মাদকাসক্তি নিরাময়

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে গিয়েই মাদকের সাথে পরিচয়

বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর, তাকে হাত পা বেঁধে ওই কেন্দ্রে মারধরের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

এই ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলায় গ্রেফতার ওই নিরাময় কেন্দ্রের মালিকসহ তিনজনকে বৃহষ্পতিবার আদালতে তোলা হয়েছে।

মৃত্যুর ঘটনাটি নভেম্বর মাসের ২০ তারিখের, কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হওয়ার কারণে বিষয়টি নিয়ে এখন বেশ আলোচনা হচ্ছে। ভিডিওটি জব্দ করেছে পুলিশ এবং সমর্পণ নামের পুনর্বাসন কেন্দ্রটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আট নয়জন মিলে হাত পা বেঁধে এক তরুণকে মারধর করছে, টানা হেঁচড়া করছে।

সেখানে নোংরা পরিবেশে মারাত্মক গাদাগাদি করে রাখা বিছানা। এই ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর কাজের পদ্ধতি নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে সেগুলো আবারও সামনে এসেছে। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর হালচাল নিয়ে বিবিসি বাংলায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। মনের খবর পাঠকদের জন্য বিবিসির সেই প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হল:-

নিরাময় কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা

নিরাময় কেন্দ্রে থাকা কয়েকজনের সাথে কথা বলে মোটামুটি একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে চাননি এমন একজন বিবিসিকে বলছেন, “আমার পরিবার আমাকে বলে নিয়ে যায়নি যে ওখানে ভর্তি করা হবে।”

“প্রথম দিন শরীরের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তখন ওরা আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলো। পরদিন সকালে উঠে যখন আমি আবিষ্কার করলাম যে এখানে আমি আটকা পড়ে যাচ্ছি, তখন আমি কিছুটা ভায়োলেন্ট হয়ে গিয়েছিলাম। সেই পর্যায়ে গিয়ে আমাকে মারধর করা হয়েছিলো।”

তিনি আরও বলছেন, “এসব কেন্দ্রে যে ভর্তি হচ্ছে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়া হয়। প্রথম কিছুদিন বাবা মা-আত্মীয় স্বজন কাউকে যেতে দেয়া হয় না। টানা বন্দী রাখা হয়, তখন ধীরে ধীরে মানসিকভাবে সে ভেঙে যায়।”

সেসময় আরও বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় তিনি ঔষধ খেতে যখন রাজি হচ্ছিলেন না তখন তাকে হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছিলো বিছানার সাথে। এরকম অভিজ্ঞতার কথা প্রায় সবাই বলেছেন।

বিষাদগ্রস্ত ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে ভর্তি করা হয়েছিলো ঢাকার বিলাসবহুল একটি নিরাময় কেন্দ্রে। তিনি জানান, মানসিক চিকিৎসার জন্য যে নিরাময় কেন্দ্রটিতে তিনি ছিলেন সেটি রীতিমতো পাঁচ তারা হোটেলের মতো।

সেখানেই তিনি পরিচিত হন এমন কয়েকজনের সাথে যাদের মাধ্যমেই তার নেশা-দ্রব্যের সাথে পরিচয় হয়।

তিনি বলছেন, “কোন শারীরিক অ্যাক্টিভিটিজ ছিল না। আমাকে কিছু ওষুধ দিয়ে রেখে দিতো। তখন আমার কোন কিছুতে আসক্তি ছিল না। শুধু ডিপ্রেশন ছিল। আমি বিশ দিনের মাথায় সেখান থেকে বের হয়ে যাই। যেটা হয়েছিলো সেখানেই আমি আমার সোর্স খুঁজে পেয়েছিলাম। ড্রাগস রিলেটেড কিছু দরজা আমরা সামনে খুলে গিয়েছিলো অন্য যারা ভর্তি ছিল তাদের মাধ্যমে।”

এরপর তিনি ইয়াবা ও গাজায় আসক্ত হয়ে যান। তিনি বলছেন, এর কারণ হল সেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তি ও মানসিক রোগীদের একসাথে রাখা হয় যা আরও অনেক নিরাময় কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেন্দ্রগুলোর নাম শুনলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়।

এই তরুণী বলছেন, “এর পরে আমাকে আবার জোর করে রিহ্যাবে ভর্তি করা হয়। সেখানে আমার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ ছিল যে স্মৃতি আমাকে এখনো তাড়া করে বেড়ায়।”

চিকিৎসা মানতে না পারায় পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন ইয়াবাআসক্ত ঢাকার আরেক তরুণ।

মাদকাসক্তের সংখ্যা কতো

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে প্রায় ৩৬ লাখের মতো মাদকাসক্ত ব্যক্তি রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, লাইসেন্স প্রাপ্ত ৩২২টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে সারা দেশে। চারটি রয়েছে সরকারি।

এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক হিসেবে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলে আসছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মেখালা সরকার তাদের একজন। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মাদকাসক্তি নিরাময় দুটি ভিন্ন বিষয়।

“এটা স্বাস্থ্যগত ব্যাপার। এটাকে ব্রেইন ডিজঅর্ডার বলছি আমরা। যখন মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে একজন ব্যক্তি তখন কিন্তু এটাকে অপরাধ হিসেবে আমরা ধরছি না। মাদকাসক্তির কারণে যখন সে অসুস্থ হয় তখন এটা অবশ্যই স্বাস্থ্য সমস্যা।”

এসব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকা উচিৎ বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। অথবা দুটি মন্ত্রণালয় একসাথে কাজ হতে পারে বলেও তিনি জানান।

তিনি বলছেন, “একটি আদর্শ নিরাময় কেন্দ্রে প্রয়োজনমত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্ট, ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট বা মনস্তত্ববিদ এবং কাউন্সেলিং এর জন্য থেরাপিস্ট থাকতে হবে। ২৪ ঘণ্টা এমবিবিএস পাশ করা চিকিৎসক উপস্থিতি থাকতে হবে। বাইরে খোলামেলা জায়গা থাকতে হবে।”

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হল বেশিরভাগ কেন্দ্রকে অনেক সময় একটি ভবনের ভেতরে জেলখানার মতো মনে হয়। সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকে না। সেবা দানকারীদের মধ্যে প্রায়শই মাদকাসক্তদের প্রতি অপরাধী হিসেবে আচরণ করার প্রবণতা রয়েছে।

এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম কতটা নিয়মনীতির মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে?

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলছেন, “তাদের লাইসেন্স পেতে হলে অবশ্যই কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়, কেমন ডাক্তার থাকবে, কী ব্যবস্থা, কেমন পরিবেশ এই সব বিষয়ে। লাইসেন্স পেতে হলে এসব শর্ত পূরণ করতে হবে।”

তিনি বলছেন, লাইসেন্সবিহীন কোন নিরাময় কেন্দ্র পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

মারধরের যে অভিযোগ ওঠে সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “অবশ্যই এরকম অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা খুব গুরুত্বের সাথে দেখি। আমাদের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক পরিদর্শন করে। তবে বাংলাদেশে নিরাময় কেন্দ্রের এই বিষয়টি কিন্তু বেশ নতুন।”

তিনি বলছেন, বাংলাদেশে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর পরিচালনার জন্য একটি বিধিমালা রয়েছে। নতুন করে একটি বিধিমালা তৈরিরও কাজ চলছে।

সূত্র: বিবিসি