যবহার করি,কানের মেশিন ব্যববহার করলেও আমি ঠিকমত শুনতে পাই না,খালি শব্দ শুনতে পাই শতকরা ৮০% কথা বুঝতে পারি না। কেউ আমাকে কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারে না এমনকি ঘনিষ্ঠজনরাও সাহায্য করে না। আমি পিতামাতার একমাত্র ছেলে।আমার পিতা হাইস্কুলের শিক্ষক। আমি কৃষিকাজ করি,কৃষিকাজ করেও আমি ঠিকমত বিক্রি করতে পারি না,ঠকতে হয়, কারণ আমি শুনতে পারি না,ক্রেতার সাথে বোঝাপড়া করতে পারি না এজন্য দুশ্চিন্তা  করি। আমার কোন বন্ধু নেই। আমি নিঃসঙ্গ, সবসময় একাকি থাকি, এজন্য মাথায় দুশ্চিন্তা  ভর করে। আমার যৌন আসক্তি  রয়েছে, মাঝেমাঝে হস্তমৈথুন করি। এজন্য আমার শরীর খারাপ থাকে, ওজন বাড়ে না। আমার মূল সমস্যা হচ্ছে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করা, কি করব,কি করব না। কোথাও যাওয়ার চিন্তা করি তাহলে যাওয়ার আগের রাতে আমার ঘুম হারাম হয়ে যায়। মনের মধ্যে অজানা একটা ভয় কাজ করে, মাঝে মাঝে বুক ধড়ফড় করে,কথা বলতে গেলে মুখ আটকে যায়। ঘুমাতে গেলে ঘুম আসে না,ঘুমানোর সময় অকারণে নানান চিন্তা মাথায় আসে। মাথায় কোন চিন্তা ঢুকলে আর বের হতে চায় না। আমি খুঁতখুঁতে লোক, একই কাজ বারবার করি। ঘুমের মধ্যে পা নাড়াচাড়া না করলে ঘুম আসে না। এটা ২০১২ সাল থেকে হয়ে আসছে। আমি নিঃসঙ্গতা দূর করতে চাই। মনে কোন শান্তি পাই না। কি ওষুধ খেলে সব ধরনের দুশ্চিন্তা, বুকধড়ফড় করা, মনের ভয় দূর করতে পারি এজন্য ভালভাবে ওষুধ লিখে দিবেন যাতে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারি। আমি ২০১২ থেকে frenxit, cloron,indever tab. খেয়ে আসছি। ওষুধগুলো খেলে আমার ঘুমঘুম ভাব হয়। এখন কোন ওষুধ খাই না।

উত্তর

আপনার চিঠি পড়ে একদিকে ভালো লাগলো অন্যদিকে কিছুটা কষ্টও অনুভব করলাম। কষ্ট অনুভব করলাম আপনার শ্রবণপ্রতিবন্ধীতা এবং আপনার ব্যক্তিগত ভোগান্তির জন্য। সেই সাথে এটা নিয়ে ভবিষ্যত চিন্তা, পরিবার সহ সমানের জীবনের কথা যেভাবে ভাবছেন সেটা নিয়ে।

প্রথমেই আসি ভালোলাগার বিষয়টি নিয়ে, আপনি আপনার জন্মথেকে বড় একটা সমস্যা নিয়েও যেভাবে এতদূর এগিয়েছেন, সেটাইতো বিরাট বিষয়। আপনি দেখাচ্ছেন এবং দেখিয়ে যাচ্ছেন আপনি পারেন। বর্তমানে আপনি মাস্টার্স করছেন, এটাইতো বিরাট একটা বিষয়। কিছু কিছু সমস্যা বা বিষয় শুনতে না পাওয়া আপনি বেশী কষ্ট পাবেন না। চারদিকে তাকিয়ে দেখুন অনেক স্বাভাবিক মানুষও আপনার মতো এতোকিছু করতে পারেন না। আপনার বাবা-মাও আপনাকে নিয়ে গর্ব করতে পারেন।

যৌন সমস্যা নিয়ে এখানে আপনাকে নতুন করে কিছু বলতে চাইনা। আপনার মতো সমস্যা এবং এসব নিয়ে মনের খবরে এর আগে অনেক লেখা ছাপানো হয়েছে, আপনি সেসব পড়ে নিতে পারেন। আশাকরি আপনি সঠিক জবাব পেয়ে যাবেন। আর চাকরী এবং ভবিষ্যত চিন্তা নিয়ে আপনাকে একটা তথ্য দিতে পারি। প্রতিবন্ধীদের জন্য বর্তমানে অনেক সংগঠন কাজ করে। আপনাদের চট্টগ্রামেও কয়েকটি সংগঠন আছে, আপনি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁরা আপনাকে কাজ, চাকরী, ভবিষ্যত পরিকল্পনা এমনকি আরো যদি বিশেষ ট্রেনিং এর দরকার হয়, সেসব বিষেয়ে আরো সঠিক তথ্য এবং দিক নির্দেশনা দিতে পারবেন।

আপনি কিছু মনে করবেন না। অনেক শ্রবণপ্রতিবন্ধী যারা একটুও কানে শুনেন না, তাদেরওতো অনেক বন্ধুবান্ধব থাকে, তারাও তো অনেকের সাথে মিশে, আড্ডা দেয়। আমার মনে হয় আপনি একা না থেকে যেভাবেই হোক মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করবেন। ওষুধের বিষয়ে বলছি, সরাসরি দেখা করে ওষুধ নিলেই ভালো। তবে আপাতত ট্যাবলেট আরপোলাক্স ২০ মিগ্রা সকালে একটা নাস্তার পর, সেইসাথে ক্লোরন .৫ মিগ্রা- সাকালে ও রাতে অর্ধেক করে খেতে পারেন।

সবশেষ কথা হলো, আপনি জীবনে অনেক দূর এগিয়েছেন। অনেক ভালো করছেন এবং করবেন। হতাশা কাটাতে হবে। বিষণ্ণতার চিকিৎসা নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক চিন্তার ভিতর ফিরে আসুন। নিজের যোগ্যতোকে কাজে লাগান। জীবনে খুব বেশী কিছু চাইতে নাই। যে এতদূর আসতে পেরেছেন, তার দ্বারা অনেক কিছুই করা সম্ভব। সুন্দর ভবিষ্যত কামনায়।

ইতি,
প্রফেসর ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
  • চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক - মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সেকশন মেম্বার - মাস মিডিয়া এন্ড মেন্টাল হেলথ সেকশন অব 'ওয়ার্ল্ড সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন'।
  • কোঅর্ডিনেটর - সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক (পিএসসি), মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সাবেক মেন্টাল স্কিল কনসাল্টেন্ট - বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট টিম।
  • সম্পাদক - মনের খবর। চেম্বার তথ্য - ক্লিক করুন