মাঝে মাঝে মনে হয় কোথাও গিয়ে আমি যদি অন্তত দুই ঘন্টা ফ্রেশ ঘুম ঘুমিয়ে আসতে পারতাম

বয়সের সাথে সাথে জীবনের রূপান্তর খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এই রূপান্তর ঘটে পুরো জীবনের চেহারা এবং ধ্যান-ধারণাকেই বদলে দেয়। একজন নারীর জীবনে সন্তান জন্মদানের ঘটনাটি এমনই একটি গভীর রূপান্তর-প্রক্রিয়া। যখন একজন নারী প্রথমবার মা হন তখন তিনি সম্পূর্ণ অচেনা একটি অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অচেনা একটি জগতে প্রবেশ করেন। অপরিমেয় আনন্দের আড়ালে কিছু বেদনাবোধও তার থেকে যায়। এই অনুভূতিগুলোকে কেউ সহজে জীবনের সাথে মানিয়ে নেন। কাউকে কাউকে বেগ পেতে হয়। কখনো কখনো এতটাই বেগ পেতে হয় যে মানসিক ভারসাম্যও বজায় থাকে না। প্রথম মা হওয়ার আনন্দ-হতাশা-বদলে যাওয়া বাস্তবতার সাথে লড়াই এরকম মিশ্র মানসিক অবস্থা নিয়ে মনের খবর প্রতিনিধির সাথে কথা বলেছেন সুদীপ্তা(ছদ্মনাম)।

কেমন আছেন?
ভালো আছি।

আপনার সন্তানের বয়স কত?
৪ মাস।

চাকরি করছেন?
এখন তো ম্যাটারনিটি লিভ এ আছি। পরে কী করবো সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

এটা তো আপনার প্রথম সন্তান?
হ্যাঁ।

প্রথম সন্তান গর্ভে আসার পর কেমন অনুভূতি হত?
সে সময়ের অনুভূতি খুব অদ্ভুত। নিজের ভেতর আরেক প্রাণের অস্তিত্ব অসাধারণ! তবে ভিন্নরকমের অনুভূতিও হত।

কিরকম?
এই যেমন আমাকে ছয়মাস বাইরে যেতে দেয়া হয়নি। আবার বলা হয়েছিল সপ্তম মাসের প্রথম রাত যেখানে থাকব পুরো মাস সেখানেই থাকতে হবে। এগুলো আমার কাছে কুসংস্কার বলেই মনে হত। এসব কারণে মাঝে মাঝে নিজেকে খুব বন্দি লাগতো। তারপর আরেকটা চাপ ছিল ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে। কারণ আমার শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়রা ছেলে সন্তান চাইতো। খুব হতাশাও কাজ করতো এসব নিয়ে।

সন্তান জন্মের পরও কি একইরকম বোধ কাজ করে?
হ্যাঁ এখন তো আরো বেশি। বিকেল হওয়ার আগেই দরজা জানালা বন্ধ করে দিতে হয়, ছাদে যেতে পারবোনা, এমনকি আমি নাকি আমার সন্তানের দিকে বেশিবার তাকাতেও পারবোনা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞার সাথে খাপ খাওয়াতে আমার কষ্ট হয়।

সন্তান জন্মদান মানে তো হঠাৎই জীবনের পুরো রুটিনটা বদলে যাওয়া। এটাকে সামলে ওঠেন কীভাবে?
হ্যাঁ এখন আমার পুরো দিনের সব কাজ এক কেন্দ্রিক। আমার খাওয়া, ঘুম, গোসল সবই ছেলেকেন্দ্রিক। ও জন্মের পর তো প্রথম কিছুদিন আমি ঘুমাতেই পারতাম না আতঙ্কে। মনে হত ওর মুখে বোধহয় কিছু পড়ে গেল। আমার মনে হয় আমি ছয় মাস ঠিক করে আয়নার সামনে দাঁড়াই না। চেহারা খারাপ হয়ে গিয়েছে এই বিতৃষ্ণায় আয়নার সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না।

এখনো কি আগের মত আতঙ্কিত হন?
না, এখন অনেকটা ঠিক হয়ে গেছে।

এই যে ঘুমাতে না পারা, নিজের দিকে মনোযোগ দিতে না পারা এই বিষয়গুলো কি স্বাভাবিক মানসিক অবস্থাকে বিঘ্নিত করছে বলে আপনি মনে করেন?
অবশ্যই করছে। আমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো অভ্যাস, কোনো শখ আমি ধরে রাখতে পারছি না। অথচ ওর বাবার কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সে ঠিকই তার কাজগুলো করছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছে। কিন্তু আমি চাকরিতেই আর যোগ দিতে পারবো কিনা ঠিক নেই। অথচ আমারও তো স্বপ্ন ছিল আরো পড়াশুনা করার। মাঝে মাঝে এসব কারণে আমি খুব ক্ষিপ্ত হয়ে যাই। আর তাছাড়া আমার স্বামী পেশাগত কারণে দূরে থাকে। আমি আমার শ্বশুরবাড়িতে থাকি। দূরত্বের কারণে স্বামীর সাথে বোঝাবুঝির গ্যাপ থাকে। যেটা আমাদের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে।

আপনাকে যে নিজের অনেক কিছু ত্যাগ করতে হচ্ছে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন এগুলো কি আপনার পরিবার বুঝতে পারে?
ঐ যে বললাম আমার স্বামী পেশাগত কারণে দূরে থাকে। কাছে থাকলে বুঝতে পারে। যেমন অনেক সময় দেখা যায় আমার বাচ্চা কাঁদছে। আমার শাশুড়ি আমার কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন এই বলে যে আমি কান্না থামাতে পারবোনা। অথচ আমি জানি ও আমার কাছে এলে থেমে যাবে। এরকম ক্ষেত্রে আমার স্বামী পাশে থাকলে দেখা যায় ও গিয়ে জোর করে নিয়ে এল। কিন্তু দূরে থাকলে অনেক কিছুই বুঝতে পারে না, অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝিরও সৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় কোথাও গিয়ে আমি যদি অন্তত দুই ঘন্টা ফ্রেশ ঘুম ঘুমিয়ে আসতে পারতাম, একবার আগের জীবনে ফিরে যেতে পারতাম!

আপনার হতাশা, ক্ষোভ এগুলো কি কখনো সন্তানের প্রতি কাজ করে?
না সন্তানের প্রতি কাজ করে না। তবে স্বামীর প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ কাজ করে।

একটি মেয়ের জীবনে প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি যেমন  আনন্দের তেমনি এটাও সত্য মা হওয়র পর তার জীবনের অনেক কিছুই বদলে যায়। মেয়েটি খুব সহজেই পরিবর্তিত জীবনের সাথে নিজের মানসিক অবস্থাকে মানিয়ে নিতে পারে না। যা খুব গুরুতর মানসিক রোগ আকারেও প্রকাশ পেতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই মানসিক চিকিৎসকের শরণাপণ্ন হতে হবে। একজন সদ্যপ্রসূত মায়ের চারপাশে যারা থাকেন- তার স্বামী, পরিবার, স্বজন, বন্ধু সবাইকে নজর দিতে হবে প্রসূতির মানসিক অবস্থার দিকেও। সহানুভূতির সাথে খেয়াল রাখতে হবে তার স্পর্শকাতর অনুভূতিগুলোর দিকে। সুদীপ্তার মত যারা সন্তান জন্মের সাথে সাথে নিজের ব্যক্তিজীবনের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তির সম্ভাবনা দেখেন তাদেরকে বোঝাতে হবে- এটা শেষ নয়, এটা কেবল জীবনের নতুন একটা অধ্যায়ের সংযোজন, নতুন পথটা হয়তো কঠিন, কিন্তু এগিয়ে চলা অসম্ভব নয়। আর এই দায় এবং দায়িত্ব প্রথমত তার  পরিবারের ওপরই বর্তায়।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর.কম