মূল পাতা / মাদকাসক্তি / চিকিৎসায় পিছিয়ে মাদকাসক্ত নারী

চিকিৎসায় পিছিয়ে মাদকাসক্ত নারী

কেস হিস্ট্রি : মেয়েটির বয়স ১৮ থেকে ১৯-এর মাঝামাঝি। মা সাথে করে নিয়ে এসেছেন। যমজ দইু মেয়ের মাঝে ছোট এই মেয়েটি গত ৫ বছরে একের পর এক মাদকে আক্রান্ত হয়েছে। নেশার পথে পতনের যাত্রা শুরু গাঁজা দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে যুক্ত হয়েছে একে একে ঘমের ঔষধ, ইয়াবা, বিয়ার, মদ ইত্যাদি। যার এখন কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়ায় থাকার কথা ছিল, নেশার কারণে সে এখনো আটকে আছে ক্লাস নাইনে। নেশার জন্য তার প্রতিদিনের প্রয়োজন কমপক্ষে দেড় হাজার থেকে দু হাজার টাকা, যা সে বেশির ভাগ দিন মায়ের কাছ থেকে নানা কৌশল অবলম্বন করে আদায় করে। মিথ্যা বলে, গোপনে বাসার জিনিস বিক্রি করে বা বন্ধক রাখে। এর ওর কাছে নানারকম অজহাতে টাকা ধার নেয়, কখনো বা ‘টাকা না দিলে আমি আত্মহত্যা করব’ এমন হুমকি দেয়। নেশার টাকার জন্য আর কী করে জিজ্ঞেস করলে সে একবার চকিত চোখে চেয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। তারপর একবার মায়ের দিকে তাকায়, আরেকবার কোনো দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে রাখে। বোঝা যায়, টাকার জন্য সে এমন কিছু করে যা এই মহু র্তে সরাসরি বলতে তার তীব্র অস্বস্তি হচ্ছে।

তার মায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, নেশার জন্য টাকা না পেয়ে অথবা অন্য কোনো পারিবারিক অথবা ব্যক্তিগত কারণে সে প্রায়ই অস্বাভাবিক রাগ করে, চিৎকার করে, মোবাইল, বাসন-কোসন যা হাতের কাছে পায়, পরিণাম চিন্তা না করেই ভেঙে ফেলে। বছরখানেক ধরে সপ্তাহে প্রায় দ-তিনবার করে ব্লেড দিয়ে নিজেই নিজের হাত কাটে। ফুল-স্লিভ জামার হাতা একটু গোটালে চোখে পড়ে তরকারি কাটার বোর্ডের মতো হাতজড়ে অসংখ্য শুকিয়ে যাওয়া কাটার দাগ, মাঝে গোটা তিনেক সমান্তরাল সাম্প্রতিক ক্ষত, মনে হয় দিন দুয়েকের পুরোনো।

মেয়েটি গত তিন ধরে বাড়ির বাইরে যাচ্ছে না, মানে কোনো ইয়াবাও নিচ্ছে না। তবে তার তীব্র কষ্ট হচ্ছে। ঘুম আসছে না, চরম অস্থির লাগে, রাগ ওঠে, কোনো কিছুই ভালো লাগে না। সে অন্তত এই মহু র্তে বঝতে পারছে যে- সে স্বাভাবিক নেই, তার চিকিৎসা দরকার। ‘মাদকাসক্ত’ এই শব্দটি দেখা, শোনা বা পড়া মাত্র সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু ছবি আমাদের মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। তাতে কারো চুল থাকে উশকোখশকো, পরনে ময়লা কাপড়, স্বাস্থ্যের অবস্থা একেবারে যা-তা, চোখগুলো লাল-লাল, গর্তে ডেবে গেছে, রাস্তার একপাশে ঝিম মেরে বসে আছেন কি কুজো হয়ে বিভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিংবা টলোমলো পায়ে হাঁটছেন ইত্যাদি। নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ভেদে এইসব বর্ণনার একটু এদিক-সেদিক হলেও প্রায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে বিষয়ে সাধারণ মিল দেখা যাবে সেটা হলো-বর্ণিত বৈশিষ্ট্যের চরিত্রটি অতি অবশ্যই একজন পুরুষ।

