ঐশী এবং আমাদের দায়বদ্ধতা

সংবাদপত্র মারফত অজস্র নেতিবাচক খবর মগজে নিয়ে আমাদের প্রতিটি দিনের যাত্রা শুরু হয়। গুম, খুন, ধর্ষণ জাতীয় ভয়ংকর খবরগুলোও আমাদের মস্তিষ্কে খুব একটা আলোড়ন তৈরি করে না আজকাল। তবুও মাঝে মাঝে কিছু খবর আমাদের বিচলিত হতে বাধ্য করে। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও আমাদের চিন্তাজগৎ কে আচ্ছন্ন করে। এরকম বিচলিত অনুভূতি নিয়েই ‘ঐশী’ নামটির সাথে আমাদের পরিচয়। কিশোরী কিংবা সদ্যতারুণ্যে পা দেয়া একটা মেয়ের হাতে তার বাবা-মায়ের খুন হওয়ার খবরটি আমাদেরকে আৎকে উঠতে বাধ্য করে। আর তার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডাদেশ আমাদের মধ্যে একটি মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে এবং আমাদের মস্তিষ্কে কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়- কেন, কীভাবে এই সমাজের গর্ভে ঐশীর জন্ম হল এবং এরকম ভয়ংকর একটা পরিণতির দিকে সে অগ্রসর হলো! এরকম প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কথা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং বারডেম জেনারেল হসপিটাল এ্যান্ড ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক এবং  চীফ কনসালটেন্ট প্রফেসর ড. আনোয়ারা বেগমের সাথে।

কেন একটা মেয়ে তার বাবা-মাকে হত্যা করার মত চূড়ান্ত নির্মমতার দিকে অগ্রসর হলো এর পেছনের প্রেক্ষাপটকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করেন?

দ্যাখো, এই প্রশ্নের জবাব একবাক্যে দেয়া সম্ভব নয়। অনেকগুলো কারণ এর পেছনে আছে। ভুলে গেলে চলবে না যে ঐশী যে পরিবারে বড় হয়েছে সেখানে টাকা-পয়সার অপ্রতুলতা ছিল না। সে যথেষ্ট হাতখরচ পেত, মাদকদ্রব্য কিনতো। সে কোনোদিন অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হয়নি তো সেজন্য সে মনে করতো জীবনটা তার হাতের মুঠোয়। এরকম একটা ধারণা তার মধ্যে গড়ে উঠেছে বাবা-মা’র কারণেই। তাকে যদি ছোটবেলা থেকে শৃঙ্খলা, সংযম এবং পারিবারিক নিয়ম-কানুনের মধ্যে রাখা হত, সে যদি জানতো যে তার হাত খরচ এইটুকু এর বেশি হবে না, সে যদি জানতো তাকে এই সময়ের মধ্যে বাসায় আসতে হবে, এই সময় পড়ালেখা করতে হবে তাহলে হয়তো আজকের পরিণতির দিকে যেত না। শেষের দিকে এসে বাবা-মা যখন শৃঙ্খলা আরোপ করতে গেছেন তখন কিন্তু তারা পারেননি। তার আগেই তার চরিত্রের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সে অনেক মারমুখী হয়ে উঠেছে, রাগী হয়ে উঠেছে, জেদী হয়ে উঠেছে। আর এর পেছনে ছিল মাদকদ্রব্য। এখানে আরেকটি কথা হচ্ছে মাদকদ্রব্য যদি একজন ভালো, নিরীহ, শান্ত মানুষও গ্রহণ করে তাহলে তার চরিত্রে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। তার মধ্যে একটি হচ্ছে প্রচণ্ড রাগ, আর একটা হচ্ছে প্রচণ্ড জেদ এবং দাবী বা ডিমান্ড- যে আমি যেটা চাই সেটা হতে হবে। এটা শুধু ঐশী না, যে কারোরই হতে পারে। মাদকদ্রব্যের বহু রকম কুফল আছে তার মধ্যে একটা হলো মাদকদ্রব্য মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড জেদ তৈরি করে, সে তখন অন্ধ হয়ে যায়।

ঐশীর বয়স এবং শাস্তি নিয়ে নানারকম প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, এক্ষেত্রে আপনার মতামত কী?

আমার মনে হয় সে মাদকদ্রব্য ব্যবহার করতো, শৃঙ্খলা মেনে চলতো না সেজন্য কিছু বছর তার পড়ালেখায় নষ্ট হয়েছে। তারপরেও তার বাবা-মা চেষ্টা করেছিলেন তাকে সুপথে আনার। এজন্য আমার মনে হয় তার বয়স হয়ে গিয়েছিল আঠারোর বেশি। আর আঠারোর বেশি যদি তার বয়স হয় তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সে কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক। আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি কোনো গর্হিত অপরাধ করে, বাবা-মা ভুলে যাও অন্য কাউকেও যদি খুন করে তাহলে অন্য দশজনের যে শাস্তি তারও সে শাস্তি হতে হবে। তুমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক কাজেই তুমি তোমার কাজের জন্য দায়ী।

সন্তানের কাজে কতটুকু স্বাধীনতা দেয়া সমীচীন? আর স্বাধীনতা এবং সীমাজ্ঞানের ভারসাম্য তৈরিতে কী করা বাঞ্ছনীয়?

বাচ্চাদেরকে যেমন আমি হ্যাঁ বলবো, তেমনি না-ও বলবো। মনে করো আমি একটা কেরাণি, আমি মাইনে পাই মাসে বিশ হাজার টাকা। সেখান থেকে আমাকে বাড়ি ভাড়া দিতে হয় আট হাজার টাকা। তখন তো আমার সন্তান যা চাচ্ছে তাই তাকে দিতে পারবো না। যেকোনো মানুষের একটা বাউন্ডারি থাকতে হবে। আমার যতটুকু ক্ষমতা ততটুকুই আমার ছেলেমেয়েকে বোঝাতে হবে। বলতে হবে যে দ্যাখো আমি এই, আমার এতটুকু ক্ষমতা, এতটুকু আমি দিতে পারবো। তবে তুমি যদি পরীক্ষায় ভালো করো তাহলে তুমি যেটা চাচ্ছ সেটা আমি সাধ্যের বাইরে গিয়েও দিতে চেষ্টা করবো, কিন্তু সেটাকে তোমার যথাযথ কাজে লাগাতে হবে। অবশ্যই সাথে একটা ‘কিন্তু’ যুক্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ সন্তান জানবে যেকোনো সম্পর্কই গিভ এ্যান্ড টেকের। পৃথিবীতে সব সম্পর্কই গিভ এ্যান্ড টেকের। শুধুমাত্র একটা সম্পর্ক ছাড়া। সেটা হলো মায়ের সাথে সম্পর্ক। মা কখনোই কিছু ফেরত চান না। কিন্তু একটা শিশুকে জানতে হবে- এতটুকু সে পাবে, এতটুকু পাবে না এবং এটা ছোট্টবেলা থেকেই করতে হবে। বাচ্চা হয়তো একটা জিনিসি চাইলো যেটা বাবা-মায়ের সামর্থ্যের বাইরে। তাকে বোঝাতে হবে- আমার তো অত সামর্থ্য নেই বাবা, তাই এখন দিতে পারছি না। সে হয়তো কাঁদবে, রেগে যাবে তারপর একটা সময় সে ঘুমিয়ে পড়বে। একদিন, দুইদিন, তিনদিন এভাবে বোঝানোর পর সে বুঝে যাবে। পৃথিবীতে অধিকাংশ জিনিসই যে আমরা পাই না, সেটা শিশুকে মানুষ হিসেবে বড় হতে গেলে বুঝতে হবে। অধিকাংশ বাবা-মাই কিন্তু বাচ্চাকে ‘না’ বলতে চান না, তারা কষ্ট করে হলেও বাচ্চার চাওয়াকে মেটাতে চান। বাচ্চা যদি এভাবে যা চাচ্ছে তাই পায় তাহলে তো সে মানুষ হতে পারবে না।

বর্তমান সময়ে একক পরিবারগুলোতে দেখা যায় সন্তানকে খুব বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। সন্তান বুঝে যায় যে সেই পরিবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাবা-মা তার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। এটা কতটা সঙ্গত?

এটা কি বাবা-মা বাচ্চার স্বার্থে করে, না নিজেদের স্বার্থে করে একটু ভেবে দ্যাখো। অধিকাংশ বাবা-মা বাইরে কাজ করে। বাচ্চা বায়না করলে চট করে মিটিয়ে দিয়ে ভাবে যাক যাক ও শান্ত থাকুক, যাতে তারা তাদের নিজেদের কাজ নির্বিঘ্নে করতে পারে। এটা তো বাচ্চাকে ঘুষ দেয়া, এটা তো ঘুষ!বাড়তি খরচের দোহাই দিয়ে এসব দম্পতি বাবা-মা-ভাই-বোন কাউকে বাড়িতে রাখে না। বাচ্চা মা ছাড়া আর কিচ্ছু দ্যাখে না, বোঝে না। আমরা বুঝি না একটা বাচ্চা একটা বৃহৎ পরিবারের কনসেপ্ট নিয়ে বড় হলে প্রথম সে যে জিনিসটা শিখবে সেটা হলো- সবুর, ধৈর্য। মানুষ তো গাছের মত বড় হবে, তাকে যদি তুমি একটা ঘেরাটোপের মধ্যে বড় কর সে মানুষ হবে নাতো! অমানুষ হবে। ঐশী তো এই সমাজের প্রোডাক্ট। সে একটা প্রতীক, এই সমাজই তাকে তৈরি করেছে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হলে তো তার দায় তাকেই নিতে হবে। শোনো you have to be ruthless to be kind. তোমাকে কঠিন হতে হবে যাতে ভবিষ্যতে ছেলেমেয়েদের কোনো কষ্ট না হয়। ছেলেমেয়েদেরকে লাঠি দিয়ে আঘাত করার প্রয়োজন নেই তাদেরকে বোঝাতে হবে, তাদের সাথে গল্প করতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে এভাবে তাদের সাথে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। কিন্তু আমরা তো সেটা করি না। আমরা সব সময় ব্যস্ত থাকি। জীবনকে এত যান্ত্রিক করে ফেললে তো চলবে না।

একটা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে এখনকার ছেলে-মেয়েরা অনেক বিচ্ছিন্ন,  চাহিদা অনেক বেশি। এর কারণ কী?

এটাও তো বাবা-মা’র কারণেই। সেদিন আমাদের বাসায় একটা ফ্যামিলি এসেছিল। তাদের ছেলেটির বয়স হচ্ছে আট। তার হাতে একটা মেশিন আছে সেখানে সে সর্বক্ষণ গেম খেলছে। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেও গেম খেলতে খেলতেই উত্তর দিচ্ছে। একটা পারিবারিক সমাবেশ হচ্ছে সেখানেও সে আসে না, খেতে ডাকলেও আসে না। এই মেশিনটা কে তুলে দিয়েছে তার হাতে? তার বাবা-মা। এখন কী হচ্ছে? তার মা যখন খেতে ডাকছে টেবিলে সে রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে বলছে- আমাকে ডাকছ কেন? আমি তো বলেছি আমার ক্ষুধা নেই, ডিস্টার্ব করছো কেন? খাওয়ার টেবিলে যে একসঙ্গে বসে খেতে হয় এই রীতিটাও ভেঙে গেছে।

অনেক সময় বাবা-মা ছেলে-মেয়ের কাছে জিম্মি হয়ে যান। তারা না চাইলেও সন্তানের কাছে হার মানেন। এমন পরিস্থিতে তারা কী করতে পারেন?

আমি জানি বাবা-মা অপারগ হয়ে যান। সন্তানকে দিতেই হয়, কিন্তু তার প্রতিফলও তাকে নিতে হবে। যে অপারগতা এখন আমি সন্তানকে দেখাচ্ছি আমাকে সারাজীবন সন্তানের কাছ থেকে সেই অপারগতা নিতে হবে। বাবা-মাকে সুকৌশলে বিষয়টা সামলে নিতে হবে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়ে যাবে যদি তার অযৌক্তিক চাহিদা পূরণ না করে। কিন্তু সেই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বাবা-মাকে স্নান করে আসতে হবে এবং বলতে হবে- না, যেটা পারবো না সেটা পারবো না।

বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এইসব মানবিক সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ কি আমাদের সামনে খোলা আছে?

আমাদের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে হবে। একটা কমিউনাল ফিলিং তৈরি করতে হবে। আমরা আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে কে আছে জানি না। আশেপাশে যারা বাবা-মা আছে তাদের সাথে আমি বসে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি। একটা কমিউনিটি ফিলিংস তৈরি করতে পারলে আজ না হোক কাল একটা সুফল আমরা অবশ্যই পাব। আমি জানি আমি যত সহজে মুখে বিষয়গুলো বলে দিলাম বাস্তবে এগুলো করা খুব কঠিন। কিন্তু আমাদের আত্মরক্ষার জন্য এগুলো আমাদের করতেই হবে।

ঐশীর ঘটনাটি আমাদের জন্য, সমাজের জন্য একটা সতর্ক সংকেত। ঐশীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলেই সমাজটা আমূল বদলে যাবে না। ঐশীর প্রতি তীব্র ঘৃণা দিয়েও আমরা সমাজ বাঁচাতে পারবো না। আমাদের ফিরে তাকাতে হবে নিজেদের দিকে। সোনার হরিণের পেছন পেছন শুধু রুদ্ধশ্বাস ছুটে চলা নয়, একটা মানবিক পৃথিবী নির্মাণের দায়বদ্ধ প্রতিজ্ঞাই কেবল আমাদের সমাজের রক্তক্ষরণ প্রতিহত করতে পারে।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম