মন কি ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে?

hygjk765

নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ বলেছেন, “মহাবিশ্ব শুধু আমরা যতটা ভাবি ততটাই বিস্ময়কর না, আমরা যতটুকু ভাবতে পারি তার চেয়েও বেশি বিস্ময়কর।”

হাইজেনবার্গ সম্ভবতঃ মহাবিশ্বের এই বিষ্ময়করতার একটু ভালোভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছেন। কোয়ান্টার বিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র বিজ্ঞানকে দিয়েছে এক অনন্য পথের সন্ধান।

মূল কথার আগে দেখে নেই কোয়ান্টাম দুনিয়ায় ঠিক কি কি ঘটে!

– একই বস্তু একই সময়ে একই সাথে অনেক জায়গায় থাকতে পারে। ব্যাপারটা এমন যে আপনি একই সময়ে আপনার চেয়ারে, বারান্দায়, বাগানে এবং মাঠে বসে আছেন।

ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়  একই বস্তুর দুটি রুপ থাকতে পারে এবং একে অন্যের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করতে পারে এমনভাবে; একদম যেন তারা সম্পূর্ণ আলাদা। সহজ কথায় আপনার প্রতিরূপ আরেকটি আপনি হয়ে গেছেন। এক আপনি আরেক আপনাকে প্রভাবিত করছে স্বতন্ত্রভাবে।

মহাবিশ্বের যে কোনো এক প্রান্তের কোনো কিছুতে কোনো পরিবর্তন, তাৎক্ষনিকভাবে মহাবিশ্বের অপরপ্রান্তের কোনো কিছুতে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ধরুন আপনি এখন হাঁচি দিলেন। ১৩.৫ বিলিওন আলোকবর্ষ দূরের কেউও  একইসাথে বলে উঠল “আলহামদুলিল্লাহ্‌”।

আবার একই সাথে ভিন্ন ভিন্ন স্থানের বদলে একই স্থানে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে থাকতে পারেন। অর্থাৎ আপনি এই মুহুর্তে একটা হাঁচি দিয়ে অতীতে চলে গেলেন সেই হাঁচি ঠেকাতে।

পদার্থবিজ্ঞানের উচ্চতর সমীকরণের কষ্টি পাথরে বারবার যাচাই করা এমন অদ্ভুত ব্যাপারগুলো দেখে চিন্তাবিদগণও আরেকটি অদ্ভুত সিদ্ধান্তে এসেছেন। তা হলো, আমরা যেভাবে ভাবতাম অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝের সীমানা ঠিক ততটা দৃঢ় নয়। তাই ভবিষ্যতের কিছু অংশ বর্তমানেও থাকতে পারে।

হার্টম্যাথ ইন্সটিটিউটের ড. রোলিন ম্যাকারটি ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। তিনি দাবি করেন, পরীক্ষামূলকভাবে এক ব্যক্তির হার্ট রেটের পরিসংখ্যান, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা ঘটার ২ থেকে ১৪ সেকেন্ড আগেই ভবিষ্যৎবানী করেছিল। পরীক্ষার একটা ভাগ ছিল, নিকট ভবিষ্যতে দেখান হবে এমন একটি ছবিতে উত্তেজক কিছু আছে নাকি সাধারণ- তা অনুমান করা। অন্য ঘটনাটি ছিল এক ধরনের জুয়ার বাজি নিয়ে যে পরীক্ষাধীন ব্যক্তি জিতবে নাকি হারবে- তা অনুমান করা। উভয় পরীক্ষামূলক ঘটনায় ম্যাকারটি দেখলেন যে, হৃদ স্পন্দনের ( হার্ট রেট) তারতম্যের সাধারণ পরিবর্তন ঘটনাগুলো ঘটার ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হচ্ছিল। এবং ছবি উত্তেজক নাকি সাধারণ অথবা বাজিতে জয় নাকি পরাজয়- এর ওপর ভিত্তি করে উল্লেখযোগ্যভাবেই হার্ট রেটের পরিবর্তন হচ্ছিল।

ম্যাকারটি তার গবেষণা থেকে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, ভবিষ্যতের আংশিক অংশ আমাদের মনেই থাকে। এবং মন থেকে মস্তিস্কে এই অন্তর্মুখী সংকেতকে আমরা ধরে নিতে পারি সেটা, যাকে আমরা অচেতন মন বা পূর্বাভাস বলে থাকি।

অন্যকথায়, “মনের কথা শোন”, “মনকে অনুসরণ কর”, “মনের গভীর থেকে বিশ্বাস কর”- এই বহুল প্রচলিত বাক্যগুলো রূপকের চেয়েও বেশি কিছু। এগুলো কি ঘটবে তার আক্ষরিক বর্ণনার মতই; শুধুমাত্র যখন আমাদের অবচেতন মন সজ্ঞার দেখা পায়। হয়ত বর্তমানে জড়িয়ে থাকা সেই আংশিক ভবিষ্যৎ এর দেখা।

অপরদিকে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ড. ব্রেডলি ড্যান-এর পরিক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখান যে, কোনো অনুভূতি হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন ঘটালে প্রকৃতপক্ষে তা সাংঘাতিকভাবে অনুমান পদ্ধতিতে আঘাত করতে পারে।

তিনি একটা খেলা তৈরি করেন, যেখানে পরীক্ষাধীন ব্যক্তিদের অনুমানের ভিত্তিতে চার সেট কার্ড থেকে সঠিক কার্ডটি বেছে নিতে হবে। সঠিক কার্ডগুলো আগেই নির্ধারিত ছিল। কার্ড গুলো স্তুপের মত করে রাখা ছিল। চার সেট কার্ডের মধ্যে দুই সেট কার্ড ছিলো যেখানে জেতার সম্ভাবনা অনেকে বেশি, আর দুই সেট কার্ডে জেতার সম্ভাবনা ছিলো অনেক কম। পরীক্ষার সময় ড্যান অংশগ্রহণকারীদের হৃদ স্পন্দন পর্যবেক্ষণ করেন।

দেখা গেলো যে দুটি সেটে জেতার সম্ভাবনা বেশি সেখান থেকে কার্ড তোলার সময় পরীক্ষাধীন ব্যক্তিদের হৃদস্পন্দন উল্লেখযোগ্য হারে পরিবর্তিত হচ্ছে।

এই পরীক্ষার আরেকটি কৌতূহলোদ্দিপক অনুসিদ্ধান্ত হল- যারা নিজেদের হৃদস্পন্দন সম্পর্কে সচেতন ছিল, তারা এ খেলায় বেশি ভাল করেছে। অন্যদিকে, যারা নিজেদের হার্ট রেট সম্পর্কে সচেতন ছিল না, তারা বেশি ভাল করেনি।

সম্ভবত ভাল অনুমানশক্তির সাথে কম অনুমানশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তির পার্থক্য শুধু নিজের হৃদস্পন্দন সম্পর্কে সচেতন হওয়ার ক্ষমতা। আমাদের কেউ কেউ আমাদের হৃদয়কে অনেকে বেশি বুঝি, যতটা না অন্যরা নিজেদেরটা বোঝে।

সাইকোলজি টুডে অবলম্বনে লিখেছেন,
মাসাফি আহমেদ ফেরদৌস অনিক