মূল পাতা / মাদকাসক্তি / মাদকাসক্তি রোগ : বংশগত সমস্যা নাকি পরিবেশের প্রভাব

মাদকাসক্তি রোগ : বংশগত সমস্যা নাকি পরিবেশের প্রভাব

মাদকাসক্তি বা মাদক ব্যবহার রোগ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পুনঃপতনশীল মস্তিষ্কের রোগ যা মানসিক রোগ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত। কী কারণে রোগ হচ্ছে তার ভিত্তিতেই সাধারণত রোগের নামকরণ হয়। রোগের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেলে এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার মাধ্যমে কিওর বা নিরাময় করা গেলে রোগের সে নামের শেষে যুক্ত হয় ‘ডিজিজ’।

উদাহরণ স্বরূপ, যক্ষার জীবানু হচ্ছে যক্ষায় সংক্রমণের এজেন্ট বা কারণ যা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে সুনিশ্চিত হওয়া যায়, সুনির্দিষ্ট ঔষধের মাধ্যমে ৬ মাস কিংবা ৯ মাস পরে পরীক্ষা করে বলে দেয়া যায় যে, এই ব্যক্তি এই মুহূর্তে যক্ষার জীবানু থেকে মুক্ত হয়েছেন বা যক্ষা থেকে নিরাময় লাভ করেছেন। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে মাদকাসক্তি বা মাদক ব্যবহার রোগের ক্ষেত্রে এসব কথা প্রযোজ্য নয়। জীবনে দু-একবার মাদক নিলে বা মাঝে মাঝে মাদক ব্যবহার সত্ত্বেও ব্যক্তির পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত, ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তির যোগ্যতা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী ঠিকঠাক থাকলে শুধু প্রস্রাবে মাদকের উপস্থিতি দেখে তার মাদক ব্যবহারকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

আবার এর উল্টোটাও সত্য। অর্থাৎ ব্যক্তির পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত, ব্যক্তিগত জীবন তার যোগ্যতা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী ঠিকঠাক না থাকলে শুধু প্রস্রাবে মাদকের অনুপস্থিতি দেখে তার মাদক ব্যবহার রোগ নেই সেটিও বলা যায় না। ওপরের এসব যুক্তির সঙ্গে যক্ষা রোগটির বেশ কিছু অমিল থাকলেও মাদক ব্যবহার রোগ যে যক্ষার মতোই একটি রোগ তার স্বপক্ষেও কিছু যুক্তি রয়েছে।

শরীরে যক্ষার জীবানু ঢুকে পড়লে শতকরা শতভাগেরই তো যক্ষা হয় না। ব্যক্তির শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কেমন, পুষ্টি কেমন, কেমন বাড়িতে তিনি থাকেন, তিনি কী কাজ করেন এসব অনেক কিছু নির্ধারণ করে দেয় তার যক্ষা রোগ হবে কিনা। তেমনিভাবে যারা আজ জীবনে প্রথমবারের মতো একবার মাদক নিলেন তাদের শতকরা একশত ভাগ নিয়মিত, বাধ্যতামূলক মাদক ব্যবহারকারীতে পরিণত হবেন না। এদের মাঝে খুব বেশি হলে দশ থেকে পনেরো ভাগের কাছে মাদকটা এতোই ভালো লাগবে যে তারা ধাপে ধাপে (প্রথমে বছরে দু-একবার, পরের বছরে হয়ত মাসে একবার, পরের বছরে প্রতি সপ্তাহ থেকে প্রায় প্রতিদিন) নিয়মিত, বাধ্যতামূলক মাদক ব্যবহারকারীতে পরিণত হবেন। তাই মাদক ব্যবহার রোগটি কেন হয়, কাদের হয় এ বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট নয়। যে কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ডিজঅর্ডার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিবেশ, বংশগতি (জেনেটিক) এবং ব্যক্তিগত কারণে বহু মানুষ জীবনে একবার মাদক গ্রহণ করলেও তাদের মাঝে স্বল্প সংখ্যক মানুষ বাধ্যতামূলক নিয়িমিত মাদক ব্যবহারকারী হন। এটাকে বলা হয় ঝুঁকিপূর্ণতা বা ভালনারেবিলিটি। তবে এই ঝুঁকিপূর্ণতা শতভাগ সুনিশ্চিত নয়।

এ সংখ্যায় আমরা মাদক ব্যবহার রোগের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে কিছু আলোচনা করব। পরের সংখ্যায় বংশগতি বা জেনেটিকস সম্বন্ধে আরো কিছু তথ্য আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করার ইচ্ছা রাখি। মাদক ব্যবহার রোগ এবং বংশগতি রহিম-করিম এই দুই ব্যক্তির ডিএনএ পর্যায়ক্রম ৯৯.৯% হুবহু একই, পার্থক্যটা মাত্র শুধু ০.১% এর। তবে সংখ্যা হিসেবে এই ০.১% এর মাঝে আছে আমাদের সবরকম স্বকীয়তার পান্ডুলিপি। বংশগতির ধরন অর্থাৎ যে জিন নিয়ে মানুষ জন্মায় তা তার রোগ হওয়ার সম্ভানাকে হ্রাস বা বৃদ্ধি করে।

আমরা কেমন দেখতে হব, চোখের রঙ, চুলের রঙ, নাক ইত্যাদি প্রায় শতভাগ নিশ্চিত করলেও রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আসক্তি ইত্যাদির ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা শতভাগ নয়। মানুষের ক্ষেত্রে মাদকভেদে (অ্যালকোহল বা মদ, তামাক, হেরোইন, কোকেন, অ্যাম্ফিটামিন) আসক্ত হওয়ার প্রবণতা মোটা দাগে ৪০% থেকে ৬০% বংশগতির প্রকৃতি বলে দেখানো হয়েছে। মাদক ব্যবহার রোগ এবং পরিবেশ যে পরিবারে আমরা জন্ম নিই, বসবাস করি তার আশপাশ পাড়া-প্রতিবেশী, শহর, স্কুল কলেজ সবকিছু নিয়ে বৃহত্তর পরিবার। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখি, যে পাড়ায় দেদারছে মাদক বিক্রি হচ্ছে সেই পাড়ার সবাই কিন্তু মাদকদ্রব্য গ্রহণ করছেন না। নিজেদের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখব আমাদের স্কুলের বন্ধুদের একটি বৃহত্তর অংশ জীবনে একবার মাদক গ্রহণ করলেও তাদের ক্ষুদ্রতম অংশ জীবনব্যাপী বাধ্যতামূলকভাবে মাদক ব্যবহার করছে। কল্পনা করা যাক আমাদের মহল্লায়, ১০ জনের একটি নামহীন দল আছে, যাদের সবার গড় বয়স ১২ এর নিচে। তারা একসঙ্গে ঘোরাফেরা করে, খেলে, দুষ্টুমি করে। প্রাকৃতিকভাবেই তাদের মাঝে একজন দলনেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

ধরা যাক, এ দলনেতা একদিন বলল, ‘চল আজ কিছু নতুন ধরনের মজা করি। সবাই মিলে সিগারেট খাই’। দলনেতা হতে হলে স্বাভাবিকভাবে একটু বেশি চৌকস হতে হয়। সে সহজেই অন্যদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। ফলে দলের কোনো সদস্য সিগারেট খাওয়ার প্রস্তাবের সঙ্গে পুরোপুরি একমত না হলেও দলছুট হওয়ার ভয়ে না বলতে পারে না। এর পাশাপাশি কিশোর বয়সের স্বভাবজাত কৌত‚হলও প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। দেখি না কেমন? ফলাফল হচ্ছে-জীবনের প্রথম সিগারেট খাওয়া। এর মানে হচ্ছে, এই কিশোর বা কিশোরী জীবনে একবারের জন্য তামাক নামক মাদকটি নিয়ে ফেলেছে। এখন প্রশ্ন আসে-এই যে জীবনে একবার বা প্রথমবার নেয়াটা কি মাঝে মাঝে মাঝে ব্যবহার কিংবা নিয়মিত বাধ্যতামূলক ব্যবহারে পরিবর্তিত হবে নাকি এখানেই থেমে যাবে? এরপর নিয়মিত প্রতিদিন সিগারেট খাবে কি খাবে না তা শুধু তার না বলতে পারা না পারার ওপর নির্ভর করে না। তার আশপাশের কাছের জন তামাক নেয়াটা কীভাবে দেখে তার ওপরও অনেকখানি নির্ভর করে। যেমন : তার প্রিয় চরিত্র, গায়ক, নায়ক, শিল্পী, পাড়ার সব থেকে চৌকস ছেলেটি যদি সিগারেটের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তাহলে তার আবার সিগারেট গ্রহণ করার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে অনেকখানি।

বিশেষত সে যদি দেখে রাগ করলে, মন খারাপ হলে, কাজের মনোযোগ বাড়াতে, ভালো কবিতা লিখে কবি কবি ভাব ফোটাতে, মেয়েদের কিংবা ছেলেদের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে সিগারেট ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে তাহলে একজন কিশোরের পক্ষে সিগারেট বাদ দেয়ার বা এড়িয়ে যাওয়ার কীই বা কারণ থাকতে পারে! বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাড়ির সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটি হচ্ছেন বাবা। তাঁর যদি ধূমপান, মদ্যপান বা অন্যকোনো মাদকদ্রব্য গ্রহণের অভ্যাস অথবা মাদকের প্রতি নির্ভরশীলতা থাকে তবে সন্তান ঘরেই একজন নেতিবাচক রোল মডেল পেয়ে যায়। স্বভাবতই কিশোর বয়সে সবাই ক্ষমতাবান হতে চায়। যার সব থেকে সহজ শর্টকাট বুদ্ধি হচ্ছে বাবা যা করেন তাই প্রায় হুবুহু অনুসরণ করা। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জীবনের প্রথম সিগারেট গ্রহণের কারণ হতে পারে বিভিন্ন কৌতূহল, বন্ধু-বান্ধবদের চাপ, নিজের আশপাশের প্রভাবশালী চরিত্রদের সিগারেট বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক চাপ সামলানো ও কাজের মনোযোগ বাড়ানোর ধারণা, বিপরীত লিঙ্গের মনযোগ আকর্ষণের হাতিয়ার মনে করা ইত্যাদি।

এর পাশাপাশি যদি তার বংশে মাদক গ্রহণের ইতিহাস থাকে, পরিবারে চলমান মাদক ব্যবহারকারী থাকেন এবং তার মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতায় ঘাটতি থাকে, ইতিবাচকভাবে (খেলা, গান ইত্যাদি) আনন্দ আহরণের ক্ষেত্রে অদক্ষতা থাকে তবে সে ধীরে ধীরে নিয়মিত সিগারেট সেবনকারীতে পরিণত হবে। ওপরের বাক্যগুলোতে সিগারেট বা ধূমপান শব্দটির বদলে অ্যালকোহল বা মদ, হেরোইন, কোকেন, অ্যাম্ফিটামিন, গাঁজা বসিয়ে নিলেও খেয়াল করে দেখবেন মোটেই বেখাপ্পা মনে হচ্ছে না। আসলে মাদকভেদে শরীরের সঙ্গে রাসায়নিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কিছু সূক্ষ ফারাক থাকলেও পরিবেশের সঙ্গে মাদকের সম্পর্কের সামগ্রিক কাঠামোটা একই যা পক্ষান্তরে ‘মাদক ব্যবহার রোগ’ যে একটি ‘মানসিক রোগ’; কোনো একক ব্যক্তির শুধুই ব্যক্তিগত নৈতিক ত্রুটি নয়-সেটিই নির্দেশ করে।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ২য় বর্ষ, ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত