মূল পাতা / মাদকাসক্তি / মাদকাসক্তি কেন মানসিক রোগ?

মাদকাসক্তি কেন মানসিক রোগ?

রোগ বলতে আমরা সাধারণত ‍বুঝি শরীরের যে-কোনো অংশ, অঙ্গ বা তন্ত্রের স্বাভাবিক গঠন বা কার্যক্রমের পরিবর্তন যা নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ ও লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায় বা শনাক্ত করা যায়।

হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির যেমন হৃৎপিন্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তেমনি মাদকাসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবর্তন হয় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম। গবেষণায় দেখা গেছে, রোগাক্রান্ত হৃৎপিন্ড যেমন সুস্থ হৃৎপিন্ড থেকে ভিন্ন, তেমনি আসক্তিমুক্ত মস্তিষ্কের থেকে আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কও বায়োলজিক্যালি ভিন্ন। ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং (এমআরআই), পজিট্রন ইমিশন টোমোগ্রাফি স্ক্যান (পিইটি), সিঙ্গেল ফোটন ইমিশন কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি (এসপিইসিটি) প্রভৃতি ইমেজিং পরীক্ষায় এভিন্নতা স্পষ্ট হয়।

এছাড়া অন্যান্য শারীরিক দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বংশগতি-পরিবেশ-জীবনধারা যেমন- রোগের প্রকাশ এবং বিকাশে ভূমিকা পালন করে, তেমনটি ঘটে মাদকাসক্তিতেও। গবেষণায় দেখা যায়, নিকোটিন, মদ ও অন্যান্য মাদকে ব্যক্তির আসক্ত হওয়ার ঝুঁকির প্রায় পঞ্চাশ শতাংশই নির্ভর করে তার জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর।

এসব কারণে মাদকাসক্তি একটি রোগ বলেই স্বীকৃত। সর্বপ্রকার রোগ বিষয়ক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রেণিবিভাগ ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজেজ এবং আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন-এর মানসিক রোগের শ্রেণিবিভাগ ও -এর সর্বশেষ সংস্করণ অনুযায়ী, যেকোনো মাদকাসক্তিই এক ধরনের মানসিক রোগ।

অতীতে মাদকাসক্তিকে চারিত্রিক বা নৈতিক দুর্বলতা বা দোষ হিসেবেই গণ্য করা হতো এবং ‘চিকিৎসা’ ছিল শাস্তিমূলক বন্দিজীবন। নানা গবেষণায় ধীরে ধীরে এই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা- পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে এবং আরো উন্নত ও কার্যকর চিকিৎসা-পদ্ধতি উদ্ভাবনের গবেষণা চলছে অবিরাম। এরই প্রেক্ষিতে আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ মাদকাসক্তির কার্যকর চিকিৎসার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে এবং সে নীতিমালা অনুসরণ করেই মাদকাসক্তির চিকিৎসা চলছে আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা উন্নত দেশে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো একক চিকিৎসা-পদ্ধতি সব আসক্ত ব্যক্তির জন উপযুক্ত নয়। ব্যক্তির পরিবর্তনশীল চাহিদা বা প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে হবে এবং প্রয়োজনে এর পরিবর্তন করতে হবে। আসক্ত ব্যক্তির মাদক ব্যবহার ছাড়াও মাদক- সংশ্লিষ্ট শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, বৃত্তিমলক ও আইনগত বিভিন্ন সমস্যা বা প্রয়োজন থাকতে পারে, কার্যকর চিকিৎসায় এর সবগুলো দিকেই লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। মাদকাসক্তির সাথে অন্যকোনো মানসিক রোগ যেমন থাকতে পারে তেমনি আসক্ত ব্যক্তির এইডস, হেপাটাইটিস, যক্ষাসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও রয়েছে। চিকিৎসার কার্যকারিতার জন্য পর্যাপ্ত সময় চিকিৎসায় থাকতে হবে। গবেষণা অনুযায়ী, কমপক্ষে তিন মাস চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট না থাকলে অধিকাংশ ব্যক্তিরই তাৎপর্যপূর্ণ কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হয় না। আসক্ত ব্যক্তির দৃঢ় প্রেষণা বা মোটিভেশন চিকিৎসার ফলাফলকে ত্বরান্বিত করে, তবে চিকিৎসার কার্যকারিতার জন্য আসক্ত ব্যক্তির স্বেচ্ছায় চিকিৎসায় আসাটা জরুরি নয়।