‘মাদকাসক্ত’ এই শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে লিঙ্গনিরপেক্ষ হলেও সাধারণ ধারণার এই বৈষম্য একেবারে অকারণ নয়। পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে মোটা দাগে মাদকাসক্ত জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের দু ভাগ পরুষ আর একভাগ নারী। নেশার রাজত্বে পরুষদের অংশীদারিত্ব আশির দশকে ছিলো নারীদের দ্বিগুণেরও বেশি। সময়ের সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে সমাজের, অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রের সাথে সাথে এক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে এই বৈষম্য কমছে। ২০১৪ সালে আমেরিকার গবেষণা অনযায়ী ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় ৫.৮ মিলিয়ন নারী ২০১৩ সালে অবৈধ মাদকদ্রব্য ব্যবহার করেছেন এবং এই হার ক্রমবর্ধমান।

নারীরা পরুষদের তুলনায় ভিন্নভাবে মাদকদ্রব্য ব্যবহার করেন তো বটেই, মাদকদ্রব্যগুলোও নারীদের শরীরে ভিন্নভাবে শোষিত হয় এবং প্রতিক্রিয়া দেখায়। যেমন ধরা যাক, পরিমাণের দিকে। যে পরিমাণ অ্যালকোহল, হেরোইন কিংবা মেথঅ্যাম্ফিটামিন (ইয়াবা, মেথঅ্যাম্ফিটামিন, ক্যাফেইনের অজানা অনপাতের মিশ্রণ) একজন পরুষের শরীরে বিষাক্তমাত্রা তৈরি করে বা তাকে নির্ভরশীল করে তোলে নারীদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণটা তুলনামলকভাবে কম। আরেকভাবে দেখতে গেলে, মাঝে মাঝে ব্যবহারকারী থেকে বাধ্যতামলক নিয়মিত ব্যবহারকারীতে পরিণত হতে পরুষদের যতটা বা যতদিন সময় লাগে নারীদের ক্ষেত্রে তা ঘটে অনেক দ্রুত। অর্থাৎ কোনো পরুষের ক্ষেত্রে মাদক গ্রহণ বছরে ১/২ বার থেকে সপ্তাহে ৩/৪ বারের মতো বাধ্যতামলক আসক্তিতে পৌঁছতে যদি এক বছর সময় নেয় একজন নারীর ক্ষেত্রে তা ঘটে যাবে মাস দুয়েকের মধ্যে। মাদক গ্রহণ কেন করেন সেখানেও আছে নারীর সাথে পরুষদের পার্থক্য। পরুষদের ক্ষেত্রে মাদক নেয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে মজা করা, আনন্দ পাওয়া অন্যতম হলেও নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে প্রধান কারণ তা নয়। আবেগীয়, শারীরিক, যৌন নির্যাতনের কষ্ট থেকে বাঁচা, নিজের কাছে নিজেকে যে ভালো লাগে না এই কষ্ট থেকে বাঁচা কিংবা নিজেকে আরো শুকনো- পাতলাভাবে উপস্থাপন করা ইত্যাদি।

আর সমাজ তার বিভিন্ন অস্ত্র যেমন আড্ডা, অফিস, বাসা, প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপন, সিনেমা ইত্যাদি দিয়ে নারীকে তো প্রতিদিন বলছেই, তুমি যদি ফর্সা না হও, হালকা পাতলা না হও, ঠিক অত সংখ্যার শরীর যদি তোমার না থাকে তো তুমি আর ভালোবাসার যোগ্য না। গবেষণা থেকে দেখা যায় শৈশবে যৌন নির্যাতনের ইতিহাস থাকলে, মা-বাবার কারো মাদকাসক্তির সমস্যা থাকলে পরিণত বয়সে সেসব নারীর মাঝে মাদকাসক্তির হার সাধারণ নারীদের তুলনায় বেশি। এসবের পাশাপাশি সুঁইয়ের মাধ্যমে মাদকাসক্ত নারীদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রে আসক্ত সঙ্গী দেখা যায় যার মাধ্যমে বা প্ররোচনায় প্রথম নিয়েছে এবং আসক্ত হয়ে পড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনযায়ী মাদকে আসক্তি একটি মানসিক রোগ- আমরা সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে বা গায়ের জোরে যতই সেটাকে অপরাধ বলে চালাতে চাই না কেন। আই.সি.ডি ১০-এর ৫ম চ্যাপ্টারের অন্তর্গত এই মানসিক রোগটি বেশিরভাগক্ষেত্রে একা আসে না। কখনো অন্য আরো এক বা একাধিক মানসিক রোগের যথাসময়ে চিহ্নিতকরণ এবং চিকিৎসা না হওয়ার ফলাফল হিসেবে, কখনোবা মাদকাসক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে আরো কিছু মানসিক রোগ হতে পারে।

যেমন ধরা যাক, বিষণ্ণতা, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, বাই-পোলার, প্যানিক ডিজঅর্ডার, ফোবিয়া, পি.টি.এস.ডি, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি মানসিক রোগের অথবা মানসিক, শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের বিষয়টি দ্রুত চিহ্নিত করে চিকিৎসা না করতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা নিজেই নিজের কষ্ট কমাতে মাঝে মাঝে মাদক নিতে নিতে দ্রুতই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। আবার উল্টোভাবে মাদকে আসক্তির কারণেও নারীদের মাঝে সমবয়সী অন্যান্য নারীদের তুলনায় অনেক বেশি অন্যান্য মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে, যেমন: বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, বাই-পোলার, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি। মাদকের প্রত্যক্ষ বিষক্রিয়া থেকে মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যু ঘটে মাদকের পরোক্ষ কারণে ঘটা আত্মহত্যার মাধ্যমে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অনাগত শিশুটির জন্মের সময় মায়ের গ্রহণ করা মাদকের অনরূপ প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ, কৈশোরে-যৌবনে অতিচঞ্চলতা, বদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা থেকে মাদকাসক্তি ইত্যাদি সবকিছুরই সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেকগুণ।

একবার মাদকাসক্ত হিসেবে একজন নারী চিহ্নিত হয়ে গেলে পরুষদের তুলনায় নারীদের চিকিৎসা গ্রহণ করা বা পাওয়া দু দিকেই অনেকটা পিছিয়ে আছেন। এমনটা শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা নয়, একই ব্যাপার আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও। আমেরিকার মোট মাদকাসক্ত জনগোষ্ঠীর তিন ভাগের একভাগ নারী হলেও চিকিৎসা গ্রহণের বেলায় তা মাত্র পাঁচ ভাগের একভাগ। মাদকাসক্তি সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভাব, সামাজিক অনশাসন, মানসিক রোগ এবং মাদকাসক্তি বিষয়ে স্টিগমার কারণে আক্রান্ত নারী ও তাঁর পরিবার বিষয়টি যথাসম্ভব গোপন করার চেষ্টা করেন। বছর কয়েক পরে যখন প্রায়ই অস্বাভাবিকরকম রাগ, চিৎকার, মোবাইল ভাঙা, ব্লেড দিয়ে নিজেই নিজের হাত কাটা, বারবার টাকা চাওয়া, আত্মহত্যার হুমকি দেয়া, বাড়ির বাইরে রাত কাটানো, পরিবারের অন্যদের গায়ে হাত তোলা ইত্যাদি ঘটতে থাকে তখন পরিবার হন্তদন্ত হয়ে খুব অসহায়ভাবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে আসেন। তাঁদের মাঝে প্রায়ই খুব অধৈর্যভাব দেখা যায়। চেনা-জানা আর কেউ তাঁদের দেখে ফেললেন কিনা, দেখে ফেললে কী হবে, শুধমাত্র এই মেয়ের জন্য তাঁদের কতোটা কষ্ট হয়েছে, তারা আর সমাজে মুখ দেখাতে পারছেন না ইত্যাদি বিষয়ে তাঁরা এতোটা বেশি আচ্ছন্ন থাকেন যে রোগীর কষ্টের দিকটিই হারিয়ে যায়।

বৈজ্ঞানিকভাবে মাদকাসক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি পুনঃপতনশীল মস্তিস্কের রোগ, যার চিকিৎসাও দীর্ঘমেয়াদি। চিকিৎসায় সস্থতা অর্জনের নাম এই রোগের ক্ষেত্রে ‘কিওর’ বা ‘নিরাময়’ নয়, ‘রিকভারি’ বা ‘পনরুদ্ধার’ যা শুধু অর্জন করলেই হয় না, আজীবন তা ধরে রাখতে হয়, চর্চা চালিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে আরো যে বিষয়টি প্রায় সময়ই আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় যে, মাদকাসক্তি রোগের বেলায় রিকভারি বিষয়টি শুধু তার নিজের জন্য নয় তার পরিবার, আপনজনদের বেলায়ও সমানভাবে প্রযোজ্য। দীর্ঘমেয়াদি এই দিকটি মাথায় রেখে, সমাজের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে  ‍খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আপনার মাদকাসক্ত আপনজনকে দ্রুত চিকিৎসায় অন্তর্ভুক্ত করুন এবং সঙ্গী হোন তাঁর জীবনের জয়যাত্রায়।

লেখক: ডা. মো. রাহেন ইসলাম
এম.ডি (সাইকিয়াট্রি), আবাসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ,কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, তেজগাঁও, ঢাকা