মাদকাসক্তি ও ব্যক্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত

মাদকাসক্তি একটি মানসিক ব্যাধি ও সামাজিক সমস্যা। আজ জাতির জন্য দুঃস্বপ্নের অন্য নাম মাদকাসক্তি। এর সর্বগ্রাসী বিস্তারে কুলীন সমাজ থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সাবাই আক্রান্ত। মাদকাসক্তি যে সামাজিক বিপর্যয়ের বার্তা নিয়ে আসে তা জাতি হিসেবে আমাদের সকল অর্জন, সকল সাফল্যকে ম্লান করতে সক্ষম। এই রাহুগ্রাস থেকে মুক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি মাদকাসক্তি, তার কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা আবশ্যক।

মাদকাসক্তির কার্যকারণ হিসেবে ব্যক্তিত্বের ধরন সবসময়ই গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়েছে। ব্যক্তিত্ব হচ্ছে একজন মানুষের সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সমাহার যা তাকে সমাজের অন্যসব মানুষ থেকে আলাদা করে। অন্তর্মুখীতা বা বহির্মুখীতা, লাজুকভাব বা উচ্ছলতা, আশাবাদী বা নৈরাশ্যবাদী, খুঁতখুঁতেভাব বা খামখেয়ালিপনা, ধৈর্যশীলতা, মনমেজাজের অবস্থা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলোর বিভিন্ন মাত্রার অবস্থিতি এক একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা দেয়।

এই বৈশিষ্ট্যগুলোই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে একজন মানুষের প্রতিক্রিয়া, আচরণকে নির্ধারণ করে। মাদকাসক্তি ও ব্যক্তিত্বের পারস্পরিক প্রভাব, গবেষণায় প্রমাণিত-উভমুখী। অর্থাৎ মাদকের ব্যবহার যেমন ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, বিপর্যয় বা সমস্যা তৈরি করতে পারে আবার এটাও ঠিক যে, ব্যক্তিত্বের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য মাদক সেবনের প্রবণতাকে উৎসাহিত করে। এছাড়া ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা বা Personality disorder-এ যারা ভোগেন তাদের মধ্যে মাদক সেবনের হার সাধারণ জনগণের চেয়ে বেশি।

আজকাল অনেকেই মাদকাসক্তির ওপর ব্যক্তিত্বের প্রভাব বোঝাতে Addictive Personaliy বা আসক্তিপ্রবণ ব্যক্তিত্ব কথাটি ব্যবহার করে থাকেন। এই ব্যক্তিত্বের অধিকারীগণ খুব সহজেই মাদকদ্রব্য সেবনে আসক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু আদতে এমন কোনো ব্যক্তিত্বের ধরন গবেষণায় প্রমাণিত হয়নি। তবে মাদকসেবীদের মধ্যে কিছুসংখ্যক নির্দিষ্ট ও ভিন্ন ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে, যেমন :

হটকারী আচরণ (Impulsivity): এই বৈশিষ্ট্য মাদকাসক্তদের ভেতর সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। একে সাদা-কালো চিন্তাধারা’ও বলা হয়। হটকারী মানুষ যেকোনো বিষয় বা ঘটনাকে হয় ভালো নয় মন্দ বা হয় পূর্ণ নয় শূন্য এভাবে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি অবস্থানে বিবেচনা করে বা করতে চায়। এরা যেকোনো কাজে তাৎক্ষণিক ফলাফল বা আনন্দ লাভ করতে চায়, অপেক্ষা করতে পারে না। ফলে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি পুরস্কারের চেয়ে মাদকের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সুখ লাভই তাদের কামনা।

কম্পালশন বা বাধ্যতামূলক আচরণ (Compulsive Behavior): অনিচ্ছায় বা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তি কোনো কিছুর প্রতি দুর্দমনীয় আকর্ষণ বোধ করেন বা কিছু কিছু আচরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন না; যেমন-মাদক সেবন, অতিরিক্ত ভোজন করা। ক্ষতিকর জেনেও কাজটি করে ফেলেন বা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

প্রথা বিরোধিতা বা লঙ্ঘন (Inconformity): অনেক মাদকসেবী প্রচলিত সামাজিক আচার বা প্রথা না মানাকে অতি মূল্যায়ন করেন এবং এ ধরনের কাজে গর্বিত হন। স্বকীয়তা অবশ্যই জরুরি কিন্তু এভাবে তা অর্জন করতে গিয়ে অনেক সময়ই এরা জনবিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে পড়েন।

চাপে ভেঙে পড়া বা চাপ নিতে না পারা (Poor Stress Coping): দেখা গেছে যাদের মধ্যে চাপ নেয়ার ক্ষমতা কম, যারা সংকটে বা বিপদে সহজেই হাল ছেড়ে দেন তাদের মধ্যে মাদক আসক্তির ঝুঁকি বেশি, কেননা এরা চাপের সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্যে মাদকের ব্যবহার করেন। কিন্তু তাতে যখন চাপ কমে না তখন মাদক ব্যবহারের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

আত্মমর্যাদাবোধের অভাব (Low self esteem): ব্যক্তিগত অভাববোধ, বিষণ্ণতা, ভীরুতা, লজ্জাবোধ, হতাশা ইত্যাদি মানসিক অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য অনেকে মাদকের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। সামাজিক দুশ্চিন্তাজনিত মানসিক রোগ আক্রান্তরা সাহস ও আত্মবিশ্বাস অর্জনের জন্য মাদক গ্রহণ করে থাকেন।

আত্মম্ভরিতা (Grandiosity): কেউ কেউ নিজেদের সবার মধ্যমণি বা সবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন বা ভাবতে পছন্দ করেন। প্রকৃতপক্ষে তারা এ ধরনের আচরনের মাধ্যমে নিজেদের দুর্বলতা ও খামতি ঢাকার চেষ্টা করেন।

অধৈর্য্য( Impatient): মাদকসেবী ফললাভ বা সুখানুভূতির জন্য অপেক্ষা করতে পারেন না। এরা তাৎক্ষণিক আনন্দ লাভের আশায় মাদক গ্রহণ করেন।

বাস্তবতার অস্বীকার (Denial): মাদকসেবীগণ তাদের সামাজিক দক্ষতা ও চাপ নেয়ার অক্ষমতার কারণে মাদকের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। মাদক তাদের মধ্যে এক কল্পিত বাস্তবতা তৈরি করে। এভাবে তারা তাদের সমস্যার অনুধাবন করতে পারেন না এবং সমাধান করতেও ব্যর্থ হন।

দুষ্কৃতিকারী (Anti-social): যারা সমাজের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না, যাদের ভেতর অপরাধবোধ কাজ করে না, আইনভঙ্গকারী, তাদের ভেতর মাদক সেবনের হার বেশি। এখানে স্মর্তব্য যে, এ সকল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (Personality Traits) থাকলেই যে একজন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হবেন, তা বিধেয় নয়। অনেকের মধ্যে এ বৈশিষ্টগুলোর উপস্থিতি সত্ত্বেও তারা মাদকাসক্ত হন না। এগুলো শুধুই একজন সন্দেহভাজন মাদকাসক্তকে শনাক্ত করতে এবং তার চিকিৎসা-পদ্ধতি পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। আবার এটাও মনে রাখা দরকার যে, একজন মাদকাসক্তের আচরণও পরিবর্তিত হতে পারে।

এসকল বৈশিষ্ট্যের পাশপাশি ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যাগুলোও (Personality Disorders) মাদকাসক্তিতে ভূমিকা রাখে। অনেক সময়ই দেখা যায় ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা ও মাদকাসক্তি যুগপৎ অবস্থান করে। এ দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্যে পৃথিবীব্যাপী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণা করা হয়েছে এবং ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ মাদকাসক্ত এক বা একাধিক ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। এক গবেষণায় দেখা যায় যে, অ্যালকোহল আসক্তদের মধ্যে প্রায় ২১ শতাংশ অবসেসিভ কম্পালসিভ ব্যক্তিত্বের (OCPD) সমস্যায় আক্রান্ত, ১০ শতাংশ Paranoid বা সন্দেহবাতিক ব্যক্তিত্ব ও ৮ শতাংশ Anti Social বা পরনির্ভরশীল ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। কোকেন ও অ্যালকোহল আসক্তদের গবেষণায় পাওয়া যায়, ২১ শতাংশ Anti Social বা দুষ্কৃতিকারী ব্যক্তিত্ব, প্রায় ১৫ শতাংশ Narcissistic বা আত্মমগ্নতাজনিত ব্যক্তিত্ব ও প্রায় ১১ শতাংশ বর্ডারলাইন (Borderline) ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। মারিজুয়ানা ও অপিয়াম জাতীয় মাদকসেবীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ফলাফল লক্ষ করা গেছে।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিত্বের সমস্যার জন্যে যেসব অসুবিধায় পড়েন তা থেকে মুক্তির জন্য বা মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে মাদকদ্রব্য বেছে নেন। অনুরূপভাবে অতিরিক্ত ও দীর্ঘ সময় ধরে মাদক সেবন মস্তিষ্কের রাসায়নিক সামঞ্জস্যের পরিবর্তন ঘটায়। এর প্রেক্ষিতেও চিন্তা, চেতনা, বোধ , বুদ্ধি ও আবেগের তথা ব্যক্তিত্বের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

মাদকাসক্তি ও ব্যক্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এরা পরস্পরকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। এ প্রভাব শুধু রোগ সংঘটনে নয়, মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও প্রতিকারেও ব্যক্তিত্বের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে আমাদের আরো গবেষণা প্রয়োজন। ব্যক্তিত্বের সমস্যার দ্রুত নির্ণয় ও চিকিৎসা মাদকাসক্তির প্রাদুর্ভাব কমাতে ভূমিকা রাখবে বলেই মনে হয়।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ ৫ম সংখ্যায় প্রকাশিত।