মূল পাতা / মাদকাসক্তি / প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে মাদক আর মাদকাসক্তি

প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে মাদক আর মাদকাসক্তি

মাদকে আসক্তি আর জীবনে প্রথমবার ব্যবহার সমার্থক নয়। জীবন জুড়ে দু-একবার ব্যবহার করেন যতজন, ততজন নিয়মিত বাধ্যতামূলক ব্যবহারকারীতে পরিণত হন না। জীবনে প্রথমবার মাদক ব্যবহার করার অজ্রস কারণ আছে। আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে কৌতূহল, বন্ধুদের চাপ, মন খারাপ ভাব, আরো ভালো লাগার অনভূতি পাওয়া কিংবা দু:খ ভোলার প্রচেষ্টা হিসেবে মানুষ জীবনে প্রথমবারের মতো মাদক নেন।

আবার পুরুষ এবং মহিলাভেদে এই কারণের বেশ পার্থক্য আছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা যায় আরো বেশি আনন্দ লাভ, বন্ধুদের সঙ্গ এবং গ্রহণযোগ্যতা প্রধানতম কারণ। মহিলাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় নিজেদের জীবনের বিভিন্ন দুর্ঘটনা, নির্যাতন (শারীরিক, মানসিক, যৌন) পরবর্তী উদ্বেগ সামলাতে নিজেই নিজেকে প্রেসক্রাইব করা ঔষধের মতো ব্যবহার করতে গিয়ে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন।

বিশ্বায়নের কারণে আমাদের সমাজ অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। পূর্ববর্তী নিরাপত্তামূলক যেসব রক্ষকবচ ছিল তাও একে একে বিলীন হয়ে গেছে। যে কারণে একজন মেয়ে শিশু কিংবা নারী কোনোরকম নির্যাতনের সম্মুখীন হলে সামাজিক সুরক্ষাটা আর সেভাবে পায় না বলে অনেক ক্ষেত্রেই সে চেপে যায়, গোপন করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। একদিন পরোক্ষভাবে প্রকাশিত হয় মাদকে আসক্তি দিয়ে।

ওজন কমিয়ে নিজেকে হালকা-পাতলা করা বা রোগা দেখানো মেয়েদের মাদকে আসক্তির আরেকটি বেশ শক্তিশালী কারণ। কেননা বর্তমান সমাজ মেয়েদের মনে একজন প্রমিত স্মার্ট নারীর যে চিত্র তৈরি করে দিয়েছে যার আছে আদর্শ ফিগার, ফর্সা ত্বক। কারো এসব না থাকলে তারা নিজের অজান্তেই হীনমন্য ভাবতে থাকেন, যার হাত ধরে আসে হতাশা এবং যতদ্রুত সম্ভব শটকার্টে স্লিম থাকার সহজ সমাধান হিসেবে আসে ইয়াবা।

এখনকার সময়টা হচ্ছে চরম প্রতিযোগিতার। দিন নেই রাত নেই সবাই যেন উর্দ্ধশ্বাসে ছুটছে। যে যেখানে আছে সে যেন সন্তুষ্ট নয়। কে কাকে মাড়িয়ে আগে উঠে যাবে এই নিরন্তর ইঁদুর দৌড়ে বন্ধু আর বন্ধু থাকছে না হয়ে উঠছে প্রতিদ্বন্দ্বী। বাবা-মা আর শুধু বাবা-মা থাকছেন না, একেকজন যেন হয়ে উঠছেন হিসেবি বিনিয়োগকারী-যেন সন্তানের জন্য এত টাকা খরচ করলাম, এই হারে এত বছরে এত টাকা, পরীক্ষার নম্বার, গানের অমুক নম্বার ওয়ান হয়ে সন্তানকে সুদে-আসলে ফেরত দিতে হবে। ফলাফল হচ্ছে আমাদের নিজেদের মাঝে স্বাভাবিক যোগাযোগের সেতুগলো ভেঙে যাওয়া।

চোখের সামনে স্মার্ট ফোন ঝুলিয়ে আমরা দিন পাড়ি দিচ্ছি একবারে অসচেতনভাবে। এখন চার জন কোথাও বসলেই চোখে পড়বে, সবাই যার যার মতো মাথাটা ঝুকিয়ে ফোনে ব্যস্ত-খাওয়া, কথাবার্তা সব যেন হাতের এই ভার্চুয়াল দুনিয়াটার পরের ব্যাপার। শখ করে ব্যবহার করতে করতে অনেকে নিজেদের দৈনন্দিন কাজের চেয়েও ইন্টারনেটের চ্যাট, গেম, ফেসবকু ইত্যাদিতে এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন যে তাকে আর বইয়ের নেশা, গানের নেশার মতো কিছুতে টানছে না। এটাকে ইতিবাচকভাবে না দেখে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইন্টারনেট ব্যবহার রোগ’ হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অফ ডিজিজ ১১তম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, হেরোইন, ফেন্সিডিল, ইয়াবার আসক্তির মতো এই ইন্টারনেট ব্যবহার রোগও একই বৈশিষ্ট্য এবং ধাপ অনুসরণ করে, মস্তিষ্কের পরিবর্তনও একই জায়গায় ঘটে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, প্রথমবার মাদক ব্যবহারের জন্য লিঙ্গ, সমাজভেদে কারণের বিভিন্নতা থাকলেও কাউকে মাদক ব্যবহার রোগে আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে নিয়ন্ত্রণহীনতা, সামাজিক ক্ষতি, ঝুঁকিপর্ণ ব্যবহার, টলারেন্স এবং প্রত্যাহার জনিত উপসর্গ-এই চার ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকতেই হবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো পৃথিবীজুড়ে একইরকম।

মাদক ব্যবহার রোগকে প্রতিরোধ করতে চাইলে আমাদের কাজ শুরু করতে হবে কৈশোর থেকে। শৈশবকালীন আচরণগত বিভিন্ন রোগ যেমন-কনডাক্ট ডিজঅর্ডার, অপজিশনাল ডিফায়ান্ট ডিজঅর্ডার, অতিচঞ্চলতা রোগ ইত্যাদি লক্ষণ শুরু হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এইসব শিশুরা ভবিষ্যতে বাধ্যতামলক নিয়মিত মাদক ব্যবহারকারী বা মাদক ব্যবহার রোগীতে পরিণত হবে না। তেমনিভাবে শিশুদের শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় ও যৌন নির্যাতন থেকে আমরা যদি রক্ষা করতে পারি কিংবা এমন কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও আমারা যদি যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে সেটিও দীর্ঘ মেয়াদে মাদক ব্যবহার রোগের প্রকোপ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

এসবের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ইত্যাদি নানা বিষয়ে দক্ষ দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আমাদের স্কুলগুলোর সিলেবাসের আমলূ সংস্কারও প্রয়োজন। শারীরিক খেলা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা, চারুশিল্প ইত্যাদির মাধ্যমে আমাদের শিশুদের দাপ্তরিক অর্থে নয়, আক্ষরিকভাবে সৃজনশীলতার আনন্দ পেতে সক্ষম করে তোলার জায়গা করে দিতে পারলে আর আমাদের কিশোর- তরুণ-যুবকদের রাসায়নিক আনন্দের দাস হতে হবে না বলে আশা করা যায়।

 

 

 

 

লেখক: ডা. মো. রাহেনুল ইসলাম
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সেন্ট্রাল এ্যাডিকশন ট্রীটমেন্ট সেন্টার
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর