নতুন বছর কেমন যাবে? 1

নতুন বছর কেমন যাবে?

ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছে সুরুজ মিয়া। সাথে তার স্ত্রী পরিবানু। স্ত্রী অসুস্থ, আজ বছর তিনেক হতে চলল। অদ্ভুত তার রোগ –অস্থির, অশান্তি, সারা গায়ে ব্যাথা, দুর্বলতা, মাথার যন্ত্রণা, শরীরের দুর্বলতা – কি নাই? অনেক বছরের কষ্টের ফলে সুরুজ আজ একটা ছোটখাটো দোকানের মালিক হয়েছে সৌদিতে। নিজেকে তো ব্যস্ত থাকতে হচ্ছিলই, কাজের সুবিধার্থে তাই ছেলেকেও নিয়ে গেছে সেখানে। ঘটনার শুরু সেখানেই। ভেবেছিল এত দিনে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে, একটু আরাম আয়েশ করবে- কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। প্রথম প্রথম ছেলের জন্য মন খারাপ করত বউ, বলতো ভাল লাগে না ছেলে ছাড়া। একটাই ছেলে, তাই খারাপ লাগবে সেটা সেও মানে। কিন্তু, এতে এত মন খারাপের কি আছে? সে নিজে এই বিদেশে একা একা এসেছিল মজুর হয়ে, মরুভূমির তীব্র গরম-কষ্ট-নির্যাতন-একাকীত্ব আর হতাশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টাকা কামিয়েছে সে, সবার ভরণপোষণ করেছে। বছর শেষে কখনো বাড়ি ফিরতে পারলে তারও কি আর যেতে ইচ্ছে করত সেই দোজখের কষ্টে। কিন্তু, নিজের মনকে কঠোর করে আবার ফিরে গিয়েছে জীবন যুদ্ধে। জয় করেছে সব প্রতিকূলতা, জয় করেছে স্থানীয় শেখের মন। তার সহায়তায় আজ এত বছর পরে নিজের একটা দোকানের মালিক সে। আর তার ছেলে – তাকে তো এসবের কিছুই করতে হবেনা। যেখানে সুরুজ নিজে আছে সেখানে আর কোনো কথা কি চলে! কিন্তু এই সুখের মুখ দেখার সময়েই বউটা ছেলের চিন্তায় চিন্তায় অসুখ বাঁধাল! মেয়েগুলারও বিয়ে হয়ে গেছে। তারাও আর যত্ন করতে পারেনা পরীবানুর। তাকেই এখন আসা যাওয়ার মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু এসব কি চাট্টিখানি কথা। পরিবানু চেম্বারে বসেই কোঁকায়। কতক্ষন পরপর অস্থির হয়ে উঠে, এদিক ওদিক চলে যেতে চায়। কি যন্ত্রনা!

48-500x500-500x500-jpg_40-500x500

– এই তুমি চুপ করবা
– আমি বাড়ি যামু, আমার শরীর জইলা যাইতেছে, ও ফরিদের বাপ, আমার মাথায় একটু পানি ঢাল। আমি আর পারতাছি না।
– এই একদম চুপ। সারাদিন এই প্যানপ্যান আর ভাল লাগে না। থামবা না ডাক্তার না দেখায়া চইলা যামু।
– তুমি একটু দেখনা, ডাক্তার সাবরে কইয়া আগে দেখান যায় কি না।

পরিবানুর কথায় সায় দেয় সাথে আসা তার বোন নুরবানু। সুরুজ মিয়া আর পরিবানু ছাড়াও আরো তিন জন এসেছে তাদের সাথে, সফরসঙ্গী হয়ে। নুরবানুর কথা শুনে সুরুজের মেজাজ গরম হয়ে উঠে। কিন্তু, প্রকাশ করার উপায় নাই। একে তো কুটুম্ব, তার উপর এমন সময়ে কাউকে না কাউকে লাগে। বিরস বদনে চেম্বারের সামনে বসা ডাক্তারের সহকারির দিকে আগায়।

– ও ভাই এ্যাসিস্টেন্ট, আমার রোগীরে একটু আগে দেন না, বেশি অসুস্থ।
– অই মিয়া, আমাকে দেখলে বাসের হেল্পার মনে হয় নাকি? এসিস্টেন্ট আবার কি? কথাবার্তা হুঁশ করে বলেন।
– কথাডা খারাপ কি কইলাম? রোগি অসুস্থ দেইহা কইলাম। টাকা দিয়াই তো রোগী দেহাইতাছি।

এই কথাতেই রেগে আগুন এসিস্টেন্ট। বাকবিতণ্ডা ধীরে ধীরে হাতাহাতির দিকে যাবার অবস্থা। উপস্থিত অন্যান্য রোগীর লোকজন কেউ এপক্ষে-কেউ অপরপক্ষে। সুরুজ মিয়ার সাথে আসা আত্মীয় তাকে টেনে বাইরে নিয়ে যায়। চা এর অর্ডার দেয়। চা খেতে খেতে একটু ঠান্ডা হয় সুরুজ।

এমনিতে মোটামুটি ঠাণ্ডা মেজাজের সুরুজ নিজেও ইদানীং খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। হবে নাই বা কেন – সুরুজ ভাবে। কি যে একটা রোগ বাঁধাল এই মহিলা-রাত দিন খালি অশান্তি। ডাক্তারও কম দেখান হয় নি। সেই সাথে কবিরাজ-পীর-ফকির। এখন দেশে আসলে বাড়িতে যতক্ষণ থাকেনা তার চেয়ে বেশি বোধ হয় ডাক্তারের চেম্বারে চেম্বারে আর পীর ফকিরের দরজাতেই কাটে তার। কিন্তু এতদিন পরেও, আর এত পরীক্ষার পর পরীক্ষার পরও যখন হার্ট-কিডনি-ব্রেন কোনো কিছুর রোগই ধরা পড়ল না; কোনো ডাক্তারই যখন কোনো রোগ ধরতে পারলনা, তখন সে ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করল পরিবানুর কি রোগ? সেই ডাক্তার সাহেব বললেন, কোনো রোগ নাই, সব মনের সমস্যা।

শুনে কেমন যে লাগে সুরুজ মিয়ার – এই কথা তো সে কবেই জানে। তাহলে এতদিন এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর ওষুধের কি দরকার ছিল!
– আমিও তো হেডাই কই। এত ঘুরাঘুরির পর শেষমেশ আমার আন্দাজই ঠিক হইল।
শুনে পরিবানু হাহাকার করে উঠে আর ডাক্তার বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলে –
– তাহলে তো আমরা ফেল মারলাম আপনার কাছে।
ডাক্তার সাহেবের বিরক্ত কন্ঠ শুনে লজ্জিত সুরুজ বলে
– স্যার, রাগ কইরেন না। মনের কথাডা মুখে আইয়া গেল। তো এখন কি করতাম বুদ্ধি দেন আমারে।

ডাক্তার সাহেব বুদ্ধি দিলেন মনের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য। এ শুনে পরিবানু চিৎকার করে উঠে – না সে পাগল নয়। সে এসব কোনকিছুই বানিয়ে বানিয়ে বলছেনা। সে ব্যাথা বেদনায় মারা যাচ্ছে – দয়া করে সেটার চিকিৎসা যেন দেয়া হয়। সুরুজ মিয়া নিজেও প্রস্তুত ছিলনা এটার জন্য। সে ভেবে পায়না পাগলের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কি অর্থ। তবে কি পরিবানু পাগল হয়ে যাচ্ছে!

ডাক্তার সাহেব অত প্রশ্নের জবাব দেয়ার সময় পেলেন না, শুধু বললেন যদি রোগি ভাল করতে চায় যা বলেছেন তা করতে, আর মনের ডাক্তার ঘণ্টা-দুই ঘন্টা ধরে শুনবে তাদের যা বলার আছে, কথা শুনাই ওদের কাজ, আর এরপর চিকিৎসা লাগলে দিয়ে দিবে। আর পরীবানুকে বললেন মনের জোর বাড়াতে, হাসিখুশি থাকতে, কাজে ব্যস্ত থাকতে।

সুরুজের খুব বিরক্ত লাগে পরিবানুর উপর। কই মন শক্ত করে আনন্দ করবে তা না, খালি অশান্তি আর রোগ। কতবার তাকে বলেছে এই কথা। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তার নিজের মত কষ্ট করতে হলে কি হত এই মহিলার অবস্থা। পাড়া –প্রতিবেশীরা সামনে এসে আহা-উহু করে, কেউ আকারে ইঙ্গিতে আরেকটা বিয়ের কথাও বলে, আর আড়ালে চলে তাকে ও তার বউকে নিয়ে হাসি তামাশা। প্রথম প্রথম সবাই ভাবত বড় কোনো রোগ হয়েছে পরিবানুর। কিন্তু পরে জানতে পারল তার আসলে কোনো রোগ নেই। কেউ বুঝলো সুখের অসুখ, কারো কাছে ঢং এর অসুখ, আর কারো কাছে পাগল হয়ে গেল পরিবানু। সুরুজ মিয়া তবু সামলে নেয় কোনমতে, কাউকে উপেক্ষা করে- কাউকে ধমক দিয়ে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু, সমস্যা থেকে রেহাই পায়না বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েরাও। প্রায়ই কথাবার্তায় টীকাটিপ্পনীর শিকার হতে হয়, মান মর্যাদাও কমে গেছে শ্বশুর বাড়িতে। মেয়েরাও তাই কিছুটা বিরক্ত মায়ের উপর। কেন যে মা শেষ বয়সে এই সব ঝামেলা পাকাচ্ছে।

সবার সব কিছুই বুঝতে পারে সুরুজ মিয়া। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত পরিবানুর উপর রাগ করতে পারে না। তার সঙ্গে যে সুরুজের আত্মার সম্পর্ক। পরিবানু যে তার যৌবনের প্রথম ভালোবাসা, সুখদুঃখ আর জীবনসংগ্রামের সাথী, পরামর্শদাতা, ভরসাদাতা। নিজের কত কষ্ট, অভাব-অভিযোগ পাথর চাপা দিয়ে সুরুজের সাথে তাল মিলিয়ে চলেছে এই মেয়েটি। সুরুজ মিয়া অল্পশিক্ষিত, স্বভাবেও অনেক দোষ- কিন্তু, সে অমানুষ নয়। ভালোবাসার মানুষকে অসহায় অবস্থায় যে ফেলে যায়, সুরুজ মিয়ার কাছে সে অমানুষই।

আজ শেষবারের মত এই চিকিৎসককে দেখাতে এসেছে সে। আসলে, প্রতিবারই ভাবে এই শেষবার, চিকিৎসায় ভাল না হলে প্রথম কয়েকদিন রাগ করে আর দেখাতে যায়না কাউকেই। তবে, শেষ পর্যন্ত আর থাকতে পারেনা। এই ডাক্তার ঢাকা থেকে এখানে আসেন সপ্তাহে একবার। অনেক বড় ডাক্তার, খুব নাম ডাক, প্রতিবারেই একশতের কাছাকাছি রোগীর সিরিয়াল পড়ে। অনেকের মতই অনেক আশা নিয়ে সুরুজ মিয়াও এসেছে শেষ চেষ্টা হিসেবে।

এক সময় অপেক্ষার পালা শেষ হয় – ডাক পড়ে পরিবানুর। ঢুকতেই বাঁধা পায়- ওরা চার-পাঁচজন একসাথে ঢুকে পড়ায়। অতঃপর থেকে যায় শুধু সুরুজ আর পরীবানু।
– কি সমস্যা?
– সমস্যা তো স্যার আপনেই ধরবেন, আমরা তো চিকিৎসা করতে আইছি।
– আরে ভাই, আপনাকে তো বলি নাই রোগ কি বলেন। সমস্যা মানে বুঝেন না?
– বুঝছি স্যার। সমস্যা তো মেলা। আমি যখন পয়লা পয়লা বিদেশ গেলাম তখন থেইকাই হালকা-পাতলা সমস্যা হইত, কিন্তু বুঝতে পারিনাই। ধরেন যে, তখন থেইকাই হালকা হালকা কস…
– আরে যখন থেকে বেশী সমস্যা তখন থেকে বলেন, সংক্ষেপে বলেন।
– স্যার, পুরা কথা খুইল্ল্যা না কইলে কেমনে বুঝবেন…
– সেটা তো আমি দেখব।
– আমারে আগের ডাক্তার সাব আপনার কাছে পাডাইলো আপনে নাকি ঘণ্টা- দুই ঘণ্টা ধইরা হুনবেন, নাইলে তো স্যার মনে শান্তি পাইনা। কি অশান্তিতে যে আছি তা আপনেরে ক্যামনে বুঝাই!
– শুনেন, আগের ডাক্তার যা বলছে সেটা উনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার দরকার কাজের কথা শুনা, আপনার কাছে যেটা জরুরি সেটা না, যেটা আমার কাছে জরুরি সেটাই আমি শুনব। সব কথা তো আর কাজের কথা না। সুরুজ আলী দমে যায়, কি বলবে আর বুঝে উঠতে পারে না। কথার খেই হারিয়ে ফেলে সে। একটু রাগও যেন জমে উঠে মনের কোণে।

অবশেষে, ডাক্তার বললেন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করেন, মানসিক রোগ বিভাগে। কিছু ওষুধ লিখে দেন আপাতত খাওয়ার জন্য। আর, প্রশ্নের উত্তরে আশ্বস্ত করেন পরিবানু মোটেই পাগল নন, তিনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন। তবে সেটা একটু জটিল পর্যায়ে। অতএব, রোগী ভর্তি করান, সেখানে একটু বেশী সময় ধরে চিকিৎসা হবে, কাউন্সেলিং হবে, তবে ভাল হতে একটু সময় লাগবে।

ভেবেচিন্তে একদিন পরীবানুকে নিয়ে, আত্মীয়স্বজন নিয়ে কাছের মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্যে উপস্থিত হল। কিন্তু, রিকশা থেকে মেইন গেইটে নেমেই সুরুজ মিয়ার মনে হল সে অজানা দেশে চলে এসেছে। এদিক ওদিক তাকায় সে। দু’একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল ভর্তি করতে হলে জরুরি বিভাগে যেতে হবে। কিন্তু, সেটা কোন দিকে বুঝতে না পেরে এদিক-ওদিকে ঘুরতে থাকে। হঠাৎ এক মধ্যবয়সী লোক এগিয়ে আসে। সহানুভূতি ঝরে তার কণ্ঠে। লোকটি পরিবানুর কি হয়েছে জানতে চায়। সব শুনে বুঝাতে থাকে সুরুজ মিয়াকে-

– ভাই, আপনের রোগীর রোগ বুইঝা গেছি। এই মেডিকেলেই আছি আজ তিরিশ বচ্ছর, ধরেন যে হাফ ডাক্তার হইয়া গেছি। তয় ভাই, এইখানে চিকিৎসা করাইতে অনেক হ্যাপা। সিট নাই, ঘুষ দেওন লাগে কথায় কথায়। নিজে চাকরি করি, তাও ঘেন্না লাগে। লোকজন আইলে আমি কই, এইহানে না বাইরে কিলনিকে ভর্তি করাও গিয়া। এইহানে আবার চিকিৎসা অয় নি? এই যে আপনে এতক্ষন ধইরা ঘুরতাছেন পারলেন বাইর করতে কোন খানে যাইতে অইব, কি করন লাগব?

সুরুজ মিয়া সাই দেয় আর আমতা আমতা করে। নিজে সে বিদেশ দেখে এসেছে। তার মনে হচ্ছে সেই প্রথম দিনের কথা, যেদিন এয়ারপোর্টে পাগল হবার অবস্থা হয়েছিল তার। দালালরে এতগুলা টাকা দিয়ে ফেলেছে তাই সে গেছে, না হলে সেদিনই ঘরের পথ ধরত। এখানেও চিকিৎসা করাতেই হবে, তাই এতক্ষন চেষ্টা করছে সে।

– হের লাইগাই কই, আশে পাশে অনেক ভালা কিলনিক আছে, অইহানে যান গা। আরামও পাইবেন, চিকিৎসাও অইব। আর কন তো আমার পরিচিত আছে এক খান, অইহানে যাইবার পারেন। ওগো কইয়া দিলে আমারে সম্মান কইরা ট্যাহাও কম রাখবোনে।
– ভাই, হেইডা তো বুঝবার পারলাম। কিন্তু, ডাক্তার সাব তো এইহানেই ভর্তির কথা কইল। আমি এইহানেই আগে দেহাই।

আরও কিছু জোরাজুরির পর, লোকটি হাল ছাড়ে। তবে, সুরুজ তার হাতে পায়ে ধরে খোশামোদ করাতে সে রাজি হয় জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে। সেখানে গিয়ে দেখে প্রচুর ভিড় আর ঠেলাঠেলি।
– দেখলেন তো নিজের চক্ষে। এহন বুঝলেন কিয়ের লাইগা কইছিলাম। তাও, দেহি কি করা যায়।

এই বলে লোকটি ভিতরে আগায়। সুরুজ সহ সবাই ঐখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর লোকটি এসে বলে অনেক কষ্টে ভিতরে ম্যানেজ করে এসেছে সে, এখন তিনশ টাকা লাগবে। সুরুজ মিয়া তাই দেয়। আর তার সাথে একটা দরজা দিয়ে ঢুকে আরেক লোকের সাথে মিলিত হয়। সে এখানকার কর্মচারি। লোকটা বলে, ডাক্তার জিজ্ঞেস করলে রোগের বাইরে আর কিছু না বলতে। ডাক্তারের কক্ষে যাওয়ার পর লোকটা সুরুজ মিয়াকে খালাত ভাই পরিচয় দেয়, বলে গ্রাম থেকে এসেছে, একটু ভর্তি দেয়া লাগবে। ডাক্তার তাড়াহুড়ার ভিতর দুয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ভর্তি লিখে দেয়। এবার, সেই আগের লোক ভর্তি লিখা কাগজটা নিয়ে সুরুজ মিয়াকে টাকা জমা দেয়ার লাইনে দাড় করিয়ে দেয়।

– ভাই, আমি তাইলে যাই। এরপর কিন্তু আরও কয়েক জায়গায় কাজ আছে। তয় আমার তো সময় নাই হাতে।
– আইচ্ছা ভাই, যা করলেন আল্লাহ আপনেরে হায়াত দরাজ করুক, আপনারে অনেক দোয়া করি ভাই।
– না না, হেইডা তো ভাই করতেই অয়। তই, আমরা গরীব মানুষ। আপনেরা দোয়া করেন, খুশি মনে কিছু বকশিশ – টকশিশ দেন। তাই দিয়া বৌ বাচ্চা নিয়া চলি। নাইলে ক্যামনে বাঁচি বলেন।

সুরুজ মিয়া বুঝতে পারে এই লোক আসলে ক্লিনিকের দালাল, কর্মচারি নয়। তাও, একশ টাকা ধরিয়ে দেয় তার হাতে। লোকটা টাকা নিয়ে বুঝিয়ে দেয়, এইখানের কাজ শেষ হলে ওইপাশের লিফটে করে উঠতে হবে, তবে লিফটের লোকটাকে কিছু বকশিশ ধরিয়ে দিতে হবে।

এইভাবে নানা ঘাটের পানি খেয়ে, পরীবানুকে সে ভর্তি করাতে পারে একটা ওয়ার্ডে। তবে, সিট খালি নাই, তাই আপাতত ফ্লোরে জায়গা হয় আরও কিছু রোগীর সাথে। পুরো ওয়ার্ড গমগম করছে লোকজনের হাঁকডাকে, চিৎকার- চেঁচামেচি, রোগীদের কাতরানি এই সবে। এরই মধ্যে কেউ কলাটা-কমলাটা খেয়ে আশেপাশে ফেলছে, দুই রোগীর লোকজন জায়গা নিয়ে ঝগড়া করছে শ্রাব্য-অশ্রাব্য শব্দে, বিড়ালেরা ঘুরঘুর করছে, কেউ আর্তনাদ করে উঠল মোবাইল হারিয়ে- চার্জে দিয়েছিল কে যেন নিয়ে গেছে। এরই মধ্যে নতুন রোগী আসছে একের পর এক, ফ্লোরে বিছানা পেয়ে কেউ নির্বিকার আর কেউ ঝগড়া করছে। পরিবানুর অস্থিরতা বেড়ে গেল, ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল – যদিও জানে সুরুজ মিয়ার করার কিছু নাই। এক সময় হয়তো এই পরিবেশে খারাপ লাগত না সুরুজ মিয়ার। কিন্তু, এখন তো সে একটু আরাম আয়েশে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই, পরিবেশটা তার কাছে মাছের বাজারের মতই মনে হল। কিন্তু, কি করবে? চিকিৎসার জন্য তো একটু কষ্ট সহ্য করতে তো হবেই। অন্যরাও তো করছে। ধমক দিয়ে সাময়িক ঠাণ্ডা করে পরিবানুকে।

কিছুক্ষণ পর এক ডাক্তার আসে – তরুণ বয়স। ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে কিছু ওষুধ লিখে দিল। যাওয়ার আগে সুরুজ মিয়া প্রশ্ন করে
– ভাই, অসুধ কি আগেরগুলান?
– হ্যাঁ। আপাতত আগেরগুলোই চলবে। কালকে, বড় স্যার দেখে লাগলে অন্য ওষুধ দিবেন।
– আর কানছিল?
– মানে?
– আমারে যেই স্যার ভর্তি দিছিলেনে হেই স্যার কইছিলেন এখানে কানছিল দিবে।
– তরুণ চিকিৎসক একটু অবাক হয়ে তাকায়, আর হাতে নিয়ে দেখে আগের ডাক্তারের ব্যাবস্থাপত্র। বুঝতে পেরে হাসেন।
– ও কাউন্সেলিং। সে সব তো এখানে হয়না।
– কেন ভাই?
– এইটাতো মেডিসিন ওয়ার্ড। আর এই হাসপাতালে এখনো সাইকিয়াট্রি মানে আপনার রোগীর যে ওয়ার্ড দরকার ঐটা নাই।
– তাইলে?

পরেরদিন একই প্রশ্ন অনেক কষ্টে বড় স্যারকে করে সুরুজ মিয়া। সমাধান আসলো – আপাতত এই ঔষধগুলো চলুক, তাতে ভাল হতে পারে। তবে, যথাযথ চিকিৎসার জন্য ঢাকাতেই নিয়ে যাওয়া উচিত, যেহেতু, আশেপাশে এসবের কোনো ব্যবস্থা নাই।

হতাশ সুরুজ ভাবতে ভাবতে দুই দিন কাটায়। এর মধ্যে পরিবানু একেবারে অস্থির হয়ে উঠে। সারাক্ষন শুধু চল চল ঢাকায় যাই। শেষে সে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আরেক দফা ঝক্কি-ঝামেলা আর টাকা খরচের পরে রেফারেল সার্টিফিকেট হাতে পায়। শেষ বিকেলে রওনা দেয় ঢাকার উদ্দেশ্যে।

পরদিন ঢাকায় এসে এদিক সেদিক খোঁজখবর নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম ভোগান্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পেরে সুরুজ মিয়া একটু উৎফুল্ল বোধ করে। বোধ হয় এবার কিছু একটা হবে। ডাক্তার এসে যথারীতি দেখেও গেল, অনেকক্ষণ কথাও বলল। তবে, জানালো রোগ একটু জটিল- বিস্তারিত আগামিকাল জানানো হবে।

কিন্তু, রাতেই পরিবানুর অবস্থা খারাপ। দুই পাশে দুই হাত দূরত্বে দুই রোগী। একজনের মুখে সারাক্ষন কথার খই ফুটছে, অকারনে হাসছে, নাচানাচি আর হেঁড়ে গলায় গান করছে- ঘুমের কোনো বালাই নাই। অন্যপাশের রোগীর তো আরও খারাপ অবস্থা। সবাইকে সন্দেহ করছে, ভুতের সাথে কথা বলে, দেখতেও নাকি পায়- একে মেরে ফেলবে ওকে খুন করবে এই বলে চিৎকার করছে অনবরত। হাত পা বাঁধা বলে রক্ষা, না হলে পরিবানুকেই খতম করে দিত। সে নাকি গুপ্তচর শত্রুপক্ষের। মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেও গালিগালাজ আর হুমকির হাত থেকে বাঁচতে পারেনা পরিবানু। দুই কানের দুইপাশে এই সবে পরিবানুর উর্দ্ধশ্বাস অবস্থা। শুধু এই দুই জনই নয় – আরও বেশ কিছু রোগী আছে এই রকম। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার ওরা দিব্যি হাঁটছে- ঘুরছে। আসার পর থেকেই তাই পরিবানু নিজের বিছানায় ভয়ে কাঁটা হয়ে বসে আছে।

সুরুজ মিয়ারও অস্বস্তি আর ভয় লাগে মনে মনে। কিন্তু, সে পুরুষ মানুষ। ভয় পেলে কি চলে। তাই, অন্য রোগীর লোকদের সাথে গল্পে মাতে সে। জানতে চায় এটা সেটা। শেষ পর্যন্ত একটু হতাশ হতে হয় তাকে। এখানের প্রায় সব রোগী নাকি এক মাসের কাছাকাছি সময় ধরে ভর্তি আছে চিকিৎসার জন্য – একজন তো প্রায় দুই মাস। মনে মনে আশা জোগায় নিজেকে- পরিবানুর অবস্থা ওদের থেকে ভাল, ওর নিশ্চয়ই এতদিন লাগবেনা।

রাতে আরেক ঝামেলা। রাত দশটা বাজতে ঘোষণা এল রাতে মহিলা ওয়ার্ডে পুরুষ থাকতে পারবেনা কোনো ভাবেই। দেখল অন্য রোগীর পুরুষলোকরা আসলেই চলে যাচ্ছে। কিন্তু, তাদের সাথে তো মহিলা আছে। এদিকে পরিবানু কিছুতেই তাকে ছাড়বেনা, ওদিকে ওয়ার্ডের খালা তাকে থাকতেই দিবে না। তাকে অভয় দেয় খালারা, সবাই তো আছে সমস্যা হবেনা। কিন্তু, পরিবানু নাছোড়বান্দা। শেষে সুরুজ মিয়া ধমক-টমক দিয়ে, আশেপাশের মহিলাদের কাছে একটু দেখে রাখার অনুরোধ জানিয়ে আর খালারা আদর-সোহাগ দেখিয়ে পরিবানুকে শান্ত করে। বের তো হল, কিন্তু, কোথায় রাত কাটাবে সে এই শীতের রাতে? অন্যদের দেখাদেখি চাদর মুড়ি দিয়ে কোনমতে শুয়ে পড়ে বারান্দার এক কোণায়।

ঘুমটা চোখে লেগে আসতেই ধুমধাম শব্দ শুনতে পায় আশেপাশে। গোলাগুলি ভেবে উঠে বসতেই দেখতে পায় সবাই বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে আতশবাজির উৎসব দেখছে। জানতে পারল পরদিন নাকি ইংরেজি বছরের প্রথম দিন। কিছুক্ষণ দেখেই মনের মধ্যকার বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে সে শুয়ে পড়ল আগের জায়গায়। ভাবতে থাকল, নতুন বছরে কি আর সব নতুন করে শুরু হবে? সুরুজ মিয়া নিজে যে ভুল করেছে পরিবানুর মনটা বুঝতে না চেয়ে, মন খারাপটাকে গুরুত্ব না দিয়ে – আর কেউ কি সেই ভুল থেকে বের হয়ে আসবে। নিজেকে দিয়ে না-অন্যের মনের কথাটা অন্যকে দিয়েই বুঝতে চাইবে। তাহলে তো পরিবানুর মত অনেকেই সুস্থ থাকতে পারবে। নতুন বছরে কি ডাক্তাররা তাড়াতাড়ি রোগটা ধরতে চেষ্টা করবেন, একটু আরও ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন – তাহলে পরিবানু আর সুরুজ মিয়ার মত অন্যরা এত কষ্টের হাত থেকে বেঁচে যাবে। দেশের হর্তাকর্তারা কি নতুন বছরে শুধু নতুন নতুন ভবন বানানোর বাইরেও সেবা দেয়ার পদ্ধতির ব্যাপারেও কি একটু মন দিবেন? তাহলে, তথ্যের অভাবে হাসপাতালে নতুন আসা কারো এত ভোগান্তি ভুগতে হবে না, এত টাকা ঘুষ দিতে হবে না, পরিষ্কার পরিছন্ন পরিবেশে সেবা পাবে, মনোরোগের চিকিৎসার জন্য ঢাকাতেই দৌড়াতে হবে না, পাশের রোগীর ভয়ে সিটকে থাকতে হবে না, নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে পারবে রোগীরা, আর সেই সাথে রোগীর সাথের লোকটিকে তার প্রিয়জনকে অসহায় অবস্থায় ফেলে শীতের রাতে বারান্দায় অবাঞ্ছিত লোকের মত ঘুমানোর জন্য যুদ্ধ করতে হবে না।

দিনশেষে সুরুজ মিয়া এদেশেরই একজন। তাই, এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সে ঘুমিয়েই পড়ে নিজেও টের পায় না…………।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনের খবরের সম্পাদকীয় নীতি বা মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই মনের খবরে প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না কর্তৃপক্ষ।

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য। স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রাম। তবে, কলেজ শিক্ষক মায়ের চাকুরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে শৈশব। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবং উচ্চ-মাধ্যমিক চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস পাসের পর সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। মেডিক্যালে পড়ার সময় থেকেই মনোরোগ নিয়ে পড়ার প্রতি আগ্রহ। তাই, ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ধারিত সময়ের চাকুরি শেষে ভর্তি হন মনোরোগবিদ্যায় এম.ডি(রেসিডেন্সি) কোর্সে। বর্তমানে তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত শিক্ষকতার ধারা বজায় রেখে চিকিৎসক ও শিক্ষক হওয়াটাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বই, সঙ্গীত আর লেখালেখিতেই কাটে অবসর সময়ের বেশির ভাগ। স্বপ্ন দেখেন - মেধা ও মননশীলতার চর্চায় অগ্রগামী একটা বাংলাদেশের।