নীতিমালা অনুযায়ী, মাদকাসক্তি থেকে ‘রিকভারি’ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং ঔষধ, কাউন্সেলিং (একক বা দলগত), আচরণগত থেরাপি প্রভৃতি কার্যকর চিকিৎসার অন্যতম উপাদান। ‘রিকভারি’ প্রক্রিয়ায় একাধিকবার বিচ্যুতি ও পুনরায় মাদকে আসক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়া কোনো সমাধান নয়। মাদকাসক্তির সাথে অন্যান্য মানসিক রোগও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাদকাসক্তির কারণে যেমন আসক্ত ব্যক্তির অন্য কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তেমনি আগে থেকেই অন্যকোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মাদকে আসক্ত হওয়ার হারও স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তির আত্মহত্যা-প্রবণতাও অন্যদের চেয়ে বেশি। এসব কারণে মাদকাসক্তি চিকিৎসার প্রারম্ভিক পর্যায়েই ব্যক্তির অন্যকোনো মানসিক রোগ আছে কি না তা পরীক্ষা ও নির্ণয় করা এবং তদনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অনেকক্ষেত্রেই মাদকাসক্তি এবং অন্য মানসিক রোগ যেমন : বিষণ্ণতা, উদ্বেগজনিত রোগ, সিজোফ্রেনিয়া বাইপোলার ডিজঅর্ডার ব্যক্তিত্ব-বৈকল্য প্রভৃতির চিকিৎসা একই সাথে করা জরুরি।

একজন ব্যক্তি যখন আসক্ত থাকে, সে-সময় ভালো- মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, লাভ-ক্ষতি বোঝার মতো অবস্থায়সে থাকে না। মাদক তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিচার- বিবেচনা বোধ কেড়ে নেয়। অথবা বুঝতে পারলেও মাদকাসক্তির ফলে নির্দিষ্ট সময় মাদক না নেয়ায় অসহ্য শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়া হওয়ার কারণে সে নিজেকে মাদক থেকে দূরে রাখতে পারে না। এ কারণে কাউন্সেলিংয়ের প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে মাদকমুক্ত হওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা, চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা। কিন্তু এ পর্যায়ে শুধু কাউন্সেলিংয়ে মাদক থেকে দূরে থাকা সম্ভব না-ও হতে পারে। নির্দিষ্ট সময় মাদক না নেয়ায় যে শারীরিক-মানসিক প্রতিক্রিয়া হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘উইথড্রল ইফেক্ট এবং মাদকসেবীদের ভাষায় ‘ব্যাড়া ওঠা’ বলা হয়, তা নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক সময় ঔষধের প্রয়োজন হয়। বাড়িতে যদি ব্যক্তিকে নজরদারিতে রাখা যায় এবং ধারে-কাছে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকে, সেক্ষেত্রে বাসায় রেখেও উইথড্রল ইফেক্টের চিকিৎসা করা যায় কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, উইথড্রল ইফেক্টে যে ধরনের উপসর্গ দেখা যায়, তাতে অভিভাবকরা ভীত হয়ে পুনরায় মাদকের পথে সন্তানকে ছেড়ে দেন অথবা উপসর্গের ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের উপস্থিতির প্রয়োজন হয়। আবার বাসায় ভালোভাবে নজরদারি করা সম্ভব হয় না বলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি বাইরে গিয়ে অথবা না গিয়েও কৌশলে বাসায় বসেই মাদক জোগাড় করে নেন।

সে কারণে প্রাথমিকভাবে কোনো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি রাখার সিদ্ধান্তের ব্যাপারটি সামনে চলে আসে। প্রাথমিকভাবে এই ভর্তির উদ্দেশ্য তাকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং সেসময় উইথড্রল ইফেক্ট ম্যানেজ করা। মাদকের ধরনভেদে সপ্তাহ থেকে মাসের ভেতর শরীর থেকে স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক নিয়মেই মাদকের উপাদান বেরিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটিকে ডিটক্সিফিকেশন বলা হয়। এই ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়া মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এটিই মাদক চিকিৎসার শেষ নয়, কেবল শুরু বলতে পারেন। নিয়মিত মাদক সেবনের তীব্র প্রভাবটি কেটে যাওয়ার পর মূল কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসন কর্মকান্ডের শুরু হয়। যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন, শরীর থেকে মাদক বেরিয়ে গেলেও তাদের মস্তিষ্কে মাদকের ক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন হয়ে থাকে, যার কারণে তাদের আবারো মাদক নেয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ডিটক্সিফিকেশনের পর মাদক থেকে দূরে থাকা এবং শারীরিক-মানসিক- সামাজিক-আত্মিক তথা সার্বিক উন্নতির পথে থাকা ব্যক্তির জন্য এক প্রকার যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধে তার একার প্রচেষ্টায় জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ ব্যাপারে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিদ, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, সোশ্যাল ওয়ার্কার, মিউচুয়াল সেল্ফ-হেল্প গ্রুপসহ সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় জড়িত পেশাজীবীদের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনেরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।