টাকা কি মানুষকে সুখি করতে পারে?

পৃথীবির অধিকাংশ মানুষ টাকাকে সুখের প্রতিশব্দ মনে করেন, তাদের মতে সুখ লাভের একমাত্র উপায় যেন টাকা। টাকা আবিস্কারের পর থেকেই মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে “টাকা কি মানুষকে সুখি করতে পারে?”। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানীরা এর উত্তর খুজেছেন বিভিন্নভাবে।

ধরুন, আপনি ১০ লক্ষ টাকার একটি লটারি জিতেছেন! তাহলে কি আপনি অনেক বেশি সুখি মানুষ হয়ে যাবেন? এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত একেক জনের কাছে একেক রকম হবে। টাকা থাকার অনুভূতিটাও হবে ভিন্ন ধরণের। যেমন ধরুন আপনি একজন ছাত্র, পড়াশুনার খরচ চালাতে আপনাকে টিউশনী করতে হয়, এক্ষেত্র টাকা থাকাটা আপনাকে অনেক সুখি করবে। আবার আপনি যদি ১ হাজার কোটি টাকার মালিক হন তাহলে ১০ লক্ষ টাকার ওই লটারি মনে হয় কোন সুখের অনুভূতিই তৈরি করতে পারবে না।

সুখ কি, সুখের সাথে টাকার সম্পর্ক কি এসব প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানীরা (Health Psychologists)। যত বড় অঙ্কের টাকা যেই জিতুক না কেন তা কখনোই মানুষকে খুব বেশি সুখি করতে পারে না। তবে এটা সত্য এই টাকা প্রাথমিকভাবে হয়তো লটারি বিজয়ীকে প্রচন্ড একটা সুখের অনুভূতি তৈরি করবে। গবেষণায় দেখা গেছে, লটারি বিজয়ীদের সুখের প্রভাব এক বছর বা তার থেকে কিছু সময় বেশি থাকে, কিন্তু এরপর তাদের সুখের মাত্রা আবার আগের মতো হয়ে যায়। ‍ (Diener & Biswas, 2002; Spinella & Lester, 2006)

ঠিক একইভাবে বিপরীত প্রক্রিয়া কাজ করে মানুষ যখন কোন বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয় তখন। দুর্ঘটনার পর মানুষের সুখের মাত্রা অনেক নিচে নেমে গেলেও সময়ের সাথে সাথে তা প্রায় আগের অবস্থানে চলে আসে (Diener & Biswas, 2002; Spinella & Lester, 2006)এসব গবেষণায় পরীক্ষণপাত্রদের সুখের লেভেল বোঝার জন্য তাদের Subjective wellbeing পরিমাপ করা হয়েছিল।

কিন্তু কেন মানুষের এই Subjective wellbeing এতটা স্থির বা অনড়? স্বাস্থ্য মনোবিজ্ঞানীরা সেটা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মানুষের সুখের অনুভূতির এই অপেক্ষাকৃত স্থায়ী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের সুখ সম্পর্কে একটা প্রতাশ্যা বিন্দু থাকে। বিভিন্ন প্রতিকূল ও অনুকূল ঘটনা আমাদের সেই প্রত্যাশা বিন্দু থেকে কখনো নামিয়ে দিয়ে হতাশার সাগরে ভাসায় আবার অনুকূল ঘটনাগুলো আমাদেরকে সেই প্রত্যাশা বিন্দুটিকে অতিক্রম করে চরমভাবে আনন্দিত করে।

তাহলে প্রশ্ন আসে, কিভাবে মানুষের মধ্যে এই প্রত্যাশা বিন্দু প্রতিষ্ঠিত হয়? গবেষণায় দেখা গেছে মানুষের মধ্যে এই প্রত্যাশা বিন্দু তৈরি করার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে সেটা হল বংশগতি।

মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, Identical twin যারা বড় হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে তাদের মধ্যে সুখের এই প্রত্যাশা বিন্দুটি খুবই কাছাকাছি এবং তারা প্রায় সমানভাবে সুখি! (Bates & Luciano, 2008)

অধিকাংশ মানুষ তাদের সুখের মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে বলে, যেমন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ শতাংশ মানুষ নিজেদের “খুব সুখি” বলেছেন, ১০ শতাংশ বলেছেন তারা “খুব সুখি নয়”, তবে অধিকাংশ মানুষ নিজেদেরকে “বেশ সুখি” হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

monon-600

একই ধরনের ফলাফল দেখা যায় যখন মানুষদেরকে অন্য মানুষদের সাথে তুলনা করতে বলা হয়। যেমন, একটি আমেরিকান গবেষণাপত্রে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “ নিচের মানুষগুলোর মধ্যে কাকে আপনার বেশি সুখি মনে হয়? এর উত্তরটা ছিলো-

ক) অপরাহ উইফ্রে (23%), খ) বিল গেটস (7%) গ) পোপ (12%) ঘ) আমি নিজে (49%) এবং মাত্র ৬% মানুষ জানিনা উত্তর দিয়েছিল। (Black & McCafferty, 1998)

প্রশ্ন আসতে পারে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কি মানুষের সুখের কোন তারতম্য হতে পারে? গবেষণায় দেখা যায় যে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে খুবই সামান্য তারতাম্য হয়ে থাকে।  প্রায় সকল পরিবেশে নারী-পুরুষ সমানভাবে সুখি বলে ঘোষণা করেছে।

তবে, আফ্রিকান-আমেরিকানদের চেয়ে ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা নিজেদের সামান্য বেশি “খুব বেশি সুখি” বলেছে। এমনকি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী ও অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল দেশের ক্ষেত্রে প্রায় সমান ভাবে সুখি মানুষ পাওয়া যায়।

আলোচনার মূল কথা হলো, টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না।  তাহলে ধনী দেশের মানুষেরা সুখি মানুষের তালিকায় সবার উপরে অবস্থান করত আর গরিব দেশের অবস্থান হত সবশেষে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ট্যাগ্স: