মূল পাতা / ফিচার / বই পড়ার অভ্যাসটা আমার ভেতরে যে বীজ তৈরি করেছিল সেটি আমাকে জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছে

বই পড়ার অভ্যাসটা আমার ভেতরে যে বীজ তৈরি করেছিল সেটি আমাকে জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছে

আমাদের চারপাশে, আমাদের সন্তানদের চারপাশে অন্ধকার জীবনের বিভিন্ন রকমের হাতছানি ওৎ পেতে থাকে ছোবল মারার জন্য, গিলে খাওয়ার জন্য। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানান যুদ্ধের ভেতর দিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। এই কঠিন চ্যালেঞ্জটিতে তারাই জিতে যান যারা খুঁজে পান বেঁচে থাকার নিগূঢ় শক্তি, জীবনের গুপ্ত মন্ত্রণা। পার্থ (ছদ্মনাম) এরকমই একজন বিজয়ী যোদ্ধা যিনি নিজের জীবনকেই শুধু জয় করেননি, অন্যের জীবনকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

এখন কী করছেন?
প্রফেশনাল কাজের পাশাপাশি আমি self help group এর সাথে কাজ করি। যারা আগে ড্রাগ নিত এখন নেয় না self help group তাদের নিয়ে কাজ করে। আর আমার প্রফেশনাল কাজটিও ড্রাগ সম্পৃক্ত।

কেন এই কাজগুলো করতে উদ্বুদ্ধ হলেন?
আসলে আমি নিজে একসময় ড্রাগ নিতাম এবং সেসময় আমার পরিবারের অনেক ক্ষতি হয়েছে আমার জন্য। এমনকি আমার জন্য জমিও বিক্রি করে দিতে হয়েছে আমার পরিবারকে। এই বিষয়গুলো আমাকে খুব পীড়া দেয়। আর এই ক্ষতিগুলো কিছুটা হলেও যাতে পূরণ করতে পারি সেজন্য জীবনটাকে নতুনভাবে গোছানোর চিন্তা করি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে- আমার জীবন শুধু আমার জীবন না, আমার পরিবারের জন্য না, নিশ্চিতভাবে আমার সমাজের জন্যও আমাকে কিছু না কিছু করতে হবে। এসব কিছু চিন্তা করেই আমার ড্রাগ ফিল্ডে থেকে যাওয়া।

কর্মজীবনের শুরু থেকেই আপনি ড্রাগ নিয়ে কাজ করছেন, আপনার কাজের প্রাপ্তিগুলো কী?
বাংলাদেশের self help group উন্নয়ন করার জন্য আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমি যখনই সুযোগ পাই তখনই মাদক ব্যবহারকারীদেরকে নিয়ে কিছু কাজ করা, তাদেরকে সাহায্য করা বা অন্য যেকোনো সম্পৃক্ততা বজায় রাখি।

আপনি প্রথম কখন মাদক ব্যবহারে আকৃষ্ট হন?
আমি তখন খুব ছোট- ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়ি তখন আমরা একটা জেলা শহরে থাকি। সেসময় কোনো একটা উৎসবে বাদ্যযন্ত্রীদের একজনকে গাঁজা বানাতে দেখি। আমি তো বুঝতাম না। আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ বলে- দেখেছিস গাঁজা খাচ্ছে! আমার তখন গাঁজা বানানো এবং খাওয়ার আনুষ্ঠানিকতার প্রতি একটা আকর্ষণ বোধ হয় এবং আমি বলেই ফেলি- বাহ গাঁজা তো ভালো জিনিস। তখন আমার বন্ধুরা আমাকে তিরস্কার করে। এরপর অনেকদিন চলে গেছে। এস. এস. সি পরীক্ষা দেয়ার আগ পর্যন্ত আমি এন্টিস্মোকার ছিলাম। এস. এস. সি পরীক্ষা দেয়ার কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু গাঁজা নিয়ে আসে। তো আমি বন্ধুদের কাছে নিজের কৃতিত্ব জাহির করার জন্য বলি- আমি তো জানি এটা এভাবে এভাবে খেতে হয়। তখন কিন্তু আমি সিগারেটও খাই না। বন্ধুদেরকে দেখানোর জন্য দু’একটা টান দিই। ঐ প্রথম আমি গাঁজা খাই।

এরপর আসক্ত হয়ে পড়েন কীভাবে?
বন্ধুদের সাথে প্রথমবার গাঁজা খাওয়ার পর তার কিছুদিন পর আমি ফেনসিডিল খাই। তখন ফেনসিডিল খুব প্রতুল ছিল এবং খুব কম দাম ছিল। এছাড়া তখন দেখতাম পাড়ার বড় ভাইয়েরা খুব একটা প্রস্তুতি নিয়ে মোটরসাইকেলে করে কোথায় যেন যায়। পরে জানতে পারি তারা ফেনসিডিল খেতে যায। তখন ফেনসিডিল খাওয়া অনেকটা ফ্যাশনের মত ব্যাপার ছিল। তাদেরকে দেখে আমার মধ্যে একটা negetive curiosity তৈরি হলো। তারপর আমি পুরোমাত্রায় ফেনসিডিল খেতে শুরু করি। ওটা ছিল ৯২ সাল। ৯৬ সাল পর্যন্ত আমি ফেনসিডিল খাওয়া continue করি। ’৯৭-তে এসে ফেনসিডিল এর মানটা পড়ে যায়। তখন যেটা পাওয়া যেত ওটা খেতে আর ভালো লাগলো না। তখন আমি বন্ধুদের প্ররোচনায় হেরোইন নিতে শুরু করি। সেসময় আমার পরিবার অর্থনৈতিকভাবে খুব বিপর্যস্ত ছিল। এর আগে আমাদের একটা স্বচ্ছল পরিবারই ছিল। এসব নিয়ে আমি খুব হতাশার মধ্যে থাকতাম। এই হতাশা মাদকদ্রব্যের প্রতি চূড়ান্তভাবে আসক্ত হয়ে পড়ার পেছনে একটা ভূমিকা রেখেছে।

আপনার চূড়ান্ত মাদকাসক্তি আপনার ব্যক্তিজীবন এবং পারিবারিক জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
যখন শুধু ফেনসিডিল খেতাম তখন প্রভাবটা অতো তীব্র ছিল না। হেরোইন নিতে যখন শুরু করলাম তখন খুব দ্রুত আমার অবস্থার অবনতি ঘটে। পড়াশুনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর যেটা হয় নানান জায়গা থেকে টাকা ধার করা, বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করা। আমার অনেক বই ছিল। প্রথমে সেগুলো বিক্রি করতে শুরু করি। তারপর নিজের বিভিন্ন জিনিস। একটা সময় বাড়ির লোক জানতে পারলো। তারা নানাভাবে চেষ্টা করতো। পুরোপুরি তো তারা জানতো না। শেষ পর্যায়ে গিয়ে তারা ট্রিটমেন্ট করানোর সিদ্ধান্ত নেন।

কীভাবে বেরিয়ে এলেন সে জীবন থেকে?
সাত মাস আমি একটা নিরাময় কেন্দ্রে ট্রিটমেন্ট নিয়েছি। ছয় বছর সেখানে কাজ করেছি। প্রথমে ভলেন্টিয়ারি সার্ভস দিতাম। পরে ওখানে চাকরি করি। এরপর পড়াশুনা শুরু করি, পড়াশুনা শেষ করি, MPH করি। বিভিন্ন ট্রেনিং করি। এরপর জাতিসংঘের একটা প্রজেক্টে কাজ করতে শুরু করি।

আপনার স্বাভাবিক জীবনের ফিরে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা কার ছিল?
আমার মা’র। আমার মা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। তিনি আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকতেন। তিনিই আমাকে নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান।

মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কী প্রয়োজন?
ট্রিটমেনট সেন্টারগুলোর উন্নয়ন দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়া উচিৎ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ বিষয়ে তেমন কোনো পড়াশুনা হয় না। সাইকোলজিতে যারা পড়ে তারা কিছুটা অংশ পড়ে। মেডিকেল কলেজে সায়ক্রিয়াটিক ডিপার্টমেন্টে পড়ানো হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রগুলোতে আরো মনোযোগ দিলে সুফল আসা সম্ভব। তবে সবেচেয়ে ভালো হত মাদক ব্যবসা বন্ধ করা গেলে। এখন কোথায় না মাদক পাওয়া যায়- হাঁটতে হাঁটতে, রিক্সায়, লিফ্টে মানুষ মাদকের বেচাকেনা করছে। (মাদক ব্যবসা বন্ধ করার কথাটা তিনি কৌতুকের সুরেই বলেন, যেন অসম্ভব এবং অর্থহীন জেনেও বলছেন এমন একটি অভিব্যক্তিসহ।)

মাদক আসক্তি রোধ করা সম্ভব কীভাবে?
প্রত্যেকটা স্কুলে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। প্রত্যেকটা স্কুলেই এমন দু’চারজন শিক্ষক থাকেন যাদেরকে বাচ্চারা আদর্শ হিসেবে ভাবে, যার দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেই শিক্ষকদের মাদক বিরোধী সচেতনতা তৈরির কাজে সম্পৃক্ত করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। বর্তমান সময়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে Positive competition টা কমে গিয়েছে। আগে যেমন- ছবি আঁকা, বই পড়া, পাড়ায় পাড়ায় ফুটবল টুর্নামেন্ট কিংবা নাটক ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে ছেলেমেয়েদের সম্পৃক্ততা ছিল। এই বিষয়গুলো সুস্থ সমাজের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা কী হতে পারে?
আমি যে জিনিসটা বিশ্বাস করি- শুধু ড্রাগ না, যেকোনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ থেকে ছেলেমেয়েদেরক দূরে রাখার জন্য পারিবারিক সম্প্রীতিটা খুব বেশি দরকার। যেটা এখন খুব কমে গিয়েছে। পারিবারিক সম্প্রীতি শুধু সম্পর্ক না, সবাই একসঙ্গে আলাপ আলোচনা করবে, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করবে, একজন আরেকজনকে বিপদে সহায়তা করবে- এগুলোও সম্প্রীতির অংশ।

আপনি বলছিলেন আপনার প্রচুর বই ছিল- বই পড়ার অভ্যাসটা কি আপনাকে জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছে?
হ্যাঁ। আমি যখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বই পড়তে গেলাম তখন বই পড়ার অভ্যাস, বই নিয়ে আলোচনা আমার ভেতরে জীবন সম্পর্কে একটা বোধ তৈরি করে। যখন খুব বাজে ভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ি তখন ঐ বোধটা আমাকে তাড়িত করতো। মনে হতো এটা তো কোনো জীবন না, আমার জীবনে তো আরো কিছু করার কথা ছিল। কিছু বই, কিছু গল্প আমাকে খুব টানতো; যেমন- কৃষণ চন্দরের ‘গাদ্দার’ নামে একটা উপন্যাস ছিল। এছাড়া তারাশঙ্করের ‘কবি’ বা বনফুলের ছোটগল্পগুলোও খুব টানতো। এই বইগুলোই যেন আমাকে বলেতো যে জীবনে তো হেরে যাওয়ার কিছু নেই। মোটকথা বই পড়ার অভ্যাসটা আমার ভেতরে যে বীজ তৈরি করেছিল সেটি আমাকে জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছে। নিজের এ অভিজ্ঞতা থেকে আমি যেটা করি আমার নিজের কাজের জায়গায় যেখানে আমি মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করি সেখানে একটা রিডিং সার্কেল তৈরি করি। আমি দেখেছি যারা এই সার্কেলে অংশগ্রহণ করে তাদের আচরণ অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র, চিন্তাভাবনাও স্বতন্ত্র।

পার্থ যদিও মন্তব্য করেন পেছনের জীবনটা তার ভেতরে একধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করে। তিনি কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেননি এই বিষয়টিও তাকে হীনম্মন্য করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার সাথে কথপোকথন থেকে বোঝা যায় জীবন বলতে তিনি তেলাপোকার মত টিকে থাকাকেই বোঝেন না; জীবন বলতে তিনি মানুষের জন্য, মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে বিজয়ী হয়ে বেঁচে থাকাকেই বোঝেন। আর তাই নিঃসন্দেহে তিনি হতে পারেন বিভ্রান্ত সমাজটির অনুপ্রেরণা।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম